টিকা কেনার পদ্ধতির মাশুল দিচ্ছে শিশুরা

সাদ্দিফ অভি
০৩ মে ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ২২:০০

সারা দেশে গত দেড় মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় তিনশো ছুঁইছুঁই, যাদের বেশিরভাগই কোমলমতি শিশু। দেশে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই হামে এতসংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা কেনা ইস্যুটি। কারণ ভ্যাকসিন প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিস্তার রোধে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির বিশ্বে সুনাম আছে, বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিকে (ইপিআই) রোল মডেলও বলা হতো। কিন্তু দেশব্যাপী হামের এই প্রাদুর্ভাব সামনে এনেছে ভিন্ন এক চিত্র।

১৯৮৫ সালে দেশব্যাপী শুরু হওয়া কর্মসূচির অধীনে বর্তমানে ১২টি রোগের জন্য ১০টি টিকা দেওয়া হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইপিআই কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে, রোগাক্রান্ত হয়ে প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুহার ছিল ১৫১ জন, যা ২০২৪ সালে ২১ জনে দাঁড়িয়েছে। শিশু মৃত্যুহার কমেছে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ।

এত সাফল্যের পরও হামের পরিস্থিতি কেন এমন হলো— এই প্রশ্ন এখন সবার মনে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং সরকার বলছে, টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত না থাকা এবং টিকা কেনার সচরাচর পদ্ধতি অবলম্বন না করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

২০২০ সালের পর হামের টিকার প্রচারণা হয়নি

২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির কারণে হামের টিকার ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়। এরপর একই বছরের ডিসেম্বরে আবারও টিকা কর্মসূচি চালু করা হয়। চার বছর পরপর এই টিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ কিংবা ২০২৫ সালে হামের টিকার কোনও ক্যাম্পেইন হয়নি।

২০২৪ সালে টিকা কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। ওই বছরের আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও টিকা কর্মসূচির কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও জানান তারা। 

২০২৫ সালে সেক্টর-ভিত্তিক কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসে অন্তর্বর্তী সরকার

স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) প্রথম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। ২০২৪ সালের জুন মাসে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি’ শেষ হয়। যদিও এই কর্মসূচি দুই বছর আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। ওই বছরের জুলাই থেকে ‘পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি’ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয়নি। সেক্টর কর্মসূচির আওতায় অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে ইপিআই টিকাসহ, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার, কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার, পুষ্টি, কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল, নন কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল, হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনাসহ আরও অনেক সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার কথা জানায় সরকার। ওপি বন্ধ থাকার কারণে ২০২৪ সাল থেকেই পিসিভি, আইপিভি, পেন্টা ভ্যালেন্ট, এমআর—প্রভৃতিসহ প্রায় সবগুলো শিশু টিকার সংকট দেখা দেয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগের সেক্টর কর্মসূচিতে বেশিরভাগ অর্থায়ন ছিল উন্নয়ন সহযোগীদের। পরবর্তীকালে অর্থায়ন কমা শুরু করে। এর ফলে সেক্টর কর্মসূচির অর্থায়ন নিজেদের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। এই কারণে পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি অনুমোদন না দিয়ে অপারেশনাল প্ল্যানগুলো বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেসময় এই ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শিরিন আকতারের সই করা এক চিঠিতে সেক্টর কর্মসূচির বিকল্প পরিকল্পনার কথা বলা হয়।

এরপর একই বছরের ৬ মার্চ সেক্টর পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) কাজগুলো মূল কাঠামোতে আনতে জনবল, ওষুধ, এমএসআর, টিকা, জরুরি পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবা, যন্ত্রপাতি, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ইত্যাদি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়।

অর্ধেক টিকা টেন্ডারে কেনার নির্দেশ

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রুটিন টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রস্তাবিত ক্রয়ের অর্ধেক রুটিন ইপিআই টিকা এবং উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে বাকি অর্ধেক টিকা সংগ্রহের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্ধেক টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়ার আগেই সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

এই টিকা কেনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট চিঠি দেওয়া হয়। পরে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি তাতে অনুমোদন দেয়। এই সংক্রান্ত চিঠি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো হয় ২২ সেপ্টেম্বর। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার জন্য ৪১৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা সরাসরি ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দিয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দেয় ২৪ নভেম্বর। এই সংক্রান্ত অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে চিঠি পাঠানো হয় ২৯ অক্টোবর। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে অনুমোদন সংক্রান্ত এই চিঠি ইস্যু করা হয় ৭ ডিসেম্বর।

অনুমোদনের পর এই অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ বিভাগ অনুমোদন দেয় ১৪ জানুয়ারি। এরপর সেই অর্থ ইউনিসেফের কাছে অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য ২০ জানুয়ারি চিঠি দেওয়া হয়। অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও চূড়ান্ত অর্থ ছাড় হতে সময় লাগে পাঁচ মাস।  

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশন প্ল্যান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছিল। সব কিছু এক প্ল্যানের অধীনে থাকবে কেন, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যার ফলে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ যেখানে আগে প্রয়োজন সেখানে বরাদ্দ। সেক্টর কর্মসূচি বাতিলের কারণে যেখানে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা ছিল, সেখানে আরডিপিপি সংক্ষিপ্ত করে দুই বছরের ডিপিপি তৈরি করতে বলা হয়। কিন্তু যখন বলা হয়, তখন সাত মাস পার হয়ে গেছে। সেক্টর কর্মসূচিতে প্রতিবছর আলাদা পরিকল্পনা হয়, সংক্ষেপে তা করা সম্ভব ছিল না। আবার নতুন করে প্রকল্প তৈরি করারও সময় ছিল না। দুই বছরের জন্য ডিপিপি প্রস্তুত করে সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তখন নেওয়া হয়েছিল।’

তিনি আরও জানান, সিদ্ধান্ত ছিল প্রতিটি সেক্টরের জন্য আলাদা আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করা। প্রকল্প তৈরি করে সেটা পাঠিয়ে অনুমোদন করানো একটা সময় সাপেক্ষ বিষয়।

বাকি হামের টিকা কেনার অনুমোদন মেলে চলতি বছরের ৩১ মার্চ

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের পর আবারও টিকা কেনায় তোড়জোড় শুরু হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার হাম প্রতিরোধে আরও টিকা কেনার অনুমোদন দেয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই টিকা কেনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দেয় ৩১ মার্চ। ওইদিনই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে ইপিআই’র টিকা কেনার জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফকে অগ্রিম টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত টেন্ডারে কিনতে বলেছিল, সেটি অন্য প্রকল্পের অর্থ থেকে কেনার জন্য বলা হয়।

টেন্ডারে টিকা কেনা নিয়ে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ

ইউনিসেফ সতর্ক করার পরেও অন্তর্বর্তী সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকা কেনা স্থগিত করেছিল। তখন সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এটি কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘সায়েন্স’ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, পরবর্তীকালে টিকার সংকটে বাংলাদেশে হামের বিস্তার ঘটেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এর বড় অংশের অর্থায়ন করত গ্যাভি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে ‘টিকা কেনা বন্ধ’ করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিল ইউনিসেফ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সে সময় সতর্ক করেছিলেন, ‘উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা পেতে সময় লাগবে। এতে টিকাদান ব্যাহত হলে প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বারবার সতর্ক করার কথা স্মরণ করে রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্সকে বলেছেন, ‘আমি বলেছিলাম– সৃষ্টিকর্তার দোহাই। এই কাজটি করবেন না।’ তিনি বলেন, ‘কেন সে সময় হঠাৎ করে ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছিল, তার তদন্ত হওয়া দরকার।’

এই প্রসঙ্গে ইউনিসেফের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের ব্যাখ্যা

সায়েন্সের প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, অধ্যাপদ ডা. সায়েদুর রহমান, যিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলে — তিনি একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, টিকা কেনায় কোনও পদ্ধতি অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তন করেনি।

তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনও পরিবর্তন প্রয়োগ করা হয়নি। বিধি অনুযায়ী সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয় করার ক্ষেত্রে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬’ অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা আছে।’

ইপিআই একটি নিয়মিত কর্মসূচি, তাই প্রতি বছর জরুরি ধারা ব্যবহার করে চালানো সঠিক নয়— এই বিবেচনায় টিকার আন্তর্জাতিক বাজার অনানুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করে রাষ্ট্রীয় অর্থ সংস্থানের প্রাথমিক সম্ভাবনা দেখা যায় বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে টিকা ক্রয়ের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা ক্রয়ের নিজস্ব সামর্থ্য অর্জন প্রয়োজনীয় বলেই সরকারের কাছে প্রতীয়মান হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পরিবর্তিত পদ্ধতিতে ইপিআই’র কোনও টিকা কেনা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরকারের টিকা কেনা বন্ধ করা হয়েছে বলে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। কারণ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রি-ফাইন্যান্সিং সহায়তায় টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মূল্য পরবর্তীকালে পরিশোধিত হয়েছে।’

যা বলছেন নতুন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা

হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকা সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার আগের সরকারকে দোষারোপ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অবহেলার কারণে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা আনেনি, যার ফলে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।’

