পরিবারের অভিযোগ ভুল চিকিৎসার, হাসপাতাল বলছে ‘কমপ্লিকেশন’

সাদ্দিফ অভি
২৫ আগস্ট ২০২২, ২০:৪২আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২২, ২১:৪৫

রাজধানীর ইন্দিরা রোডের বাসিন্দা শেখ জসীম উদ্দিন কবিরের মেয়ে শেখ মেহবিশ জামান পাঁচ বছর ধরে পেটের ব্যথার জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। সম্প্রতি পেটের ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগীর অগ্নাশয়ে সিস্ট ধরা পড়ে। মেহবিশের চিকিৎসক বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রো ইন্টেস্টিনাল অ্যান্ড প্যানক্রিয়াটিক রোগের বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. এম এস আরফিন অ্যান্ডোস্কপি করার পরামর্শ দেন। তবে অ্যান্ডোস্কপি করার সময় একটি রক্তনালি থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলে তার অপারেশন করার প্রয়োজন হয়। তাতে রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ে।

পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার কারণে এমন অবস্থা হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা বলছেন, এটি ‘কমপ্লিকেশন’, যা যেকোনও সার্জারির সময় হতে পারে।    

শেখ মেহবিশের পরিবার জানান, পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রো ইন্টেস্টিনাল অ্যান্ড প্যানক্রিয়াটিক রোগের বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. এম এস আরফিনের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মেহবিশ। সম্প্রতি পেটের ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, তার অগ্নাশয়ে সিস্ট হয়েছে, সেটি অ্যান্ডোস্কপির মাধ্যমে অপসারণ করা যাবে। মেয়েটির বাবা জসিম উদ্দিনের অভিযোগ— অপারেশন থিয়েটারে না নিয়ে মেয়েকে অ্যান্ডোস্কপি ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ৩০ মিনিটের অপারেশন দুই ঘণ্টায় শেষ না হওয়ায় বিচলিত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। তখন চিকিৎসকের কাছে জানতে চাইলে ডা. আরফিন জানান, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন, তার আইসিইউ প্রয়োজন। সার্জারির প্রয়োজন হওয়ায় অধ্যাপক আরফিন একই হাসপাতালের সার্জন ডা. মো. ইমরুল হাসান খানকে জানালে তিনি রোগীর পরিবারকে জানান যে রোগীর রক্তনালি কেটে যাওয়ায় রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যার কারণে এই মুহূর্তে সার্জারি করা প্রয়োজন। তার রক্তচাপ কমে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।     

পরিবারের সম্মতিতে মেহবিশের অপারেশন করে রক্তক্ষরণ বন্ধ এবং আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। শেখ জসিমে আরও অভিযোগ করেন, ছয় দিনে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ ৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বিল করা হয়। পরে তা পরিশোধ করতে অনেকটা বাধ্য করা হয়। মেয়ের জীবনের কথা বিবেচনা করে টাকা দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেন শেখ জসিম।

শেখ জসিম বুধবার (২৪ আগস্ট) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। এছাড়া একই অভিযোগে আদাবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আদাবর থানার এসআই  মাধব চৌধুরী বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণ ডায়েরি তদন্তের জন্য আদালতের অনুমতির প্রয়োজন। সেটি প্রস্তুত করেছি, আজকে আদালতে পাঠিয়ে দেবো।’ 

এদিকে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পক্ষ থেকে রোগীর অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ও সিইও আল ইমরান চৌধুরী জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা একটি কমিটি করেছি তদন্ত করার জন্য। বুধবার (২৪ আগস্ট) রাত ৮টা পর্যন্ত কমিটি তদন্ত শেষ করে জানিয়েছে, এখানে কোনও গাফেলতি ছিল না। এটি একটি কমপ্লিকেশন, যা সার্জারির কারণে হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরার চিকিৎসার রেফারেন্স তুলে ধরে হাসপাতালের সার্জন ডা. ইমরুল হাসান জানান, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে যত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল অধ্যাপক আরফিন তা নিয়েছেন। সার্জারি ছাড়া ম্যানেজ করার জন্য অ্যান্ডোস্কপি ছিল প্রথম অপশন। যদি সম্ভব না হতো তাহলে দ্বিতীয় অপশন ছিল ল্যাপ্রোস্কপি। তৃতীয় অপশন হচ্ছে কেটে করা। স্যার সবদিক বিবেচনা করেই প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এটাও সাধারণ ব্যাপার, যেকোনও ইন্টারভেনশনালিস্ট ব্লিডিং শুরু হলে চেষ্টা করা, সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা নিয়ন্ত্রণ করা। সেটি যথার্থভাবে স্যার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি যখন পারেননি, তখন আমাকে জরুরি ভিত্তিতে নিজের ফোন থেকে কল দেন।

