প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য। এবার ট্রাম্প বোমা ফাটালেন লিবিয়ার সাবেক শাসক মোয়াম্মার গাদ্দাফিকে নিয়ে। সিবিএস চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, কয়েক বছর আগে গাদ্দাফির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রচুর টাকা কামিয়েছিলেন তিনি। অথচ লিবিয়ার এই শাসককে উৎখাত করতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালিয়ে বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করে।
মার্কিন এ ধনকুবের বলেন, ‘মনে রাখবেন আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে গাদ্দাফির সঙ্গে চুক্তি করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেছি। তিনি এ দেশে এসেছিলেন এবং আমার সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হন। কারণ তার একটা থাকার জায়গা খুব দরকার ছিল। উনি তো আমার ভাগ্য খুলে দিয়েছিলেন। এস্টেট ভাড়া নিলেও কোনও দিন সেখানে থাকেননি। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!
তবে ট্রাম্পের দাবি, নিউ ইয়র্কের এস্টেট ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে লিবিয়ারি স্বৈরাচারি শাসক গাদ্দাফি যুক্ত ছিলেন তা নাকি জানতেন না।
ট্রাম্প যে ঘটনার কথা বলছেন তা ২০০৯ সালের। ওই বছর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন গদ্দাফি। কিন্তু সেখানে বেদুইন স্টাইলের তাঁবু খাটানোর জন্য একটা বড় জায়গা প্রয়োজন ছিল। আর সে জন্যই পাগলের মতো জায়গার খোঁজ করছিলেন গদ্দাফির লোকজন। ম্যানহাটানের সেন্ট্রাল পার্ক এবং এঙ্গেলউডের আপার ইস্ট সাইডে জায়গা পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি। ওই সময় নিউ ইয়র্কের বেডফোর্ডে ট্রাম্পের ২১৩ একরের সেভেন স্প্রিং এস্টেটের দিকে নজর যায় তাদের। সেই বিশাল জায়গা ভাড়া করে তাঁবু খাটানোর কাজ শুরু করেন গাদ্দাফির অনুসারীরা।
সাদা তাঁবু, তার পাশে দাঁড়িয়ে উট আপন মনে কী যেন চিবোচ্ছে, আর তার পাশে তাল গাছ -নিউ ইয়র্কের বুকে এক টুকরো বেদুইনের জীবন। গাদ্দাফি সেই তাঁবুতে কখনও না থাকলেও অসাধারণ এই নির্মাণ নিউ ইয়র্কবাসীর নজর কেড়েছিল।
২০১১ সালে লিবিয়ায় ‘সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর’ জন্য বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলো। এতে ক্ষমতাচ্যুত হন লিবিয়ার চার দশকের শাসক গাদ্দাফি। এরপর তাকে হত্যা করে দেশটির বিদ্রোহীরা। এ সময় ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। যিনি এখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াই করতে ডেমোক্রেট দলের হয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী।
এদিকে, ট্রাম্পের একের পর এক এই বিতর্কিত মন্তব্য রিপাবলিকানদের চিন্তা ক্রমেই বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে বিচারক গঞ্জালো কুরিয়েলের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের একের পর এক তোপ। ট্রাম্প বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে আইনি মামলা চলছে সেই মামলার বিচারক কুরিয়েল। নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প বার বার বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হতে পারলে আমেরিকা-মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল তুলে দেবেন তিনি। সম্প্রতি ট্রাম্প আরও বলছেন, কুরিয়েল যেহেতু জন্মসূত্রে মেক্সিকান, তাই ট্রাম্পের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ করবেন তিনি। আর সেই আক্রমণ আরও তীব্র করে রবিবারের সাক্ষাত্কারে বলেছেন, মুসলিম বিচারকদের থেকেও বিদ্বেষমূলক আচরণের ভয় পাচ্ছেন তিনি। কারণ আমেরিকায় মুসলিম প্রবেশ আটকাতেও দেয়াল তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য সমালোচনার মুখে পড়েছে। রিপাবলিকান নেতাদের চিন্তা, এ ধরনের বিভেদমূলক মন্তব্য করতে থাকলে ল্যাটিনো ভোটারদের সমর্থন হারাবেন ট্রাম্প। ফের ‘ব্যারি গোল্ডওয়াটার এফেক্ট ’-এর আশঙ্কা করছেন তারা। অ্যারিজোনার সেনেটর গোল্ডওয়াটার ১৯৬৪ সালে জিওপির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন। রক্ষণশীল এই নেতা সিভিল রাইটস অ্যাক্টের বিরোধিতা করে আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের সমর্থন হারিয়েছিলেন।আর তার পুরো সুবিধাটা পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও ল্যাটিনো ভোটারদের ভোট হারানোর ভয় একইভাবে তাড়া করে ফিরছে রিপাবলিকানদের।
কেন্টাকির সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলছেন, ‘আমি এটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত। আমেরিকা তো বদলাচ্ছে। রোনাল্ড রেগান যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন ৮৪ শতাংশ ভোটদাতাই ছিলেন সাদা চামড়ার। আর নভেম্বরের ভোটে সাদা চামড়ার ভোটার মাত্র ৭০ শতাংশ। সেক্ষেত্রে ল্যাটিনো আমেরিকানদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।’
এক সময় ম্যাককনেলই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রশংসা করেছিলেন। অথচ এখন তিনিই মনে করছেন, বিভেদমূলক নীতি ট্রাম্পের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকেই অন্য কোথাও থেকে আমেরিকায় এসেছি। প্রায় সব আমেরিকানই কোনও না কোনওভাবে শরণার্থী। কেউ নিজে ছোটবেলার এখানে এসেছেন, কারও পূর্বপুরুষ কোনও এক সময় ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে এসেছিলেন। আমেরিকায় ঠিকমতো কাজ চালাতে এই শরণার্থীদেরও তো প্রয়োজন। সেটা ট্রাম্পকে বুঝতে হবে।’ সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।
/এএ/








