আইলার সাত বছর: এলাকা ছাড়ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা

মো: আসাদুজ্জামান, সাতক্ষীরা
২৫ মে ২০১৬, ২০:৫৩আপডেট : ২৫ মে ২০১৬, ২২:১১

বিশুদ্ধ পানির অভাব উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের জনজীবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় আইলায়। সাত বছর কেটে গেলেও সেই ক্ষত শুকায়নি এ এলাকার মানুষের। ক্ষতিগ্রস্ত অনেককেই ঝড়ের পর সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে নতুন ঘরবাড়ি, বেড়িবাঁধ, রাস্তাঘাট তৈরি করে দেওয়া হয়। কিন্তু নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বাঁধ ও অনেক রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। লোনা পানির কারণে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত, তাই গো-খাদ্যের চরম সংকট। চিংড়ি চাষেও মন্দা। অন্যদিকে আছে খাবার পানির চরম সংকট। এছাড়া কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অন্যখানে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে এই এলাকার মানুষ।
তবে ক্ষত কাটিয়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বনজীবী ও বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, আইলার তাণ্ডবে অসংখ্য জীবজন্তু মারা যায় ও সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে প্রচুর গাছগাছালির ক্ষতি হয়। তবে গত সাত বছরে সুন্দরবন পুরনো চেহারায় ফিরে এসেছে।
২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও এর প্রভাবে সৃষ্ট সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের জনপদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপকূলে প্রাণ হারান ১০৯ জন মানুষ। সাতক্ষীরার গাবুরা ও পদ্মপুকুর, মুন্সিগঞ্জ ও আশাশুনির প্রতাপনগরে মারা যায় ৭৩ জন নারী পুরুষ ও শিশু। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন ৭০ হাজার মানুষ। সুন্দরবনের প্রাণীকূল ও উদ্ভিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
স্থানীয়রা জানান, গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নে বরাবরের মত এখনও রয়ে গেছে খাবার পানির তীব্র সংকট। কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদী বেষ্টিত এই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। রেশনিংয়ের মাধ্যমে কিছু মানুষ খাবার পানি পেলেও অন্যদের জন্য পুকুরের পানিই একমাত্র ভরসা। নতুন করে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় আতঙ্ক বেড়েছে এই উপকূলীয় এলাকার প্রায় দুই লাখ মানুষের।

আর পড়ুন: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সব জামায়াত নেতাকে ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’ খেতাব দেওয়ার প্রস্তাব

৯নং সুরা গ্রামের মোহম্মদ আলী, আব্দুর রহিম, কুলসুম বিবি জানান, জমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন ফলজ গাছ মারা যাচ্ছে। জমিতে ধান, পাটসহ বিভিন্ন শাকসবজির ফলন ভালো না হওয়ায় সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। অনেক স্থানে ফসল না হওয়ায় মাঠের পর মাঠ খালি পড়ে আছে। মাঠে ঘাস না জন্মানোয় গবাদি পশু পালন বন্ধ হয়ে গেছে।

গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আজম টিটো জানান, এখানে রয়েছে সমুদ্রঘনিষ্ঠ প্রমত্তা নদী। তার ওপর ভঙ্গুর বাঁধ। এর স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান সব মানুষ। গাবুরায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এখানে তীব্র খাবার পানি সংকট। বেড়িবাঁধে ব্যপক ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে। এখানে ৭টি মাত্র সাইক্লোন শেল্টার। ছোট গাবুরা ও ডুমুরিয়ায় কোনও সাইক্লোন শেল্টারই নেই।

পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামের দোকানদার আব্দুল কাদের জানান, এলাকায় কাজ না থাকায় জীবনের তাগিদে পরিবার ফেলে শতশত মানুষ সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোরসহ রাজধানী ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পদ্মপুকুরের মুদি দোকানদার ওমর আলী জানান, লবণ পানির কারণে মানুষের শরিরে চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। এখানে খাবার পানি ও গোসলের পানির সংকট। চিকিৎসার জন্য এ ইউনিয়নে কোনও ডাক্তার নেই। এখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুসের বসবাস। কিন্তু ইউনিয়নের গড়কুমারপুর, চন্ডিপুর ও পাতাখালিতে মাত্র তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে কোনও ডাক্তার না থাকায় বছরের পর বছর তা বন্ধ রয়েছে। ফলে কোন অসুখ দেখা দিলে সেখান থেকে কোনও ওষুধও পাওয়া যায় না।

আরও পড়ুন: ‘আম উৎসব’ দিয়ে বাজারে এলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম

ডুমুরিয়া গ্রামের জেলে ও বনকর্মী আবু মুসা জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা ও পদ্মপুকুরের মানুষ নদীতে মাছ ও মাছের পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। বনের কাঠ কেটেও সংসার চলতো এলাকার মানুষের। এখন তাও বন্ধ। সুন্দরবনে গোলপাতা, মধু সংগ্রহ বা কাঁকড়া ধরতে গেলে বনদস্যুদের মোটা টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়। যে কারণে অনেকে বনে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। এলাকায় খাবার পানির সংকট নিরসনের জন্য মিষ্টি পানির পুকুর খনন করা হচ্ছে। ‘কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি বেসরকারি কাজ চলছে। বাঁধ নিয়ে আমরা ঝুঁকির মধ্যেই আছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবিলম্বে পদ্মপুকুর ও গাবুরার সব বাঁধ মেরামত করা হবে।

এদিকে সুন্দরবন আপন রূপে ফিরে আসার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের আলী গাজী ও ৯ নং সোরা গ্রামের আমজাদ জানান, আইলার প্রভাবে অসংখ্য জীব-জন্তু মারা যায়। পশ্চিম সুন্দরবনের অনেক অংশ (মধ্যভাগ থেকে কিনারা পর্যন্ত) ঝড়ের তাণ্ডবে প্রায় বিরানভূমি হয়ে যায়। তবে সাত বছরে সুন্দরবন সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে। বনজীবীরা জানান, আগের মত এখন সুন্দরবনে প্রবেশ করলে গাছ-গাছালির আধিক্য চোখে পড়ে।

হরিণসহ অন্যান্য বণ্যপ্রাণীও আগের মতোই চোখে পড়ে। তবে যেসব এলাকায় বাঘের উপস্থিতি ছিল তা এখন আর নেই বলেও জানান তারা।

এ বিষয়ে সুন্দরবন বনবিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানান, আইলার পর সুন্দরবন থেকে সব ধরনের উদ্ভিদ এমনকি মধু সংগ্রহও বন্ধ রাখা হয়। বনজীবীদের সুন্দরবনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে মাত্র ৪/৫ বছরের ব্যবধানেই সুন্দরবন তার ক্ষত কাটিয়ে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পেরেছে।

/এফএস/এজে

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
বজ্রনিনাদে ভারতে বর্ষার প্রবেশ, কেরালাজুড়ে হচ্ছে ভারি বৃষ্টি
বজ্রনিনাদে ভারতে বর্ষার প্রবেশ, কেরালাজুড়ে হচ্ছে ভারি বৃষ্টি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান