ইউরোপের জনপ্রিয় শহরগুলোর কাছেই এমন কিছু দ্বীপ রয়েছে, যেখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা কিংবা জটিল ভ্রমণ পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না। কোথাও মূল ভূখণ্ড থেকে সরাসরি ট্রেনে পৌঁছে যাওয়া যায়, কোথাও আবার ২০-৪৫ মিনিটের নৌযাত্রাই যথেষ্ট। অথচ গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ব্যস্ত শহুরে পরিবেশের বদলে সামনে খুলে যায় সৈকত, বালিয়াড়ি, জলাভূমি, বনভূমি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার এক ভিন্ন জগৎ।
জার্মানির উত্তর সাগরঘেঁষা জিল্ট, আয়ারল্যান্ডের শান্ত শেরকিন, ভেনিসের লেগুনের টরচেল্লো, মার্সেইয়ের কাছের ফ্রিউল দ্বীপপুঞ্জ এবং স্পেনের সিয়েস দ্বীপপুঞ্জ, যেখানে সহজে পৌঁছানো যায়, আবার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাতেও বৈচিত্র্য রয়েছে এমন পাঁচ দ্বীপের সন্ধান দিচ্ছে এই ভ্রমণ ফিচার।
জিল্ট, জার্মানি
জার্মানির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি মাত্র রেলসেতুর মাধ্যমে যুক্ত জিল্ট। হামবুর্গ থেকে সরাসরি ট্রেনে তিন ঘণ্টার কিছু বেশি সময়েই পৌঁছানো যায় উত্তর ফ্রিজীয় দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় এই দ্বীপে।
উত্তর সাগর ও ভাডেন সাগরের মাঝখানে বিস্তৃত জিল্টের পূর্বদিকে রয়েছে লবণাক্ত জলাভূমি ও কাদাময় জোয়ারভাটা অঞ্চল। পশ্চিম উপকূলজুড়ে প্রায় ২৫ মাইল সাদা বালুর সৈকত, আর তার পেছনে ঘাসে ঢাকা বালিয়াড়ি উত্তর সাগরের তীব্র বাতাস থেকে উপকূলকে কিছুটা আড়াল করে।
যুক্তরাজ্যের পর্যটকদের কাছে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত হলেও জার্মানদের কাছে জিল্ট দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় অবকাশকেন্দ্র। বিলাসবহুল হোটেল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি রয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট, ক্যাম্পসাইট ও নির্ভার পরিবেশের সার্ফিং স্কুল।
দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ভেস্টারল্যান্ড। ষাট ও সত্তরের দশকে শহরটির উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটে। থাকার জন্য আরও আকর্ষণীয় দুটি বিকল্প হলো অভিজাত কাম্পেন এবং সামুদ্রিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী খড়ের ছাউনির বাড়ির জন্য পরিচিত কাইটুম।
দ্বীপের বিভিন্ন অংশ সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকা। লিস্টের পরিবর্তনশীল বালিয়াড়ি থেকে শুরু করে বিশাল ব্রাডেরুপ হিথ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে নানা আকর্ষণ।
খাবারের ক্ষেত্রেও জিল্ট পিছিয়ে নেই। কাফেরোস্টেরাই জিল্ট থেকে কফি, হাফেনকিয়স্ক ২৪ থেকে হেরিং মাছের স্যান্ডউইচ এবং জার্মানির একমাত্র বাণিজ্যিক ঝিনুক খামারে উৎপাদিত ‘জিল্টার রয়্যাল’ ঝিনুক চেখে দেখা যেতে পারে। ওমা ভিলমায় পাওয়া যায় পেটভরা ঘরোয়া খাবার। পুরোনো ছাগলের খামারে গড়ে ওঠা কেজেক্লুব-এ রয়েছে বেছে নেওয়া বিভিন্ন ধরনের চিজ।
