সলঙ্গার গণহত্যা আলোচিত ৫০ বছর ধরেই, তবুও হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
২৫ এপ্রিল ২০২১, ১৬:৪৭আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ১৬:৫৫

আজ ২৫ এপ্রিল (রবিবার) সলঙ্গা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার চড়িয়া মধ্যপাড়া গ্রামে নির্মম গণহত্যা চালায় পাক হানাদার বাহিনী। এদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিকামী নিরীহ বাঙালিকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর ধরেই সলঙ্গা গণহত্যার নির্মমতার ঘটনাটি আলোচিত হলেও এখনও এখানে নির্মিত হয়নি কোনও স্মৃতিস্মম্ভ, সংরক্ষিত নয় গণকবরগুলো।

সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী ও মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনায় লিপিবদ্ধ ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল পাবনা জেলার কাশিনাথপুর ডাব বাগান নামক স্থানে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে অর্ধশতাধিক হানাদার নিহত হয়। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে হানাদার বাহিনী ২৫ এপ্রিল সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে কাশিনাথপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পথে বগুড়া-নগরবাড়ী সড়কের সলঙ্গা থানার চড়িয়া শিকার নামক এলাকায় ব্যারিকেডের মুখে তারা যাত্রা বিরতি করে। সেখানে তারা লোকমুখে জানতে পারে চড়িয়া শিকার এলাকার পূর্ব দক্ষিণ পাশে কাশিনাথপুর নামে একটি গ্রাম আছে। এ গ্রামকেই পাবনা জেলার কাশিনাথপুর মনে করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেখানে খুঁজতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি। তবে এ গ্রামেও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

হানাদারদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের সহযোগিতায় তারা চড়িয়া মধ্যপাড়ায় ঢুকে মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ঘাঁটি খোঁজার নামে গুলি চালাতে থাকে। তখন ফজরের ওয়াক্ত। ভোর হয়নি। গ্রামের নিরীহ মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন। পাকবাহিনী সূর্যোদয়ের আগে সেসময় থেকে গ্রামটিতে গুলি চালাতে শুরু করে এবং সকাল ৯টা পর্যন্ত গ্রামটিতে ঢুকে গুলি চালায়। রাজাকাররা গ্রামের সব ঘর-বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা আশেপাশের গ্রামগুলোতেও একইরকম হামলা ও নির্যাতন চালায়। ওইদিন বিকেলে তারা চড়িয়া শিকারসহ আশেপাশের ৫/৭টি গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিকামী মানুষকে আটক করে দুই লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

এ গণহত্যার শিকার হওয়াদের মধ্যে পাটধারী গ্রামের ২৯ জন, কালীবাড়ী গ্রামের ১৩ জন, শিকার মগপাড়া গ্রামের ৮ জন, চড়িয়া শিকার দক্ষিণ পাড়া গ্রামের ১০ জন, গোলকপুর গ্রামের ৫ জন, কাচিয়ার গ্রামের ১ জনের নাম পরিচয় পাওয়া যায়। বাকিদের পরিচয় এখন পর্যন্তও জানা যায়নি।

পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া চড়িয়া মধ্যগ্রামের আবুল কালাম (কাঙ্গাল মণ্ডল) জানান, ওই দিন সকালে পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনী আব্দুল মজিদের পুকুরের পাশে, ইয়ার আলীর পুকুরের পাশে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি চালান। ঘটনাস্থলে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়। ভাগ্যের জোরে তিনি ৩টি গুলি খেয়েও বেঁচে যান। একই ঘটনায় বেঁচে আছেন আমান আলীও।

চড়িয়া জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই খাঁন বলেন, প্রতি বছর দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিলেও এবছর করোনা মহামারির কারণে আমরা সীমিত পরিসরে কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। কোরআন খতম, শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হবে।

যে মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে আছেন সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তারা সরকারের উদ্দেশে বলছেন, অনেক তো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো, এবার পারলে আমাদের জীবদ্দশাতেই এখানে একটি সত্যিকারের স্মৃতিস্তম্ভ করুন। এই স্বাধীনতার পতাকা আনতে আমাদের যে স্বজন ও পড়শিরা গণহারে প্রাণ দিলেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে অন্তত একবার শ্রদ্ধা নিবেদন করে যাই।

মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ছোহরাব আলী খান বলেন, ২৫ এপ্রিল গণহত্যায় পাটধারীর ২৯ জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে পাক বাহিনী। এসব শহীদের পাটধারী অন্ধপুকুর পাড়ে গণকবর দেওয়া হয়। শহীদদের স্মৃতি আগামী প্রজন্মকে জানাতে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ খুবই জরুরি।

সলঙ্গা থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হক মাস্টার পাটধারী গণকবরটি সংরক্ষণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।

তিনি বলেন, এখানে যে স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছে সেটি দূরে। সরকারিভাবে সেটি বানানোও হয়নি। কিন্তু, আমরা চাই গণকবরের পাশে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ সরকারিভাবে নির্মাণ করা হোত যাতে এই শহীদদের স্মৃতি হাজার বছর বেঁচে থাকে।

উল্লেখ্য, সলঙ্গার শহীদদের স্মরণে গণকবর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে স্থানীয় চরিয়া সমাজকল্যাণ সমিতি নিজ অর্থায়নে খুবই ছোট পরিসরে এটি নির্মাণ করে।

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী