একসঙ্গে ঝিনুক-কোরাল চাষে সফলতা, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১

সমুদ্র শুধু মাছ আহরণের উৎস নয়, বিকল্প জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন ও নীল অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রও। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ভাসমান ভেলার মাধ্যমে সবুজ ঝিনুক ও সামুদ্রিক কোরাল মাছ চাষ হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এ পদ্ধতি স্থানীয় বেকার যুবকদের বিকল্প আয়ের পথ দেখানোর পাশাপাশি সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের বাঁকখালী নদীর মোহনা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ভাসমান ভেলার এই খামার। বাঁশ, দড়ি ও প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি ভাসমান কাঠামোর নিচে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ঝিনুকের বীজ। জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক স্রোত ও নোনাজলের অনুকূল পরিবেশে অতিরিক্ত কোনও প্রযুক্তি ছাড়াই বেড়ে উঠছে ঝিনুক।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যেই ঝিনুক বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। দেশে পুষ্টিকর সামুদ্রিক খাদ্য হিসেবে এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রফতানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিকল্প আয়ের পথ দেখানোর পাশাপাশি সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে

একই ভাসমান কাঠামোর সঙ্গে জালের খাঁচা তৈরি করে চাষ করা হচ্ছে উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক কোরাল মাছ। বড় আকারের এসব খাঁচায় কোরাল মাছের পোনা ছাড়া হয়। নিয়মিত খাবার ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যেই মাছগুলো বিক্রিযোগ্য আকার ধারণ করে। বাজারে কোরাল মাছের তুলনামূলক বেশি দাম থাকায় এ খাতেও লাভের সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা।

ঝিনুক চাষে সাফল্য

সবুজ ঝিনুক চাষি আনোয়ার মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৮ সালে সর্বপ্রথম সবুজ ঝিনুক (গ্রিন মাসেল) ভাসমান ভেলায় চাষ শুরু করি। এতে প্রতি বছরই লাভের মুখ দেখেছি। ব্যাপক সফলতা এসেছে। প্রচলিত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি এ ধরনের আধুনিক চাষাবাদ বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আবহাওয়া বা মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন সমুদ্রে মাছ ধরা সম্ভব হয় না, তখন এই ভাসমান খামারগুলো বিকল্প জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে।’

ঝিনুক ও সামুদ্রিক কোরাল মাছ চাষ হচ্ছে

আরেক চাষি শহীদুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘আগে আমরা মূলত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এলে আয় বন্ধ হয়ে যেতো। এখন ভাসমান ভেলায় ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ করে নিয়মিত আয় হচ্ছে। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা পেলে এই চাষ আরও বড় পরিসরে করা সম্ভব।’

একই সফলতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় চাষি মং ছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরুতে নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় কিছুটা ভয় ছিল। কিন্তু আইডিএফের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় এখন সফলভাবে ঝিনুক ও কোরাল চাষ করছি। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। আরও সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে অনেক নতুন উদ্যোক্তা এ খাতে এগিয়ে আসবেন।’

প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা

প্রকল্পটি অর্থায়ন করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বাস্তবায়ন করছে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ)। প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় চাষিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং আধুনিক সামুদ্রিক চাষাবাদ বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাঁকখালী নদীর মোহনা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ভাসমান ভেলার এই খামার

আইডিএফের মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশে ভাসমান ভেলায় সবুজ ঝিনুক ও সামুদ্রিক মাছ চাষের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত নোনাজল ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এই খাত দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা পাওয়া গেলে এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি লাভজনক ও টেকসই জীবিকার উৎসে পরিণত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল ও সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্লু-ইকোনমির যে পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে, ভাসমান ভেলায় ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অবদান রাখবে।’

বাঁশ, দড়ি ও প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি ভাসমান কাঠামোর নিচে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ঝিনুকের বীজ

মুহাম্মদ হাসান বলেন, ‘এই উদ্যোগকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হলে সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত মানের পোনা ও ঝিনুকের বীজ সরবরাহ, নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

সমুদ্রের বুকে ভাসমান এসব খামার ইতোমধ্যে কক্সবাজারের উপকূলে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভাসমান ভেলায় সবুজ ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির একটি সফল ও অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
নাম কেন ‘রাজা ইলিশ’, আসে কোথা থেকে?
২৫ থেকে ৩২ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করছেন কৃষকরা, বাজারে কত
সর্বশেষ খবর
নাটোরজুড়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ, সিট সংকটে হাসপাতালের মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা
নাটোরজুড়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ, সিট সংকটে হাসপাতালের মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা
ভারতের ‘অ্যাডভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ ঋষিকেশ, কেন ছুটছেন পর্যটকেরা?
ভারতের ‘অ্যাডভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ ঋষিকেশ, কেন ছুটছেন পর্যটকেরা?
নয়াদিল্লিতে আজ বসছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন
নয়াদিল্লিতে আজ বসছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন
ক্রিকেটে ফলোঅন কী, কখন দেওয়া হয় এবং কেন?
ক্রিকেটে ফলোঅন কী, কখন দেওয়া হয় এবং কেন?
সর্বাধিক পঠিত
মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব বাড়লো 
মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব বাড়লো 
সেই ভবন ভাড়া নিয়ে কী করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক, যা জানালো পুলিশ
সেই ভবন ভাড়া নিয়ে কী করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক, যা জানালো পুলিশ
মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা
মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা
স্বর্ণের দামে বড় পতন
স্বর্ণের দামে বড় পতন
বড় অফারে ছোট করে ‘সিএ’ লিখে প্রচারণার অভিযোগ, বিক্ষুব্ধ গ্রাহক সামলাতে পুলিশ
বড় অফারে ছোট করে ‘সিএ’ লিখে প্রচারণার অভিযোগ, বিক্ষুব্ধ গ্রাহক সামলাতে পুলিশ