বিশ্ব এইডস দিবস

এইডস নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

আলী আসিফ শাওন
০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০ আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০

দেশের একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করতেন কৃষ্ণা (ছদ্মনাম)। সেখানে তিনি ডাক্তারদের মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রস্তুত করতে সহায়তা করার জন্য কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। বছরখানেক আগে তিনি মরণব্যাধি রোগ এইচআইভি এইডসে আক্রান্ত হয়েছেন। এই রোগ ধরা পড়ার এক বছরের মধ্যে চাকরিও হারিয়েছেন।

কৃষ্ণা জানান, তার রোগের বিষয়ে ওই মেডিক্যাল সেন্টার কর্তৃপক্ষ, তার শাখার ম্যানেজার, স্থানীয় জেলা কমিশনার এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও অবগত ছিলেন। কিন্তু কেউই তার পাশে এসে দাঁড়াননি। ৪৫ বছর বয়সে চাকরি হারিয়ে তিনি এখন তার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েসহ ঘরে বেকার বসে আছেন।

কৃষ্ণা হাসপাতালের নাম প্রকাশ করতে চান না, কারণ প্রতিষ্ঠানটি গত অক্টোবরে তার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করেছে এবং তার বেতন ও অন্যান্য সুবিধা এখনও বন্ধ রয়েছে। বর্তমান অবস্থায় তিনি এই প্রতিনিধিকে মানসিক চাপ এবং হতাশার কথা জানিয়েছেন। জানিয়েছেন যে, তার এই রোগের কারণে জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। তিনি জানেন না ঠিক কীভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। মাত্র কয়েক মাস আগেও তিনি স্বনির্ভর ছিলেন। এখন পুরো সমাজ থেকে প্রায় ‘অদৃশ্য’ হয়ে গেছেন।

এমন গল্প শুধু কৃষ্ণার একার নয়, বাংলাদেশে এইচআইভি পজিটিভ অধিকাংশ মানুষই সামাজিক কলঙ্ক ও উদাসীনতার কারণে এমন জীবনযাপন করছেন।

বাংলাদেশে এইডসের বর্তমান চিত্র

আজ যখন ‘বিশ্ব এইডস দিবস’ উদযাপন করতে যাচ্ছে সারা বিশ্ব। এই অবস্থায় ইউএনএইডস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী এইচআইভি সংক্রমণের সংখ্যা কমছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ নতুনভাবে সংক্রমিত হয়েছেন এবং ৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এইডস-সম্পর্কিত জটিলতায় মারা গেছেন।

তবে বাংলাদেশে এইডস সংক্রমণের প্রবণতা কম হলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, ঔষধ ব্যবহারের ধারা পরিবর্তন, পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব এবং প্রতিরোধমূলক পর্যাপ্ত সেবার অভাবে আক্রান্ত লোকজন ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশে সংক্রমণের হার এখনও ০.১%-এর নিচে, তবে বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা ব্যবহারকারী (পিডব্লিউআইডি), যৌনকর্মী, যারা পুরুষ হয়ে পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রাখেন, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় এবং দেশে ফেরত আসা প্রবাসী কর্মীরা।

ইউএনএইডস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮৭% মানুষ নিজেদের এইচআইভি আক্রান্তের বিষয়ে জানেন। তবে বাংলাদেশে এই পরিমাণ আরও কম। কারণ সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মানুষ পরীক্ষা এবং চিকিৎসা এড়িয়ে চলেন।

বাংলাদেশের এইচআইভি আক্রান্তদের বড় অংশ বিদেশ দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে পাওয়া গেছে, যারা বিদেশে সংক্রমিত হয়ে দেশে ফিরে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ঝুঁকিতে নারী ও যুবকরা

বিশ্বব্যাপী এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৫৩% নারী ও কন্যা এবং ২০২৪ সালে নতুন সংক্রমণের ৪৫% নারী। বাংলাদেশে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা বেশি হলেও, প্রবাসী কর্মীদের স্ত্রীদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ, সচেতনতার অভাব এবং লিঙ্গভিত্তিক বাধা ও চিকিৎসার অভাব।

বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা এক বিশেষজ্ঞ এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বেশকিছু যুবক বর্তমানে ‘চেমসেক্স’-এর (নেশার মাধ্যমে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওষুধ) কারণে এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- বড় শহরের বাইরে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এইচআইভি ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওষুধ) সীমিত, পুরুষদের মধ্যে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কম, শিশুদের চিকিৎসা গ্রহণে ফাঁক। তবে এই সমস্যা বিশ্বব্যাপী রয়েছে, ২০২৪ সালে মাত্র ৫৫% শিশু এআরটি পেয়েছে।

ইউএনএইডস জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ইনজেকশন নেশাকারীদের ৭.১%, সমকামী পুরুষদের ৭.৬% এবং ট্রান্সজেন্ডারদের ৮.৫% মানুষ এইচআইভি আক্রান্ত, যা বিশ্বব্যাপী ০.৭% হার থেকে অনেক বেশি।

অর্থায়নের অনিশ্চয়তা

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক এইচআইভি তহবিল কমে ১৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা প্রয়োজনের চেয়ে ১৭% কম। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আরও অর্থায়ন কমে যায়, তবে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অগ্রগতি আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে কিছু সুপারিশ দিয়েছেন, সেগুলো হলো- সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে এইচআইভি পরীক্ষা সম্প্রসারণ এবং পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির (এআরটি) জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ, ইনজেকশন নেশাকারীদের জন্য বিশেষভাবে হ্যারম-রিডাকশন সেবা বৃদ্ধি, নারী, যুবক ও ট্রান্সজেন্ডারদের প্রয়োজনমত ফোকাসড সেবা দেওয়া, ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য প্রতিরোধমূলক প্রোগ্রাম বৃদ্ধি, স্থানীয় তহবিল বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটিং মেকানিজম (বিসিসিএম) ও পিএলএইচআইভি নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক মো. হাফিজুদ্দিন মুন্না বলেন, ‘বাংলাদেশে এইচআইভি সেবার মান সংকটাপন্ন। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ এইচআইভি প্রোগ্রাম সীমিত করা হয়েছে। কমিউনিটির কাছ থেকে সেবা সরিয়ে হাসপাতালে স্থানান্তরের ফলে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হয়েছে। এইচআইভি চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা উভয়ই প্রয়োজন। কিন্তু এ নিয়ে কোনও বিশেষ বিভাগ নেই।’

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

/এমএইচআর/
সম্পর্কিত
গ্রাম ও শহরের মধ্যে টিকাদানের বৈষম্য দূর করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য খাতে ৬৯২৫ পদ সৃজনের প্রস্তাব নিয়ে সভা বৃহস্পতিবার
খুলনায় ডেঙ্গু-হামে শতাধিক মৃত্যু, আক্রান্ত ২৯ হাজারের বেশি
সর্বশেষ খবর
নদী পার করার কথা বলে নৌকায় তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেফতার ৩
নদী পার করার কথা বলে নৌকায় তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেফতার ৩
দেশ গড়তে মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
দেশ গড়তে মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রবাসী ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো ৮৫ বছরের বৃদ্ধা মায়ের
প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রবাসী ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো ৮৫ বছরের বৃদ্ধা মায়ের
বিতর্ক সামলাতে পদত্যাগ: সরকারের অস্বস্তি কাটছে কি?
বিতর্ক সামলাতে পদত্যাগ: সরকারের অস্বস্তি কাটছে কি?
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
ওআইসির কাশ্মির প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
ওআইসির কাশ্মির প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত