তেলের মূল্য কমে যাওয়া এবং তরুণদের বেকারত্বের কারণে আরব বসন্তের আট বছর পর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিক্ষোভে উত্তাল।
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট উৎখাত হয়েছেন। নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে মিসরে। ইরাকে শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর বিক্ষোভকারীরা বলছেন তাদের লড়াই শুরু হলো মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় এক বছর ধরে ক্ষোভ ছড়াচ্ছে।
জর্ডানের রাজধানী আম্মানের ধূলিধুসর হাইওয়েতে আল-শরীফ কফির দোকান। হাতে রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে একজন হোটেল কর্মী সংবাদ চ্যানেল বাদ দিয়ে আমেরিকান চলচ্চিত্র চালাতে শুরু করে। সময় মাত্র দুপুর ১টা, ক্যাফে ভর্তি তরুণরা কার্ড খেলছে, হাস্যরসে মশগুল এবং কেউ কেউ ফোনের পর্দায় তাকিয়ে আছে। অঞ্চলটির কয়েক হাজার মাইল দূরে বিক্ষোভ হলেও এমন দৃশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
২৪ বছরের তরুণ মুহাম্মদ। প্রকৌশলী হিসেবে পাস করেছেন। কিন্তু এখনও তার কোনও স্থায়ী চাকরি হয়নি। মাঝে মাঝে রাইড শেয়ারিং অ্যাপসে গাড়ি চালানোর কাজ করেন। তিনি বলেন, আমি কাজ চাই। আমি পড়াশোনা করেছি, ডিগ্রি পেয়েছি। কিন্তু যেসব চাকরি পাচ্ছ সেগুলো আমার উপযুক্ত নয়। ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করাই ভালো মনে হয়েছে।
২০০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় মধ্যপ্রাচ্যে তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত এক দশকে বিশ্বের অন্য স্থানের তুলনায় এখানে বেকারত্ব আরও বেশি বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যে উঠে এসেছে। আরব ও উত্তর আফ্রিকার তরুণদের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ পাচ্ছে না, যা গড় আন্তর্জাতিক বেকারত্বের চেয়ে দ্বিগুণ।
আট বছর পূর্বে যেসব বঞ্চনা আরব বসন্তের সূচনায় ভূমিকা রেখেছিল সেগুলো আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে বিক্ষোভ পরবর্তী যুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটের ঘটনায়। এমনকি অঞ্চলটির একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ তিউনিসিয়ার অর্থনীতি সূচক আগের চেয়ে এখন আরও খারাপ হয়েছে। ২০১১ সালে ফল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বৌয়াজিজির আত্মাহুতির ঘটনায় বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল দেশটিতে।
ইরাক, লেবানন বা অন্যত্র এবারের বিক্ষোভের দাবিগুলো বেশ ব্যাপক। তবে এসব বিক্ষোভের একটি জায়গায় মিল রয়েছে। সেটি হলো ভেঙে পড়া ব্যবস্থা তরুণদের জীবন দুর্বিষহ করে ফেলার কারণে জমে থাকা হতাশা।
বৈরুত ও অন্যান্য শহরের বিক্ষোভে তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সেন্টার লেবানিজ স্টাডিজের ঘিয়া ওসেইরান বলেন, এই অবস্থা নিয়ে তরুণরা হতাশ হয়ে পড়েছে তাই তারা রাজপথে নেমেছে। তাদের মূল দাবি রাজনৈতিক সংস্কার। কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচারও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মৌলিক অধিকার ও কর্মসংস্থান।
এমনকি অঞ্চলটিতে স্থিতিশীল দ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি জর্ডানেও গত পাঁচ বছরে সাতটি সরকার দেখেছে। সেপ্টেম্বরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শিক্ষকদের বিক্ষোভ দমন করা হয় কঠোরভাবে। দেশটির ইতিহাসে সরকারি খাতে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ধর্মঘটের ঘটনা।
জর্ডানের জনসংখ্যা মোটামুটি উচ্চ শিক্ষিত ( দেশটির ৬৫ জনের মধ্যে ১ জনের প্রকৌশল ডিগ্রি রয়েছে)। কিন্তু দেশটির তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দেশটির সরকারের নারী মুখপাত্র ও প্রতিমন্ত্রী জৌমানা ঘুনাইমাত বলেন, তরুণদের বেকারত্বই এখন জর্ডান সবচেয়ে বড় সমস্যা। এবং সংকটটি দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো তেল ও গ্যাসের বড় মজুদ না থাকায় অঞ্চলটির অস্থিতিশীলতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে জর্ডান। সীমান্তবর্তী সিরিয়া ও ইরাকে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসছে না এবং দশ লাখের মতো শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। ফলে দেশটির সরকারি সম্পদে চাপ বেড়েছে।