হাম-রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইন উদ্বোধনকালে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু মানুষের গাফিলতির কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব শিশুস্বাস্থ্যে পড়েছে।’

নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনও একইভাবে আগের সরকারকে দায়ী করে বলেছেন, ‘টিকা কেনা ও সংগ্রহে পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে টিকার মজুতে সংকট দেখা দিয়েছে। এতে হামের টিকাসহ আরও ছয় ধরনের টিকার অভাব দেখা দেয়, যার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।’

আর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী অবশ্য টিকা কেনার বিলম্বের পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, ‘করোনাকালে এবং তার পরবর্তী সময়ে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা একসময় ছোট ছোট আন্দোলন করেছিল, কর্মবিরতি করেছিল। আমাদের টিকারও তখন কিছু সংকট তৈরি হয়েছিল। এই সংকটের মধ্যে আবার কিছু মায়েরা টিকাকেন্দ্রে একদিন হয়তো এসেছেন, যেদিন কর্মবিরতি ছিল। পরে ওই মায়েরা আর আসেননি। এসব কারণে কিছু জায়গায় গ্যাপ তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশন বলে যে, ওই গ্যাপগুলোর কারণে হাম ছড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।’

ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের (গ্যাভি) সিএসও স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভ্যাকসিনের যে ক্রাইসিস এবং আজ যে আউটব্রেক হচ্ছে, তার মানে এটা একদিনে হয়নি বা এক বছর মধ্যে হয়নি। এটা হলো কিউমুলেটিভ (ক্রমাগত)। যে শিশু টিকা পায়নি, সেটা বাড়তে বাড়তে ১০ থেকে ২০ লাখ পার হয়ে গেছে। সেটাই হামের প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘‘হামের টিকার কাভারেজ কখনোই ৮০ ভাগের ওপরে হয়নি বাংলাদেশে। তাতে করে আমরা ৯৫ পারসেন্ট লেভেলে যদি না পৌঁছাই, তাহলে ইমিউনিটি এবং হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে না। এর পাশাপাশি যেগুলো সবাই আলোচনা করছে যে— ‘লজিস্টিক ইস্যু’ ‘ম্যানেজমেন্ট ইস্যু’, ভ্যাকসিন সাপ্লাই ছিল নাকি, প্রশ্ন উঠেছে। সাপ্লাই গত বছরের অক্টোবরে ইন্টারাপ্টেড হয়েছে। কিন্তু ভ্যাকসিন কেনার জন্য টাকা সরকার দিয়েছে। সেটা হয়তো কিনতে দেরি হয়েছে।’’

লিডারশিপের জায়গায় উন্নতি হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি এটাকে মনে করি না যে, এটা পলিটিক্যাল ইস্যু, এটা ম্যানেজমেন্ট এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফিশিয়েন্সি ইস্যু। কারণ হলো, যারা এসেছে তারা নতুন। হয়তো অনেকে ওই জিনিসটা বুঝতেই পারেননি যে, এর গুরুত্বটা কত।’ 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু, আক্রান্ত শনাক্ত ১১১১
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৯৪
২৫ সেপ্টেম্বর থেকে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ৩ ট্রাক পণ্য পাচার, দুই রাজস্ব কর্মকর্তা বরখাস্ত
কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ৩ ট্রাক পণ্য পাচার, দুই রাজস্ব কর্মকর্তা বরখাস্ত
ইবির নবনির্মিত ‘শহীদ আবরার ফাহাদ হল’ উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ
ইবির নবনির্মিত ‘শহীদ আবরার ফাহাদ হল’ উদ্বোধন করতে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ
সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ জোটে বাংলাদেশকে যুক্ত না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান মুক্তি কাউন্সিলের
সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ জোটে বাংলাদেশকে যুক্ত না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান মুক্তি কাউন্সিলের
‘ভালো ও সৎ মানুষের রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন’
‘ভালো ও সৎ মানুষের রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন’
সর্বাধিক পঠিত
মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব বাড়লো 
মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব বাড়লো 
সেই ভবন ভাড়া নিয়ে কী করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক, যা জানালো পুলিশ
সেই ভবন ভাড়া নিয়ে কী করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক, যা জানালো পুলিশ
মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা
মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা
স্বর্ণের দামে বড় পতন
স্বর্ণের দামে বড় পতন
বড় অফারে ছোট করে ‘সিএ’ লিখে প্রচারণার অভিযোগ, বিক্ষুব্ধ গ্রাহক সামলাতে পুলিশ
বড় অফারে ছোট করে ‘সিএ’ লিখে প্রচারণার অভিযোগ, বিক্ষুব্ধ গ্রাহক সামলাতে পুলিশ