ইনস্টাগ্রামের স্ক্রল থেকে শুরু করে শহরের ক্যাফের ব্রাঞ্চ মেনু অ্যাভোকাডো এখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। টোস্ট, সালাদ কিংবা গুয়াকামোল নানা পদে এই সবুজ ফলের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার বহু আগেই একটি দেশের খাদ্য, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল অ্যাভোকাডো। সেই দেশ মেক্সিকো। আর মেক্সিকোর এমন একটি শহর রয়েছে, যার পরিচয়ই যেন এই ফলকে ঘিরে তৈরি। শহরটির নাম উরুয়াপান।
মিচোয়াকান অঙ্গরাজ্যের এই শহরটি কয়েক দশক ধরে ‘বিশ্বের অ্যাভোকাডো রাজধানী’ নামে পরিচিত। যদিও এটি কোনও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক উপাধি নয়, অ্যাভোকাডো চাষ, বাণিজ্য ও স্থানীয় জীবনের সঙ্গে উরুয়াপানের গভীর সম্পর্কের কারণেই এমন পরিচিতি তৈরি হয়েছে। শহরের চারপাশে বিস্তীর্ণ অ্যাভোকাডো বাগান, কৃষিকাজকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে উরুয়াপান যেন অ্যাভোকাডোর এক বিশাল জগতের কেন্দ্র।
মেক্সিকোর অ্যাভোকাডো শিল্পের কথা উঠলেই সবার আগে আসে মিচোয়াকানের নাম। ২০২৬ সালের মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মিচোয়াকানে প্রায় ২০ লাখ ৪০ হাজার টন অ্যাভোকাডো উৎপাদিত হয়েছে, যা মেক্সিকোর মোট উৎপাদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
মিচোয়াকানের বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্যজুড়ে তাকালে এই বিপুল উৎপাদনের চিত্র সহজেই বোঝা যায়। ঢেউখেলানো পাহাড়ি জমিতে একের পর এক অ্যাভোকাডো বাগান ছড়িয়ে রয়েছে। সবুজ গাছের সারি আর উঁচুনিচু প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য মিলে অঞ্চলটির আলাদা এক সৌন্দর্য তৈরি করেছে।
তবে এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু চাষাবাদে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাভোকাডো সংগ্রহের পর বাছাই, প্যাকেটজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও রপ্তানির মতো নানা কার্যক্রমও মিচোয়াকানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ফলে অঙ্গরাজ্যটি মেক্সিকোর অ্যাভোকাডো শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
মিচোয়াকানের অ্যাভোকাডো সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ। উর্বর আগ্নেয় মাটি, উপযোগী উচ্চতা এবং তুলনামূলকভাবে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া অ্যাভোকাডো চাষের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই প্রাকৃতিক সুবিধার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৃষি অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়ে মিচোয়াকানকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অ্যাভোকাডো উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত করেছে। আর এই বিশাল উৎপাদন বলয়ের কেন্দ্রেই রয়েছে উরুয়াপান।
অ্যাভোকাডো উৎপাদনকারী কৃষকদের সঙ্গে দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উরুয়াপান। উৎপাদন অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত অ্যাভোকাডো পৌঁছে দেওয়ার পুরো বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় শহরটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
শহরের সঙ্গে অ্যাভোকাডোর সম্পর্ক শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতি বছর ফলটিকে ঘিরে আয়োজিত হয় এক্সপো ফেরিয়া দেল আগুয়াকাতে। মেক্সিকোর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও এই উৎসবের বিবরণে উরুয়াপানকে ‘বিশ্বের অ্যাভোকাডো রাজধানী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে কৃষি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি অ্যাভোকাডো স্থানীয় সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে।
মিচোয়াকানে অ্যাভোকাডোকে শুধু একটি ফল হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা কঠিন। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো মানুষের জীবিকা। কৃষক, বাগানের শ্রমিক, প্যাকিং কর্মী, পরিবহনকর্মী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও রফতানিকারক বিভিন্ন পেশার মানুষের আয়ের সঙ্গে অ্যাভোকাডো শিল্প সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্বজুড়ে অ্যাভোকাডোর চাহিদা বাড়তে থাকায় অঞ্চলটির অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দ্রুত সম্প্রসারিত হয় চাষাবাদ ও বাণিজ্য। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতি ও ভূদৃশ্যেও।
অ্যাভোকাডো মেক্সিকোর কাছে শুধু রপ্তানির পণ্য নয়, খাদ্যসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাভোকাডো টোস্ট জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই মেক্সিকোর ঘরোয়া রান্নায় এই ফলের ব্যবহার হয়ে আসছে।
গুয়াকামোলের প্রধান উপকরণ হিসেবে অ্যাভোকাডো বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এর পাশাপাশি টাকো, টর্টা, স্যুপ, সালাদসহ নানা মেক্সিকান পদেও ব্যবহার করা হয় এটি। অর্থাৎ মেক্সিকানদের খাবারের টেবিলে অ্যাভোকাডোর উপস্থিতি বহু প্রজন্মের ঐতিহ্য।
এই খাদ্যঐতিহ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ায় অ্যাভোকাডো এখন মেক্সিকোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে। মিচোয়াকানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট অ্যাভোকাডো রপ্তানি মূল্যের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে মেক্সিকো যুক্ত ছিল।
অর্থনীতিতে অ্যাভোকাডোর বিশাল অবদানের কারণে মেক্সিকোতে ফলটিকে প্রায়ই ‘সবুজ সোনা’ বলা হয়। কৃষি, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই তিন ক্ষেত্রেই এর প্রভাব স্পষ্ট।
আর এই ‘সবুজ সোনা’র সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকা শহরগুলোর একটি উরুয়াপান। শহরের আশপাশে যতদূর চোখ যায় অ্যাভোকাডোর বাগান, আর সেই বাগান ঘিরে গড়ে উঠেছে মানুষের জীবন ও অর্থনীতি।
যদিও ‘বিশ্বের অ্যাভোকাডো রাজধানী’ কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, উরুয়াপানের ক্ষেত্রে এই উপাধি যে অমূলক নয়, তা শহরটির চারপাশের দৃশ্যই বলে দেয়। মিচোয়াকানের সবুজ পাহাড়, বিস্তীর্ণ অ্যাভোকাডো বাগান, কৃষকের ব্যস্ততা এবং বিশ্ববাজারমুখী বাণিজ্যের কারণে উরুয়াপান সত্যিই অ্যাভোকাডোকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক অনন্য শহর।
সূত্র: এনডিটিভি