ঘুনাইমাত আরও বলেন, তরুণদের যদি কাজ না থাকে তাহলে তারা দেশটির কাঠামোর অংশ হতে পারে না। তখন তারা কোথায় যাবে? সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে, মাদকের কাছে। আমরা হয়ত নতুন ধরনের সামাজিক অপরাধ দেখব। এটি হলো প্রভাব এবং কেন বেকারত্ব স্পর্শকাতর ইস্যু।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বিক্ষোভের দিকে নজর রেখে জর্ডান বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এমনকি স্থানীয়দের কাজে নিয়োগ দিলে নগদ পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণত দেশটির শিল্পখাতে অভিবাসীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া দেশটির কৃষি ও উৎপাদন খাতের উন্নতির জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব খাতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও খারাপ পরিবেশের কারণে জর্ডানি কাজ করতে আগ্রহী না।
হয়ত আরও বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো চিরাচরিতভাবে যেসব আবশ্যক সামাজিক চুক্তি রয়েছে সেগুলো হয়ত নতুন করে লিখতে হবে।
কয়েক দশক ধরে তেল সমৃদ্ধ দেশ ও তাদের প্রতিবেশীরা, যেমন জর্ডান ও মিসর তাদের স্নাতক পাসদের সন্তুষ্ট রাখতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হতো। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে স্বৈরাচারের দরকষাকষি হিসেবে দেখতেন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে নাগরিকদের চাকরি ও সুবিধা দেওয়া যাতে করে তারা বেশি দাবি উত্থাপন না করে।
বৈরুতের লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ফিন্যান্সের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদ আরাইসি সংযুক্ত আরব আমিরাতে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, সেখানে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদেরই সরকারি চাকরি রয়েছে। যখন তিনি তাদের কার্যালয় সফরে গিয়েছিলেন তখন তাদের কর্মচাঞ্চল্য না থাকায় অবাক হয়েছেন।
আরাইসি বলেন, যদি তাদের কার্যালয় ক্রেতাদের কোনও তালিকা তৈরি করছিল তখন তারা মাইক্রোসফট এক্সেলে নাম তুলে ধরার কাজে সহযোগিতা করছিল। শিক্ষার্থীদের পূর্ণ কর্মীদের মতোই বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, এমনকি তাদের এই বিষয়ে সাধারণ জানাশোনা না থাকলেও। অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, সরকার তাদের খুশি রাখার জন্য চাকরি দিয়েছে।
সাম্প্রতিক দশকে শাসক ও জনগণের মধ্যকার এই কৌশল চাপে পড়েছে। তরুণদের সংখ্যা বেড়েছে, তাদের চাকরি ও সেবার দাবি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে তেলের দাম কমেছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতিতে সংকট আরও তীব্র করেছে।
অতীতের ব্যবস্থাটি আর কার্যকর না থাকলেও বিকল্প কিছু সৃষ্টি হয়নি। আইএলও’র আরব বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক ডারু বলেন, সামাজিক চুক্তি নবায়নের সময় এসে গেছে, সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা চাওয়া হচ্ছে।
ব্রুকিংস দোহা’র গবেষণা বিভাগের পরিচালক নাদের কাব্বানি মনে করেন, সিঙ্গাপুরের মতো দেশ এই রূপান্তর সহজে করতে পেরেছে বেসরকারি খাতকে গড়ে তোলে। এজন্য তাদেরকে স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে বাদ দিতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একটি প্রধান কারণে এমনটি করতে পারছে না। তিনি বলেন, এটি হলো পূঁজিবাদ সংশ্লিষ্ট। কর্তৃত্ববাদী দরকষাকষির কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পার্থক্য হলো তারা এখনও বেসরকারি খাতে হস্তক্ষেপ কমাতে পারেনি। যখন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বেসরকারি খাত নিয়ে কথা হয় তখন তাতে শাসকদের ঘিরেই তা আবর্তিত হয়। যদি ব্যবসায়ীরা শাসকদের ঘনিষ্ঠ হন তাহলে তাদের উন্নতির সুযোগ রয়েছে, অন্যথায় তাদের কোনও সুযোগ নেই।
এই স্বজনপ্রীতি সব পর্যায়ে অর্থনীতিতে রয়েছে। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ না থাকা তরুণরা। কারণ এতে করে তারা কাজের কোনও সুযোগ পাচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে।
তিন বছর পূর্বে প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক পাস করা রুকাইয়া জাকারিয়া (২৬) বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমার বন্ধুরা সব সময় কথা বলে। অনেক সময় একেবারে আশাহীন মনে হয়। কারণ চাকরি পাব না জেনেও আবেদন করতে হয়।
মৌলিক পরিবর্তন না হলে শরীফের মতো কফির দোকানগুলোই উন্নতি করতে পারবে। যেখানে দুপুরে তরুণরা অলস বসে সময় কাটায়।








