সৌদি সরকারের অফিশিয়াল ‘নুসুক হজ’ প্ল্যাটফর্মের নানামুখী জটিলতা এড়াতে বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিক ও প্রবাসীরা। সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে আবেদন না করে বাংলাদেশের স্থানীয় হজ কোটা ও ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে তারা পবিত্র হজ পালনে যাচ্ছেন।
পরিবারের সঙ্গে দেখা করা, একসঙ্গে হজযাত্রা নিশ্চিত করা এবং অপেক্ষাকৃত কম খরচের কারণে এই রুট জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এর পেছনে তৈরি হচ্ছে কিছু কূটনৈতিক ও আইনি জটিলতা। একইসাথে দীর্ঘ যাত্রাপথের শারীরিক ক্লান্তি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতার মুখে পড়ছেন প্রবাসীরা।
তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই বিকল্প যাত্রা ফলে দেশের এভিয়েশন ও হজ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রবাহ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ দুই মৌসুমে অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যেখানে উচ্চ ব্যয়ের কারণে অভ্যন্তরীণ কোটার প্রায় ৪০ হাজার স্লট ফাঁকা থেকে যায়, সেখানে প্রবাসীদের আগমন স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি ও এভিয়েশন খাতে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। শুধু যুক্তরাজ্য থেকেই এসেছে ৩.১৬ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীরা দেশে এসে স্থানীয় এজেন্সির প্যাকেজ ক্রয়, অভ্যন্তরীণ বিমান টিকিট ও আনুষঙ্গিক কেনাকাটায় অর্থ ব্যয় পর্যটন ও সেবা খাত সরাসরি বাড়তি রাজস্ব অর্জন করছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বহুল সিলেটের ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী হজে যাচ্ছেন।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত লতিফ ট্রাভেলস বিগত মৌসুমে হাজারও বাংলাদেশি হজযাত্রীর পাশাপাশি শত শত প্রবাসীকেও সেবা দিয়েছেন। আগামী মৌসুমে এই চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জহিরুল চৌধুরী শিরু। তিনি জানান, দেশ থেকে কাংঙ্ক্ষিত বছরেই হজের নিশ্চয়তা থাকায় এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে প্রবাসীরা দেশীয় এজেন্সির শরণাপন্ন হচ্ছেন।
প্রবাসীদের এই বিকল্প বেছে নেওয়ার মূল কারণ নুসুক ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত ও পদ্ধতিগত ত্রুটি। অনেক সময় একই পরিবারের সদস্যদের আবেদন একসঙ্গে অনুমোদন পায় না। শরিয়াহ অনুযায়ী নারী হজযাত্রীদের জন্য মাহরাম সঙ্গে থাকা বাধ্যতামূলক হলেও নুসুকের একক অনুমোদনের কারণে তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ছাড়া দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ আবেদন বাতিলের ঝুঁকি এড়াতে প্রবাসীরা পরিচিত এজেন্সির নিশ্চয়তাকেই বেছে নিচ্ছেন।
তবে অর্থনৈতিক স্বস্তি থাকলেও এই যাত্রাপথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লন্ডন থেকে ঢাকা হয়ে জেদ্দা বা মদিনা পৌঁছানো এবং একই পথে ফেরত আসার দীর্ঘ ভ্রমণ বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের শারীরিভাবে ক্লান্তিতে ফেলে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় আইনি ও কনস্যুলার সুরক্ষা ক্ষেত্রে। যেহেতু প্রবাসীরা বাংলাদেশি কোটা ও পাসপোর্টের অধীনে সৌদি আরবে প্রবেশ করেন, তাই সৌদি প্রশাসনের কাছে তারা শুধুই বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হন। ফলস্বরূপ হজের তীব্র গরমে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে জেদ্দা বা রিয়াদের ব্রিটিশ দূতাবাসের কনস্যুলার সেবা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়ার কোনও সুযোগ থাকে না। পুরো দায়িত্ব বর্তায় বাংলাদেশ মিশন ও স্থানীয় এজেন্সির ওপর।
সৌদি আরবের কঠোর হজ বিধিমালার কারণে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ সেখানে ব্যবহার করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে হাজীরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদিতে প্রবেশ করেন আবার সৌদি থেকে হজ শেষে সরাসরি যুক্তরাজ্যে ফিরতে গিয়ে ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করতে গেলে এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, পর্যটন ভিসা বা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) দিয়ে কোনোভাবেই হজ পালন বৈধ নয়।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, প্রবাসীদের উচিত প্যাকেজ কেনার আগেই চিকিৎসা ও জরুরি পরিস্থিতির আইনি দায়বদ্ধতা সম্পর্কে এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা নেওয়া।

তেলের দাম ছাড়ালো ১০৭ ডলার
হুথিদের লক্ষ্য করে সৌদির ৫৮ দফা বিমান হামলা, পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি







