গত ৮ মে নরসিংদী থেকে শিকলে বাঁধা ছোট মেয়েকে নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আসেন তার বাবা ও চাচা। সেখানে ভর্তি হওয়ার পর সমস্যা দেখা দেয় মেয়ের সঙ্গে নারী ওয়ার্ডে কে থাকবেন সেটা নিয়ে। যেহেতু নারী ওয়ার্ড, তাই সেখানে পুরুষ ঢোকা বারণ বলে মেয়ের সঙ্গে বাবাও থাকতে পারবেন না। এদিকে গ্রামের বাড়িতে থাকা মাও অসুস্থ, তার পক্ষে ঢাকায় আসা সম্ভব নয়, আর পোশাক কারখানায় কাজ করা বড় বোন আছেন গাজীপুরে। দুপুর আড়াইটায় বাবা তাকে ফোন করলে তিনি জানালেন, কাজ ফেলে তিনি আসতে পারবেন না। অথচ খুবই ভায়োলেন্ট মেয়েটিকে তখন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়ে গেছে। ডিউটি ডাক্তারসহ অন্যরা বলছেন, যেকোনও একজন নারী অ্যাটেনডেন্ট লাগবেই, আর অসহায় মুখ করে বাবা বলছেন, ‘কেউ তো নাই, কারে আসতে বলবো।’
শুধু এই বাবাই নন, এরকম সমস্যায় পড়তে হয় এই হাসপাতালে নারী রোগী নিয়ে আসা অনেক স্বজনকেই। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই হাসপাতালে নারী ওয়ার্ডে থাকার জন্য আয়াদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। তাই কোনও রোগীর সঙ্গে যদি নারী স্বজন আসতে না পারেন তাদেরকে পড়তে হয় সীমাহীন দুর্ভোগে।
অনুসন্ধানে এবং হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বিশেষায়িত এই হাসপাতালে সব ধরনের জনবল সংকট প্রবল। বছরের পর বছর জনবল সংকটের জন্য দেওয়া আবেদনপত্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে রয়েছে।অথচ এটা আরও ত্বরান্বিত হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেল, হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ’র ওপরে রোগী চিকিৎসা সেবা নেন, একই সঙ্গে এখানে বিভিন্ন কোর্সও পড়ানো হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে জনবল নেই একেবারেই। সহযোগী অধ্যাপকের চারটি পদ বর্তমানে শূন্য। চাইল্ড সাইকিয়াট্রিক, সাইকো থেরাপিসহ চারটি বিভাগের চারটি পদ শূন্য। বিদ্যমান পদের মধ্যেই এগুলো শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। ‘অকুপেশনাল থেরাপিস্ট’দের দরকার হয় এই হাসপাতালে। এই থেরাপিস্টরা ক্রনিক (সিজোফ্রেনিয়া, অটিজম সংক্রান্ত দীর্ঘ মেয়াদি মানসিক রোগী) রোগীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এখানে ‘অকুপেশনাল থেরাপিস্ট’ এর পদ সৃষ্টিই করা হয়নি। প্রায় দুই বছর আগে হাসপাতাল থেকে এ জন্য আবেদন করা হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সেটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। এ কারণে সিআরপি থেকে এই হাসপাতালে থেরাপিস্ট এসে কাজ করে যান, কিন্তু এটা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়।
আরও পড়ুন: ‘কাজে আসছে না’ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
সাইকিয়াট্রিক নার্সের প্রয়োজন আছে। কিন্তু এখানে সাইকিয়াট্রিক নার্স নেই। যারা বর্তমানে আছেন তারা অনেক বছর ধরে কাজ করার ফলে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। কিন্তু উন্নত বিশ্বে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং একটি স্বতন্ত্র এবং আলাদা বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে যেটা আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে সাইকিয়াট্রিক নার্সিংয়ের জন্য আলাদা কোনও কোর্সই নেই। যদি এ বিষয়ে ছয় মাস বা এক বছর মেয়াদি কোনও শর্ট কোর্সও থাকতো তাহলে অনেক বেশি উপযোগী হতো রোগীদের, কারণ, মানসিক রোগীদের জন্য এ বিষয়ে স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত নার্স দরকার। আবার এসব নার্সদের চাকরিতে বদলিও হয়ে যাচ্ছে। কোনও একজন নার্স পাঁচ বছর এখানে কাজ করার পর অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি বদলি হয়ে যাচ্ছেন অন্য কোনও হাসপাতালে, ফলে বিশেষায়িত যে সেবা দরকার সেটার কোনও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয় না বলে জানালেন, ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
অন্যান্য হাসপাতালে যেমন একজন চিকিৎসক একজন রোগীকে যতো সময় ধরে দেখতে পারেন এই বিশেষায়িত হাপসাতালে তার চেয়েও বেশি সময় নিয়ে দেখতে হয়। ফলে যতো সংখ্যক চিকিৎসক রয়েছেন তাদের দিয়েও আউটডোর এবং ইনডোরে চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না, বিদ্যমান শূন্যতা থাকা ছাড়াও এখানে আরও অনেক বেশি বিভিন্ন বিভাগে জনবল দরকার, একই সঙ্গে দরকার আরও নতুন কিছু পদ সৃষ্টি করা। এছাড়া, এই হাসপাতালের এখন ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন (ভবন সম্প্রসারণ) খুব জরুরি। কারণ, এই ইনস্টিটিউট যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন কোনও কোর্সও ছিল না। কিন্তু গত চার বছর ধরে কয়েকটি স্নাতকোত্তর কোর্সও চালু হয়েছে। সেজন্য যেমন এখন ভবনটি বড় করা দরকার, তেমনি দরকার সেখানকার জনবল জানালেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতাল ঘুরে জানা গেল, নারী ওয়ার্ডে আয়ার সংখ্যা অপ্রতুল। নারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দিয়ে ওয়ার্ড লেডির কাজটা করাতে হয়। কারণ যে দুই জন আয়া রয়েছেন তারা সারাদিন কাজ করতে পারেন না, এটা সম্ভবও না। আবার নারী ওয়ার্ডে পুরুষ ওয়ার্ড বয়দের দেওয়া হয় না নিরাপত্তা এবং নৈতিকতার দিক দিয়ে এটি অনেক বড় একটি সমস্যা, যেটি প্রতিনিয়ত আমাদের ভোগাচ্ছে বলেন ডা. হেলাল উদ্দিন।
আরও পড়ুন: এ বছর হজে যেতে পারছেন না প্রায় ৩৮ হাজার যাত্রী
দু’শো বেডের হাসপাতাল হিসেবে এখানে সব ধরনের জনবলই কম বলে জানালেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফারুক আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এর মধ্যেও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং মেডিক্যাল অফিসারের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল, রয়েছে নিরাপত্তারক্ষীদের সংকটও। অন্যান্য হাসপাতালে রোগীরা স্বেচ্ছায় থাকেন, আর এই হাসপাতালের রোগীরা ভায়োলেন্ট, তাদের ধরে রাখতেই নিরাপত্তারক্ষীদের দরকার হয়। ফলে এই হাসপাতালের সিকিউরিটির বিষয়টিও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষায়িত এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই হাসপাতালে যেখানে দারোয়ান থাকা উচিত অনেক বেশি সেখানে দারোয়ান আছেন আট জন, বলেন হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
পঞ্চাশ শয্যার ড্রাগ এডিকশন ইউনিট (মাদকাসক্ত নিরাময়) যোগ হয়েছে এখানে কয়েক বছর আগে, কিন্তু এর জন্য আলাদা কোনও জনবল এখনও দেওয়া হয়নি, যার কারণে সঠিকভাবে সেটি চালানো যাচ্ছে না। আমরা এসব কিছু জানিয়ে আবেদন দিয়েছি, কিন্তু সেই ফাইলের গতি তরান্বিত হয় না, যেটা আরও দ্রুত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রায় দুই বছর আগে করা সেই আবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ছিল এতদিন, বর্তমানে সেটি রয়েছে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে, সেখান থেকে অর্থমন্ত্রণালয়ে যাবে। প্রশাসনিক এই কাজগুলো আরও দ্রুত হলে সবার সমস্যারই সমাধান হয় দ্রুত, বলেন অধ্যাপক ফারুক আলম।
আমলাতান্ত্রিক এই জটিলতার কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা সবই বুঝি, কিন্তু সবসময় সবকিছু আমাদের হাতে থাকে না।
/জেএ/এমও/এমএসএম/