ডা. ইমরুল হাসান বলেন, ‘আমি দ্রুত সেখানে যাই এবং গিয়ে স্যারকে বলি যে ব্লিডিং বন্ধ না করে আইসিইউতে নিয়ে কোনও লাভ হবে না। স্যারের অনুমতি নিয়ে আমি পরিবারের কাছ থেকে সম্মতি নিই সার্জারি করার। তারা আমাকে বলেছেন, আপনার পক্ষে যা যা করা সম্ভব করেন। আমি জানতে চাইলাম, রোগীর ব্লাড গ্রুপ কী। আমার ব্লাড গ্রুপ আর রোগীর ব্লাড গ্রুপ সেইম। সেখানে আরও দুজন ইনস্ট্যান্ড রেডি ছিল রক্ত দেওয়ার জন্য। সৌভাগ্যবশত তারা নিজেরাই রক্ত ম্যানেজ করতে পেরেছেন। আমরা সার্জারি করেছি, এটাই ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড। সার্জারি করতে গিয়ে দেখেছি, এটা মেজর কোনও রক্তনালি কাটা গেছে এমন কিছু না। এটি পাকস্থলীর গায়ে যেখানে ছিদ্র করা হয়েছিল, সেখানেই গায়ে একটি সেল থেকে প্রচণ্ড ব্লিডিং হয়েছে। যার কারণে রোগী একরকম শকে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। আমাদের কাছে খুব খারাপ লেগেছে যে এইটুকু একটি মেয়ের সার্জারির প্রয়োজন হয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি সার্জারির কমপ্লিকেশন আছে, সেটি ম্যানেজ করার সামর্থ্য আমাদের আছে। এটি সেরকম একটি কমপ্লিকেশন এবং আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি।’

ডা. ইমরুল আরও বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে রোগী সুস্থ হয়ে বাড়িতে গেছে। মাইনর কিছু সমস্যা আছে, সেটি থাকবেই সার্জারির পর।’

বিষয়টি দুর্ঘটনাজনিত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই এটি অ্যাক্সিডেন্টাল। আমাদের কাছে কিন্তু পরিবারের অনুমতি দেওয়ার ফর্মটি আছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আজকে যে সেব্রিনা ম্যাডাম চিকিৎসাধীন আছেন সিঙ্গাপুরে, একই ধরনের প্রক্রিয়ার কারণেই ব্লিডিং হয়েছে এবং তার ফলে তিনি আইসিইউতে আছেন। আল্লাহর রহমতে আমাদের রোগীকে আমরা কিন্তু সেরকম কিছু হতে দেইনি। কমপ্লিকেশন হলেও আমরা ছেড়ে দেইনি, আমরা ম্যানেজ করেছি।’

ইমরান চৌধুরী জানান, রোগী যেদিন ডিসচার্জ হয়, তখন কারও কোনও অভিযোগ ছিল না। ছয়-সাত দিন পর আমাদের কাছে তারা অভিযোগ জানালেন। যদি আর্থিক বিষয় হতো আমাদের তখনই জানাতে পারতো, তাও তিনি করেননি। স্যারের টিমের ছয়-সাত জন সার্জারিতে কাজ করেছেন, তিনি তাদের কোনও চার্জ ধরেননি। সেখানে জীবন রক্ষা করাই প্রাধান্য ছিল। উনাদের যদি তখনও কোনও অভিযোগ থাকতো, আমাদের যে কাউকে বললেই কিন্তু আমরা গ্রহণ করতাম।

অভিযুক্ত চিকিৎসক অধ্যাপক আরফিন জানান, এমন একটা ঘটনার পর এটা স্বাভাবিক যে পরিবার আমাকে অভিযুক্ত করবে, কেন এমন হলো। দুর্ভাগ্যবশত এমন কিছু হয়নি, তারাও আমার কাছে আসেনি। ১৫ আগস্ট তারা ডিসচার্জ হয়ে বাসায় যান। এরপর একদিন ফলোআপে আসেন ইমরুল সাহেবের কাছে। আমার কাছেও আসেননি। তবে যেভাবে আমাদের বিষয়ে প্রচার করা হচ্ছে, সেটির সঙ্গে আমাদের দ্বিমত আছে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কথা বলার সময় স্মার্টফোন দ্রুত গরম হয়ে যায়? কারণ ও প্রতীকারের উপায়
কথা বলার সময় স্মার্টফোন দ্রুত গরম হয়ে যায়? কারণ ও প্রতীকারের উপায়
ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাস
ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাস
কিছু টিপস মেনে চললেই গরমে ত্বক সুন্দর রাখা যায়
কিছু টিপস মেনে চললেই গরমে ত্বক সুন্দর রাখা যায়
সত্যি কি বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজ করানো হয়
সত্যি কি বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজ করানো হয়
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের