হোয়াইট হাউসকে ব্যবহার করার জন্য টাকা খরচ করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে তদন্ত করছে যে দলটি তাদের প্রধান রবার্ট মুলার জানিয়েছেন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় রাশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যকেও তারা সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। আরব আমিরাতের উপদেষ্টা জর্জ নাদেরকে সন্দেহের আওতায় রাখা হয়েছে। আর ইসরায়েলের সমর্থক এক ব্যবসায়ীর লেখা ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি চিঠি থেকে জানা গেছে, সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আরব আমিরাতের ভূমিকার কথা। সঙ্গে নতুন আলো পড়েছে জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে। ট্রাম্পের পক্ষে টাকা ঢেলে মধ্যপ্রাচ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন প্রভাবিত করেছে কি না সে বিষয়সহ প্রাসঙ্গিক আরও কিছু বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট মনিটর।
লেবানিজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান জর্জ নাদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন জায়েদের উপদেষ্টা। তিনি হোয়াইট হাউসের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সন্দেহজনক যোগাযোগ করেছেন, মনে করে তদন্তকারী দল। তাদের সন্দেহ, মধ্যপ্রাচ্যে আরব আমিরাতের নীতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিশ্চিত করতে তদবির করেছেন জর্জ নাদের। তদবির করা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে নিষিদ্ধ না হলেও টাকা ঢেলে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা আইনবিরুদ্ধ। জর্জ নাদের এমন কোনও কিছুর সঙ্গে জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়ে তদন্ত করছে যে তদন্তকারীরা তাদের প্রধান রবার্ট মুলার জানিয়েছেন, আরব আমিরাতের প্রভাব খাটানোর বিষয়টিও তারা তদন্ত করে দেখছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, গত বছরে নাদের ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার ও সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে বৈঠক করতে বহুবার হোয়াইট হাউসে গেছেন। তার এত ঘন ঘন হোয়াইট হাউসে বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন তদন্তকারীরা।
মুলারের নেতৃত্বাধীন তদন্তকারীরা এ বিষয়ে নাদেরসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে জেরা করেছেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য এটা খুঁজে বের করা, ট্রাম্পের নির্বাচনি তহবিলে টাকা ঢেলে আমিরাত নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল কি না তাদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য।
মুলার এর আগ পর্যন্ত ১৯ জন ব্যক্তিকে ঘিরে তদন্ত চালাচ্ছিলেন যারা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন। কিন্তু এখন ওই তদন্তকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকেও সমগুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এর আগে মুলার মাইকেল ফ্লিনের বিষয়েও তদন্ত করেছেন। ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনের রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা ও তুরস্কের সরকারের হয়ে কাজ করার বিষয়ে ওই তদন্ত চলেছিল।
জর্জ নাদেরকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কট্টর সমর্থক কোটিপতি ইলিয়ট ব্রয়ডির লেখা একটি চিঠি নিউ ইয়র্ক টাইমসের হস্তগত হয়েছে। সেই চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে আরব আমিরাতের চাওয়া অনুযায়ী নীতি প্রণয়নে হোয়াইট হাউসকে রাজি করাতে নিয়োজিত প্রচেষ্টার উল্লেখ রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,ব্রয়ডি ওই চিঠিতে তার নিজের চেষ্টার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বাইরে একান্ত বৈঠকে মিলিত হতে ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল এইচ আর ম্যাকমাস্টার ওই অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন বারংবার।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে সরাতে ট্রাম্পের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নয় সৌদি ও আরব আমিরাত। খোলামেলা সমর্থন করার অবস্থান যদি তাদের নাও থাকে, তবু এটা নিশ্চিত যে অন্তত তারা কোনও আপত্তি জানাবে না। জেরুজালেমে দূতাবাস সিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাদের গোপন মনোভাব প্রকাশ হয়ে পড়ায় বিষয়টি নতুন করে বোঝার সুযোগ পাওয়া গেছে, মনে করে মিডল ইস্ট মনিটর।
দেশ দুটি আগে লোক দেখানোর জন্য ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরানোর সিদ্ধান্ত ও সে বিষয়ে সৌদি আরবের নিরবতা, যুক্তরাষ্ট্রের আরেক সহযোগী জর্ডানকে খুবই অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছিল ওই সময়। ওই পরিস্থিতিতে আম্মান আঙ্কারার সঙ্গে যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করেছিল।
তুরস্ক ততদিনে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি-আরব আমিরাতের যৌথ প্রভাবের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে ওই অঞ্চলের বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে মনস্থির করে ফেলেছিল। যদিও ইরানের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আঙ্কারাও চিন্তিত ছিল, কিন্তু সেটা তারা তাদের মত করে মোকাবেলা করার কথা মনস্থির করেছিল। ফলে কাতারের ওপর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত অবরোধ আরোপ করলে তুরস্ক প্রকাশ্যে কাতারের পক্ষাবলম্বন করেছিল।
সূত্ররা মিডল ইস্ট মনিটরকে জানিয়েছে, আরব আমিরাতই সৌদির যুবরাজ সালমান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জামাতা কুশনারের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই, মুলারের তদন্ত যুবরাজ সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর বরবাদ করে দিতে পারে।
এমন সময়ে এরকম একটি বিষয়ে তদন্তের তথ্য সামনে আসায় অনেকের কাছেই তা বিরক্তিকর ও বিব্রতকর হিসেবে দেখা দিতে পারে। যেমন সৌদির যুবরাজ সালমান যুক্তরাষ্ট্র সফরের উদ্দেশে শনিবারে যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। সালমানের সফরতালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও মিশরের নামও রয়েছে।
সামনে আসা এসব নতুন তথ্য যুক্তরাষ্ট্র সফরে রওনা হওয়া যুবরাজ সালমানের সফরকে কণ্টকিত করবে সন্দেহ নেই। কারণ নিজ দেশে দুর্নীতি বিরোধী খুব জোরালো অবস্থান জানান দেওয়া যুবরাজ সালমানের দেশের নামও জড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের সঙ্গে।








