স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে বকশিশ ছাড়া সেবা দিতে অনীহা হাসপাতালের নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের। প্রতি শিফটে নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া, সুইপার থাকলেও বকশিশ দিয়ে খুশি করা ছাড়া সেবা মিলে না কারোর। তাছাড়া রাতে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা। তবে বকশিশ পেলে যেকোনও সময় সেবা মিলে নার্স ও দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ড বয়দের। এছাড়া হাসপাতালের অন্য কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, কর্মচারীদের অবহেলায় হাসপাতালের আঙিনা ও ভেতরের কয়েকটি ওয়ার্ডে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। রোগীদের জন্য ব্যবহার করা টয়লেটগুলোও নোংরা-অপরিষ্কার। ফ্লোরে থাকা রোগীদের চারপাশেও ময়লা জমে আছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের।
সুলতানা বেগম নামে এক রোগীর আত্মীয় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি পেশায় শিক্ষক। ননদকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। রাতে একটা রোগী যদি এখানে চিৎকার করতে করতে মরেও যায় তবু দায়িত্বরত কোনও ডাক্তার, নার্স বা ওয়ার্ড বয়কে খুঁজে পাওয়া যায় না। নার্স আর ওয়ার্ড বয়রা বকশিশ ছাড়া একচুল নড়তেও নারাজ। রাত ১১টার পরেই আমাদের নিষেধ করে দেয় তাদের ডাকতে। তারা বলে, আমরাও তো মানুষ, আমাদের তো ঘুমানো লাগবে। তবে যদি তাদের হাতের মুঠোয় দু-তিনশ’ টাকা গুঁজে দেই তখন আর কোনও রাত-দিন নাই। তখন যেকোনও সময় ডাকলেই তাদের পাওয়া যাবে। হাসপাতালের দায়িত্বরত আনসাররাও টাকা ছাড়া সঠিক ইনফরমেশন দিতে চায় না।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেছেন চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনরা। তবে পেয়িং বেডে কিছুটা সেবা পাওয়া যায়। এই হাসপাতালের আশপাশে অনেক পরিত্যক্ত ডাবের খোসা আর পলিথিনের ভিতর জমে থাকা পানি রয়েছে। যার কারণে সিটি করপোরেশন বারবার মশক নিধনের ওষুধ দেওয়ার পরও মশার উপদ্রব কমছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়ে যদি পুরো হাসপাতাল নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, মশক নিধনের ওষুধ দেয়, তাহলে মশার উপদ্রব অনেকটা কমে যেতো।
রোগী নিয়ে যশোর থেকে এসেছেন এনামুল হক। তিনি বলেন, ছেলের লিভারে প্রবলেমের কারণে এক সপ্তাহ ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি আছি। আশপাশের দুর্গন্ধ আর মশার জ্বালায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। চারদিকে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। তার ওপর লোডশেডিং, গরমে অতিষ্ঠ। আসার পর থেকে একরাতে পাঁচবার বিদ্যুৎ গেছে। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই এই হাসপাতালের ফ্লোরেই কোনোমতে আছি।
রাইসুল ইসলাম নামে এক রোগীর অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে পেটের অসুখে ভুগছে। গত তিন দিন ধরে তাকে এখানে চিকিৎসা করাচ্ছি। এখানে মশার কামড়ে মেয়ের জ্বর চলে এসেছে। ডাক্তার আজ আবার ডেঙ্গু হয়েছে কিনা পরীক্ষা করতে দিয়েছে। এক রোগের চিকিৎসার জন্য এসে আবার আরেক রোগ হলো কিনা—সেই ভয়ে আছি। দিনে কয়েল জ্বালিয়ে রাখি। তবু মশার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছি না। এখানে যারা বেড পেয়েছেন তারা অনেকেই মশারি টানিয়ে ঘুমান। কিন্তু বেড না পাওয়ায় মশারি টানানোরও উপায় নেই আমাদের।
এ বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রশিদুল নবী বলেন, মশার উপদ্রব কমানোর জন্য আমরা সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় নিয়মিত মশক নিধনের ওষুধ ব্যবহার করি। হাসপাতালের পরিবেশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমাদের এখানে সিটি করপোরেশনের লোকেরা সকাল-বিকাল দুইবার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে।
নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের দায়িত্ব পালন নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, নার্স ও ওয়ার্ড বয়রা যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে অভিযোগ বাক্সে অভিযোগ লিখলে বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে আমার নেবো। আগেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অনেক নার্স ও ওয়ার্ড বয়কে চাকরিচ্যুত করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে ৯০০ বেডের বিপরীতে ১১০০-এর বেশি রোগী ভর্তি আছে। যারা বেড পায়নি তারা ফ্লোরে অবস্থান করছেন। এত রোগীর চাপে হাসপাতালে সেবা দিতে নার্সদের কিছুটা অসুবিধা হয়, পরিবেশও কিছুটা নোংরা হয়। এছাড়া দালালের বিষয়ে রোগীদের সতর্ক থেকে হাসপাতালে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।









