রাজধানীর মহাখালীতে সাতটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা ও ভবনের নকশা চূড়ান্ত হলেও জমি দখলে না থাকায় ছয় মাস ধরে চেষ্টা করেও কাজ শুরু করতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইপিআই ভবন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সেন্টার ফর মেডিক্যাল বায়োটেকনোলজি ভবন, জাতীয় ব্লাড সেন্টার ভবন, সেবা পরিদফতরের প্রধান কার্যালয় এবং অটিস্টিক একাডেমি ভবন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর মহাখালীর সাততলা বস্তি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। গত কয়েক মাস আগেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদফতরের কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে মহাখালীর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স তৈরির আলোচনা হয়। বেদখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারের ব্যাপারে সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু আদালতের হস্তক্ষেপে অধিদফতর জায়গাটি দখলে নিতে পারেনি। এর ফলে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে মহাখালীর সাততলা বস্তির পরিধি।
আরও পড়ুন: আইলার সাত বছর: এলাকা ছাড়ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা
এর আগে মহাখালীর ‘সাততলা বস্তি’ উচ্ছেদের জন্য ২০০৩ সালে নোটিশ জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই সময় বস্তিবাসীর পক্ষে ওমর ফারুক নামের এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের শুনানি শেষে বস্তি উচ্ছেদসংক্রান্ত নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন হাইকোর্ট। আবার ২০১০ সালেও একবার উচ্ছেদের চেষ্টা চালায় স্বাস্থ্য অধিদফতর।
সরেজমিনের ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের দখলে রয়েছে এ জায়গা। তারা ঘরবাড়ি তুলে ভাড়া দিয়েছেন, যেখান থেকে মাসে আয় হয় প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা। তবে এর সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও জড়িত বলে সূত্র জানায়। যার কারণে এই বস্তি সরানো সম্ভব হয় না। আর সিটি করপোরেশন জায়গাটিকে আদর্শ বস্তি হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা নিয়েছে সম্প্রতি। প্রায় ৪০ বছরের পুরনো এই বস্তি সবসময়ই ক্ষমতাসীনদের দখলে থাকে বলে জানায় বস্তিবাসীসহ স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র। রাজধানীর অন্যতম মাদক ব্যবসাও হয় এই সাততলা বস্তিতেই। এখানে প্রতিটি ঘরের ভাড়া প্রায় দুই থেকে আড়াই-তিন হাজার টাকা। এর বাইরে রয়েছে বিভিন্ন রকম দোকান, বাজার, রিকশা গ্যারেজ এবং এই এলাকায় চলা ইজিবাইকের স্ট্যান্ড।
গত ২৫ মে দুপুর একটার দিকে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ‘জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নতুন ভবন নির্মাণের নির্ধারিত স্থান’ লেখা সাইনবোর্ডের জায়গায় রাখা হয়েছে রিকশা, স্কুল ভ্যান, ভেতরে গরু চরছে, বহিরাগতরা ভেতরে মাদক সেবন করছে। সবাই সবকিছু দেখলেও বলার কেউ নেই। কারণ সবাই জানেন এর সঙ্গে কারা জড়িত। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে সরকারও পেরে উঠবে না এমনি মন্তব্য স্থানীয়সহ সংশ্লিষ্টদের। যদিও প্রভাবশালীরা সরকারি দলেরই সদস্য বলে জানালেন স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মহাখালীতে জাতীয় জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জমি ৪৭ দশমিক ৮৮ একর এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ৩৫ একর জমি আছে। এই জমি থেকে আট একর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। এই বস্তি এলাকায় আরও আছে জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, নিপসম, বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন, আইসিডিডিআরবিসহ ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সাততলা বস্তির একেবারে শেষ প্রান্তে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। হাসপাতালটির সামনে-পেছনে বস্তি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দীন মো. নুরুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ৮ একর জমি খালি বা অবৈধভাবে দখলে রয়েছে, যা দখলমুক্ত করে একটি প্লটে রূপান্তর করা সম্ভব। অনেক দিন ধরেই বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যালয় বা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ থাকছে না
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ডা. এসকে রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি জায়গা খালি করা এমন কোনও কঠিন বিষয় না। সব মন্ত্রণালয় এটা করতে পারে, তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন পারবে না। এখানে শুধু উদ্যোগের অভাব এবং মন্ত্রণালয়ের শিথিলতার কারণে এটা হচ্ছে না।
সাতরাস্তার ওপরে বিশাল ট্রাকস্ট্যান্ড ছিল, তারা খুব প্রভাবশালীও ছিল কিন্তু মেয়র আনিসুল হক সে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে দিল একদিনে। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক বেশ কিছু জায়গা খালি করলেও নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারেননি। যার ফলে আবার দোকানপাট উঠে গেছে, ফিরে গেছে আগের অবস্থানে। কোনওভাবেই এই জায়গা খালি করা যাচ্ছে না। অথচ আমাদের আরও বড় অফিস দরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সবাই এ বিষয়ে জানেন। কিন্তু সেটি কার্যকর হচ্ছে না। অবিলম্বে জায়গার ব্যবস্থা করাসহ ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন আর এসব বিষয়ে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, বলেন ডা. এসকে রায়।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বাসুদেব গাঙ্গুলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ আরও অনেকেই মিটিং করেছেন। তারা ১২ সদস্যের একটি কমিটিও করে দিয়েছেন বস্তি খালি করার কাজ করার জন্য। তারা কাজ করছেন। বস্তি খালি হলেই সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
এজে/








