মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ২০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে কার্যক্রম শুরু হলেও ধাপে ধাপে দেশের ৫০০টি উপজেলায় এ সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ: আ পাথওয়ে টু ইনক্লুসিভ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
আঁচল ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি), লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো) ও পল্লী একতা উন্নয়ন সংস্থা (রুডো) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প মানেই বড় বড় ভবন নির্মাণ কিংবা কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা নয়। ভবন ও দামি যন্ত্রপাতি থাকলেও সেবা দেওয়ার দক্ষ জনবল না থাকলে তা কাজে আসবে না। এ ধরনের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনার মানসিক হাসপাতালের সেবাকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার লক্ষ্যেই কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রকল্প সাজানো হয়েছে।
উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবলের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, শুধু মাস্টার্স বা পিএইচডি ডিগ্রিধারী জনবল তৈরি করলে তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলা কঠিন হতে পারে। এ জন্য প্রকৌশল খাতের মতো মানসিক স্বাস্থ্যসেবায়ও দুই বা তিন বছর মেয়াদি ভোকেশনাল ডিপ্লোমা ও কারিগরি কোর্স চালু করা প্রয়োজন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) কাঠামোর আওতায় মধ্যম পর্যায়ের মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতে হবে, যারা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের পাশে থেকে কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তা দিতে পারবেন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং আইন মন্ত্রণালয়েরও সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের
মানবাধিকার রক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা দূর করতে নীতিগত উদ্যোগ ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (এইচআরডিসি) পরিচালক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. জিয়ানুর কবির। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি মানুষের মর্যাদা ও সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণের সঙ্গেও জড়িত। মানুষের দোরগোড়ায় এ সেবা পৌঁছে দিতে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন তিনি। এগুলো হলো—নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য ট্রমা-সচেতন মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা; স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিষ্ঠা; জেলা ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ ও পদায়ন; কমিউনিটিভিত্তিক ট্রমা-সচেতন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া; এবং স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করা।
প্রধানমন্ত্রীর যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুধু বিশেষজ্ঞ বা স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মহলে এ বিষয়ে সচেতনতা এবং কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামালউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার তৈরির পাশাপাশি মা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুজন কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগের সুপারিশ করেন।
সংসদ সদস্য শিরিন সুলতানা বলেন, শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি মানসিক কষ্ট, ভয়, উদ্বেগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রেও পেশাদার সহায়তা নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে হবে। মানুষ যেন নির্ভয়ে নিজের মানসিক কষ্টের কথা বলতে পারেন, কাউন্সেলিং নিতে পারেন এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা ও ইতিবাচক চর্চার গুরুত্ব রয়েছে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা শাজিয়া শারমিন, হিউম্যান রিলিফ ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. ওবায়দুর রহমান, লিডোর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন, আঁচল ফাউন্ডেশনের পরিচালক সোহেল মামুন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজির সহকারী অধ্যাপক মুস্তাইম বিল্লাহ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক অধ্যাপক মো. দাউদ, রুডোর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. শামীম রেজা, ডিগনিটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল আনোয়ার রোজেন, সোসাইটি ফর হেলথ প্রমোশন লিংকসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. হালিদা হানুম আখতার এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সহযোগী অধ্যাপক আহসান উদ্দিন।
স্বাস্থ্য খাতে ৬৯২৫ পদ সৃজনের প্রস্তাব নিয়ে সভা বৃহস্পতিবার