রাজধানীতে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোয় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার আর মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বা ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলেই ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য দেওয়া হচ্ছে ডিএনএস স্যালাইন। এবার সেই স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে ওষুধের দোকানগুলোতে। কেউ কেউ বলছেন, স্যালাইন স্টকআউট, আবার কেউ বলছেন সিস্টেম করে অন্য জায়গা থেকে ম্যানেজ করতে হবে। এসব বাহানায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিএনএস স্যালাইন।
সরেজমিন দেখা যায়, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল হাসপাতালের আশপাশের বেশিরভাগ ফার্মেসিতে ১০০০ মিলিগ্রামের ডিএনএস স্যালাইন বিক্রি বন্ধ। কয়েকটি দোকানে বিক্রি হচ্ছে, তাও চড়া দামে। গায়ের মূল্য অনুযায়ী ১০০০ মিলিগ্রামের একটি ডিএনএস স্যালাইন ১০০ টাকা (প্লাস্টিকের বোতল) এবং ৫০০ মিলিগ্রামের একটি ডিএনএস স্যালাইন ১২৫ টাকা (কাঁচের বোতল)। সেখানে দোকানিরা ১০০০ মিলিগ্রামের স্যালাইন বিক্রি করছে ৩০০ বা তারও বেশি টাকায়। অন্যদিকে ৫০০ মিলিগ্রামেরটি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়।
ঢাকা ন্যাশনাল হাসপাতালের পাশে এম. কে ফার্মেসি, মেসার্স ইমন ফার্মেসি, বীনা ফার্মেসি, কনা ফার্মেসি, ছন্দা ফার্মেসি, মোল্লা মেডিসিন কর্ণার, সেন্ট মেরিস ফার্মেসি, লায়লা মেডিক্যাল সাপ্লাইসহ অন্তত ১০টি ওষুধের দোকান রয়েছে। কোনও দোকানেই ডিএনএস স্যালাইন নেই। তবে বেশি টাকা দিলে ম্যানেজ করে দিতে পারবে, এই কথা বলে ক্রেতার কাছ থেকে বেশি দাম নিয়ে পরবর্তীতে বিক্রি করা হয়। গত ২৪ জুলাই রাতে ছন্দা ফার্মেসি ও মোল্লা মেডিসিন কর্নারে দাম তিনগুণ বেশি রাখার অভিযোগে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হন কয়েকজন ভুক্তভোগী। একপর্যায়ে দোকানি দোকানে তালা মেরে পালিয়ে যায়। ভোক্তা অধিকারে ফোন দিয়েও এর কোনও সুরাহা হয়নি।
বেশি দামে স্যালাইন ক্রয় করার পর ক্ষোভ জানিয়ে এক রোগীর বাবা আরমান হোসেন বলেন, আমার বাচ্চাটা আজ দুই দিন ধরে ঢাকা ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তার প্রথম দিনেই ডিএনএস স্যালাইনসহ অন্যান্য ওষুধের নাম প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন। আমি বাইরে সব জায়গায় খুঁজেছি, কোনও দোকানেই স্যালাইনটি পাইনি। সবাই বলছে স্যালাইন নাকি শেষ হয়ে গেছে। অথচ অনেককে দেখলাম ১ হাজার মিলির জন্য ৫০০ টাকা দিলে তারা স্যালাইন ম্যানেজ করে দেয়। কোথা থেকে আনে আমরা জানি না। উপায় না দেখে আমিও ১০০ টাকার স্যালাইন দুইটা ৫০০ টাকায় কিনেছি।
আরমান হোসেন আরও জানান, সবার কাছেই কমবেশি স্যালাইন মজুত আছে। কিন্তু তারা বলে স্যালাইন নাকি শেষ। অন্য জায়গা থেকে ম্যানেজ করা লাগবে। যাতায়াত খরচ বেশি যাচ্ছে বলে ১০০ টাকার স্যালাইন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে। সবার চাহিদা, এ জন্য দোকানিরা যার কাছ থেকে যেমন পারছে নিচ্ছে। কেউ কিছু বলছেও না। স্যালাইনের কথা বললেই বলে শেষ, তবে ম্যানেজ করে দেওয়া যাবে। আমরা যারা রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসছি তাদের তো বেশি টাকা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তাছাড়া ওষুধ কেনার পর রিসিটও দেওয়া হয় না। রিসিট দেওয়ার কথা বললে অন্য জায়গা থেকে কিনতে বলে।
এদিকে স্যালাইন না পেয়ে অনেককেই ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে একজন ফিরোজা বেগম। তিন দিন হলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে। ডাক্তারের নির্দেশ মতো একের পর এক ডিএনএস স্যালাইন দিতে হচ্ছে তার অসুস্থ ছেলেকে। তিনি বলেন, গত দুদিন কোনও দোকানেই স্যালাইন পাইনি। তারপর ফার্মেসি থেকে একজন বললো ম্যানেজ করে দেবে। বাধ্য হয়ে ৫০০ মিলির দুইটা স্যালাইন কিনেছি ৪০০ টাকা দিয়ে। আজ কোনও দোকানেই স্যালাইন নেই। টাকা বেশি দেবো বলছি, তারপরও কেউ স্যালাইন দিতে রাজি হচ্ছে না। সব দোকানদার বলছে স্যালাইন নাকি শেষ। ডাক্তার বলছে, ইমার্জেন্সি স্যালাইন লাগবে। এখন আমি কোথায় পাবো এই স্যালাইন। এ জন্য ছোটাছুটি করছি।
ন্যাশনাল হাসপাতালের পাশে এম কে ফার্মেসির কর্মচারী মো. লিটন বলেন, স্যালাইনের সাপ্লাই নেই। আমরা কোথা থেকে বিক্রি করবো? এক সপ্তাহ ধরে এই সংকট তৈরি হয়েছে। আশপাশের কোনও দোকানেই স্যালাইন পাবেন না। আমরা ইমার্জেন্সি রোগী বুঝে মিটফোর্ডের দিক থেকে এনে দেই। আবার রোগীদের আত্মীয়দের বলি মিডফোর্ড থেকে স্যালাইন কিনে আনতে। কোম্পানি ডিএনএস স্যালাইন সাপ্লাই কম দেয়। কেন কম দেয় জানি না। অনেকে স্যালাইন না পেয়ে কান্না করছে। আমাদের তো কিছু করার নাই। সাপ্লাই না দিলে আমরা কীভাবে বিক্রি করবো? তবে আশপাশের কয়েকজন দূর থেকে স্যালাইন এনে একটু বেশি দামে বিক্রি করে। তবু ভালো। বেশি দামে হলেও মানুষ কিনতে পাচ্ছে।
বীনা ফার্মেসি ও কনা ফার্মেসির দুই কর্মচারী বলেন, স্যালাইনের সাপ্লাই নাই। আমরা অনেক দূর থেকে নিয়ে আসি। এ জন্য দাম কিছুটা বেশি রাখি। কারণ, কারও না কারও তো লাগবেই। এটা নিয়ে আবার দুদিন ঝামেলাও হয়েছে। এজন্য এখন আর বিক্রি করি না। যে আসে বলি নাই। কারও লাগলেও কিছু করার নাই। তবে আশপাশে কয়েকজন লোক আছে, বললে তারা দূর থেকে নিয়ে আসে। এ জন্য তারা বেশি দাম রাখে। এখন যার দরকার হয় সে অল্প আর বেশি দাম হোক, স্যালাইন কিনবেই।









