ঝামেলামুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেই ই- হেলথ কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ‘ই-হেলথ’ কার্ড চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এই ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তনের রূপরেখা প্রদান করেন। বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবাকে ডিজিটাল করতে সরকারের দেওয়া এই কার্ড পর্যায়ক্রমে দেশের সব নাগরিক পাবেন। এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব মেডিক্যাল রেকর্ড, জীনগত তথ্য এবং পূর্বের চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। প্রাথমিকভাবে একটি জেলায় পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এটি চালু হচ্ছে এবং জুন মাসের পর পর্যায়ক্রমে সারাদেশে বিতরণ শুরু হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, বহির্বিশ্বের আদলে শুধু একটি ইউনিক নম্বরে সংরক্ষিত থাকবে রোগীর যাবতীয় তথ্য। এ লক্ষ্যে চালু করা হচ্ছে ই- হেলথ কার্ড। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করে বিনামূল্যে মিলবে এই কার্ড। রোগীর গোপনীয়তা ও সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হচ্ছে এই বিশেষ ব্যবস্থা। বিএনপি সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। বাকি দুই উদ্যোগ পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় ফারমারস কার্ড চালু হবে ১৪ এপ্রিল এবং জুনের শেষ নাগাদ ই-হেলথ কার্ড কার্যক্রমে আসবে। স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে অটোমেশনের আওতাভুক্ত করা, ‘ শেয়ারড হেলথ রেকর্ড’-এর মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্তীকরণ, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ‘হেলথ আইডি’ নম্বর থাকা, সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় করা, চিকিৎসাসেবার গুণগত মান বৃদ্ধি করা, নাগরিকদের অর্থ ও সময় সাশ্রয় করা চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল করা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখাই এই কার্ড প্রচলনের প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে হাসপাতালে, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের মাধ্যমে বা অনলাইনে এই কার্ডের জন্য রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে জাতীয় ই হলথ কার্ড চালু করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এই ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকরা উন্নত ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন— যা এনআইডি কার্ডের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে এবং এর মাধ্যমে ৫২ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে। এটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে বিতরণ করা হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রবর্তিত ই-হেলথ কার্ড এনআইডি কার্ডের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হবে, যা একটি বিজ্ঞানসম্মত ডিজিটাল কার্ড হিসেবে কাজ করবে। একটিমাত্র কার্ড ব্যবহার করে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা, পূর্বের চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষণ এবং বীমা সুবিধা পাওয়া যাবে। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের যেকোনও জায়গায় চিকিৎসা নেওয়ার সময় চিকিৎসকরা রোগীর পূর্বের সব রেকর্ড তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারবেন, ফলে চিকিৎসার মান উন্নত হবে। কোনও রোগীর আর চিকিৎসার পুরোনো কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হবে না। মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এই স্মার্ট হেলথ কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, হেলথকার্ডধারীরা মূলত ডিজিটালাইজড স্বাস্থ্যসেবা, নগদবিহীন চিকিৎসাসুবিধা, এবং পূর্বে ধারণকৃত মেডিক্যাল রেকর্ডের তাৎক্ষণিক সুবিধা পাবেন। এই কার্ডের মাধ্যমে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষিত থাকে, যা কাগজপত্রের ঝামেলা কমায় এবং দ্রুত চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়। প্রতিটি কার্ডের একটি ইউনিক আইডি নম্বর থাকবে, যা দিয়ে দেশের যেকোনও প্রান্তের চিকিৎসক রোগীর পূর্বের রোগের ইতিহাস, পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসার তথ্য দেখতে পাবেন। নেটওয়ার্কভুক্ত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য নগদ টাকা জমা না দিয়ে কার্ডের মাধ্যমে ক্যাশলেস বা ক্যাশলেস ট্রিটমেন্ট সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রেসক্রিপশন বা রিপোর্ট হারানোর ভয় থাকবে না, সব তথ্য অনলাইনে সংরক্ষিত থাকবে। হাসপাতালে ভর্তির সময় কার্ডটি দেখালে দ্রুত ভেরিফিকেশন এবং আইডির মাধ্যমে সহজেই চিকিৎসার শুরু করা যাবে। কিছু বিশেষ কার্ডে (যেমন- এসিআই মোটরস ও পালস হেলথকেয়ার) ২৪/৭ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নেটওয়ার্ক হাসপাতালগুলোতে মূল্যছাড়ের সুবিধা থাকে। হেলথ কার্ডে দুর্ঘটনা-পরবর্তী চিকিৎসা এবং জীবনবিমার সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানা গেছে। চিকিৎসার তথ্যের পাশাপাশি হেলথ কার্ডের মাধ্যমে পলিসি হোল্ডাররা তাদের স্বাস্থ্যবিমার মেয়াদ ও কভারেজ সহজেই ট্র্যাক করতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, আগামী জুনের মধ্যে হেলথ কার্ড বিতরণ করা হবে। তিনি বলেন, হেলথ কার্ড একটি বিজ্ঞানসম্মত ডিজিটাল কার্ড, যার মাধ্যমে আপনার শরীরের জিন থেকে শুরু করে কবে, কোথায়, কোন ডাক্তার আপনি দেখিয়েছেন, এসবের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। দেশের যেকোনও জায়গায় গিয়ে ডাক্তার দেখালে মুখে কিছুই বলতে হবে না, কার্ড দেখেই ডাক্তার বুঝতে পারবেন আপনার সমস্যা কোথায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও আরও শক্তিশালী করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ই-হেলথ কার্ডের সুবিধা হলো- রোগীর স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য চিকিৎসকের কাছে সহজলভ্য হবে, যেকোনো স্থানে চিকিৎসা নেওয়ার সময় তা ব্যবহার করা যাবে। স্বাস্থ্য খাতে এটি একটি মৌলিক পরিচয় কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যা হাসপাতালে, ক্লিনিক ও অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানে তথ্য নিরাপদভাবে বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
জানতে চাইলে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আসলাম আলি বলেন, বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই কার্ড প্রচলিত আছে। এর মাধ্যমে একজন রোগী ঝামেলামুক্তভাবে চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন। রোগীর কাছে ই-হেলথ কার্ড থাকলে একজন চিকিৎসকের পক্ষেও উন্নত সেবা প্রদান করা সম্ভব।