কোথায় থাকবেন: শিল্পনগরী স্থাপত্যের ভবনে অবস্থিত সম্প্রতি সংস্কার করা ভিলা ক্লাসেন। সকালের নাশতাসহ দুজনের থাকার খরচ শুরু ১২০ ইউরো থেকে।
শেরকিন, আয়ারল্যান্ড
কর্ক শহর থেকে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট এবং এরপর ১০ মিনিটের ফেরিযাত্রায় পৌঁছানো যায় শেরকিনে। পশ্চিম কর্ক উপকূলের কাছে বসবাসযোগ্য সাতটি দ্বীপের একটি এটি। প্রাণবন্ত বাজার ও ব্যস্ত পানশালার শহর পেরিয়ে শেরকিনে পৌঁছালে পরিবেশ হয়ে ওঠে অনেক বেশি শান্ত।
আয়তনে ছোট হলেও পশ্চিম কর্কের দ্বীপগুলোর বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য। গারিনিশের এডওয়ার্ডীয় আমলের বাগান যেমন এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করে, তেমনি বিয়ারা উপদ্বীপের প্রান্তে অবস্থিত ডার্সি দ্বীপ প্রকৃতির রুক্ষ রূপের পরিচয় দেয়।
শেরকিনের প্রধান আকর্ষণ এর ধীরগতির দ্বীপজীবন। এখানে রয়েছে তিনটি চিহ্নিত হাঁটার পথ, যেগুলো সবুজ অভ্যন্তরীণ এলাকা পেরিয়ে নিয়ে যায় সাদা বালুর সৈকত ও ঘোড়ার নালের মতো আকৃতির সুন্দর একটি উপসাগরের কাছে।
বন্দরের দিকে রয়েছে দ্বীপটির একমাত্র পানশালা ‘জলি রজার’; এখানে চাউডার ও টোস্টি পরিবেশনের পাশাপাশি ব্যস্ত মৌসুমে বসে সংগীতের আসর।
দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে শিল্পীদের স্টুডিও। খোলার সময় ভিন্ন হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে যোগাযোগ করে নেওয়া ভালো।
শেরকিনের প্রবেশদ্বার হলো মূল ভূখণ্ডের প্রাণচঞ্চল শহর বাল্টিমোর। এখান থেকেই দক্ষিণে কেপ ক্লিয়ার যাওয়ার পথও রয়েছে।
হেয়ার বা হেয়ার দ্বীপে যেতে হলে বাল্টিমোর থেকে আধঘণ্টা পশ্চিমে কানামোর পিয়ার পর্যন্ত গাড়িতে গিয়ে ফেরি ধরতে হয়। গ্রীষ্মকালে সেখানে পাওয়া যায় আইল্যান্ড কটেজ—রেস্তোরাঁ ও রান্নার প্রশিক্ষণকেন্দ্র দুটোই। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে এটি বিশেষ আকর্ষণ।
কোথায় থাকবেন: শেরকিন নর্থ শোর-এ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি রাতের কক্ষভাড়া ৬৫ ইউরো থেকে এবং ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৩০ ইউরো। বেল টেন্টের ভাড়া ৮০ ইউরো থেকে; নিজস্ব তাঁবুর জন্য জায়গা ভাড়া ১৫ ইউরো।
টরচেল্লো, ইতালি
ভেনিসের ব্যস্ততা থেকে অল্প দূরেই রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহের টরচেল্লো। ভেনিসের বিখ্যাত মুরানো ও বুরানো ঘুরে আরও ছোট একটি নৌকায় উঠলেই পৌঁছানো যায় লেগুনের উত্তর প্রান্তের এই স্বল্প জনবসতিপূর্ণ দ্বীপে।
টরচেল্লোতে নৌকা থেকে নামার পর প্রথমেই চোখে পড়ে চারপাশের খোলামেলা পরিবেশ। জল ও গাছপালার মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া প্রশস্ত পথটি সবুজ মাঠ ও ছোট ছোট বাড়িঘর পেরিয়ে নিয়ে যায় পন্তে দেল দিয়াভোলো, অর্থাৎ ‘শয়তানের সেতু’-তে। পুরোনো ভেনিসীয় সেতুর বিরল এই নিদর্শনটির দুই পাশে কোনো রেলিং নেই।
খাবারের জন্য তাভের্না তিপিকা ভেনেজিয়ানায় পাওয়া যায় ভাজা সামুদ্রিক খাবার ও বিভিন্ন নিরামিষ পদ। বাগানে বসলে রেস্তোরাঁর ছাগল ও গিনিপিগও দেখা যায়।
তবে টরচেল্লোর প্রধান আকর্ষণ সান্তা মারিয়া আসুন্তা ব্যাসিলিকা। ৬৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গির্জার বাইরের চেহারা সাদামাটা হলেও ভেতরের দেয়ালে রয়েছে একাদশ শতাব্দীর অসাধারণ মোজাইক। এর মধ্যে শেষ বিচারের দৃশ্যও রয়েছে।
দর্শন শেষে গির্জার পাশের জলধারে বসে আইসক্রিম খাওয়া যায়। দিনের পর্যটকেরা চলে যাওয়ার পর দ্বীপের প্রকৃত শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে রাত কাটানোই ভালো।
কোথায় থাকবেন: জুনিয়র স্যুইটস ভেনেজিয়ায় রয়েছে রেস্তোরাঁ, কফিশপ ও বাগান। দুই রাতের জন্য দুজনের থাকার খরচ শুরু ১৮৩ পাউন্ড থেকে।
মার্সেইয়ের ভিয়ু পোর থেকে নৌকায় মাত্র ২০ মিনিটের পথ। তাই শহর থেকে এক দিনের ভ্রমণের জন্য যেমন উপযোগী, তেমনি কয়েক দিন অবস্থান করলে ফ্রিউল দ্বীপপুঞ্জের বুনো সৌন্দর্য আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।
প্রধান দুটি দ্বীপ রাতোনো ও পোমেগ। দুটির দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় মাইল এবং উনিশ শতকের একটি বাঁধ তাদের যুক্ত করেছে। সাদা চুনাপাথরের ভূদৃশ্যের মধ্য দিয়ে হাঁটার পথ চলে গেছে নিরিবিলি সৈকত, ছোট ছোট খাঁড়ি ও দর্শনীয় স্থানের দিকে। সেখান থেকে ঝকঝকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে মার্সেই শহরের দৃশ্য দেখা যায়।
ফেরি এসে ভিড়ে রাতোনো বন্দরে। আশপাশে কয়েকটি রেস্তোরাঁ, দোকান ও বাড়িঘর রয়েছে। অন্যত্র সুযোগ-সুবিধা কম, তাই খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী এখান থেকেই সংগ্রহ করে নেওয়া ভালো।
তাজা সামুদ্রিক খাবারের জন্য উ স্যিনঁ রেস্তোরাঁ একটি ভালো বিকল্প। পোমেগ দ্বীপে উৎপাদিত জৈব সি-বাসও এখানে পাওয়া যায়।
বন্দর থেকে প্রায় আধঘণ্টা হাঁটলেই সাঁ-এস্তেভ সৈকত। আশ্রয়যুক্ত বালুময় এই সৈকত স্নরকেলিংয়ের জন্যও উপযোগী। কাছেই রয়েছে ছোট একটি পানশালা।
উনিশ শতকের ওপিতাল কারোলিন একসময় ভ্রমণকারীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে সেখানে মাঝে মাঝে সংগীতানুষ্ঠান হয়। পুরোনো দুর্গ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাঙ্কারগুলো দ্বীপগুলোর সামরিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
পাশের পোমেগ দ্বীপে দীর্ঘ হাঁটার পথ ধরে পৌঁছানো যায় নিরিবিলি কালাঁক দ্য লা ক্রিন উপসাগরে।
ফ্রিউল দ্বীপপুঞ্জের আরও দুটি উল্লেখযোগ্য দ্বীপ হলো ছোট পাথুরে তিবুলেন, যা মূলত ডাইভিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়, এবং ইফ দ্বীপ। এখানে রয়েছে ষোড়শ শতকের দুর্গ-কারাগার শাতো দিফ, যা আলেকজান্দ্র দ্যুমার দ্য কাউন্ট অব মন্টে ক্রিস্টো উপন্যাসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
কোথায় থাকবেন: থাকার ব্যবস্থা সীমিত এবং মূলত বন্দরের আশপাশের ভাড়ার অ্যাপার্টমেন্ট। লা দোরাদ দু ফ্রিউল সমুদ্রসৈকতের পাশে একটি এক-বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট; ভাড়া শুরু প্রতি রাত ৭০ পাউন্ড থেকে।
ক্যারিবীয় আবহের সৈকত, অথচ ক্যাম্পিংয়ের বাজেট—উত্তর-পশ্চিম স্পেনের সিয়েস দ্বীপপুঞ্জ এমন ভ্রমণের জন্য আদর্শ। গালিসিয়ার ভিগো শহরের উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে সাদা বালুর সৈকত, ফিরোজা রঙের পানি এবং সীমিত পর্যটনের কারণে একান্ত পরিবেশ।
দ্বীপগুলো জাতীয় উদ্যানের অংশ হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত। ইস্টার ও গ্রীষ্মকালে এখানে রাত কাটানোর সুযোগ রয়েছে। তবে আটলান্টিকের ঠান্ডা পানিতে নামলে ক্যারিবীয় আবহের কল্পনায় কিছুটা ছেদ পড়তে পারে।
গালিসিয়ার ভিগো শহরের উপকূলের এই দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে সাদা বালুর সৈকত, ফিরোজা রঙের সমুদ্র এমনকি ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো একান্ত পরিবেশও।
দ্বীপগুলোতে যেতে সর্বোচ্চ ৯০ দিন আগে বিনা মূল্যে অনুমতিপত্রের কোডের জন্য আবেদন করতে হয়। অনুমোদন পাওয়ার পর সেই কোড ব্যবহার করে নৌকার টিকিট কিনতে হয়।
ভিগো থেকে প্রতিদিন নৌকা যায় মন্তে আগুদো দ্বীপে; সময় লাগে প্রায় ৪৫ মিনিট। মন্তে আগুদো ও ফারো দ্বীপ একটি উপহ্রদের ওপর বিস্তৃত বালুর বাঁধের মাধ্যমে যুক্ত। তৃতীয় দ্বীপ সান মার্তিনোতে অবশ্য কেবল ব্যক্তিগত নৌকায় যাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় সৈকত রোদাস জেটি থেকে অল্প হাঁটলেই পৌঁছানো যায়। এখানে কায়াক ও স্নরকেলিংয়ের সরঞ্জাম ভাড়ায় পাওয়া যায়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মাছ না থাকলেও অক্টোপাস, গলদা চিংড়ি ও কাঁকড়া দেখা যায়; অনেক সময় বোতলনাক ডলফিনও চোখে পড়ে।
চারটি হাঁটার পথ ধরে আরও সাতটি নিরিবিলি সৈকতে যাওয়া যায়। পথে রয়েছে বাতিঘর, দর্শনীয় স্থান, বনভূমি ও পাখি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র।
সৈকতের পাশের রোদাস সৈকত রেস্তোরাঁ সামুদ্রিক খাবারের জন্য পরিচিত। স্ক্যালপ, রেজর ক্ল্যাম, গালিসীয় বার্নাকল এবং স্থানীয় আলবারিনিও পানীয় এখানকার উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ।
কোথায় থাকবেন: ফারো দ্বীপের সিয়েস দ্বীপপুঞ্জ ক্যাম্পিং-এ রয়েছে রেস্তোরাঁ, বিছানাসহ তাঁবু এবং ক্যাম্পিংয়ের জায়গা। থাকার জায়গার ভাড়া শুরু ১০.৯০ ইউরো থেকে। এর সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি ১০.৯০ ইউরো এবং শিশু প্রতি ৭.৯০ ইউরো দিতে হয়। আগাম বুকিং আবশ্যক।








