একসময় আকাশপথে হাজার হাজার যাত্রী ও পণ্য বহন করেছে। এখন সেই বিশাল উড়োজাহাজটির ঠিকানা সমুদ্রের তলায়। রানওয়েতে নয়, জীবনের শেষ ‘অবতরণ’ হয়েছে এজিয়ান সাগরের বালুময় তলদেশে। অবসর নেওয়া একটি এয়ারবাস এ-৩০০-কে ইচ্ছাকৃতভাবে সমুদ্রে ডুবিয়ে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সামুদ্রিক আবাসস্থল। একই সঙ্গে এটি এখন ডাইভিংপ্রেমীদের জন্যও হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী আকর্ষণ।
২০১৬ সালে তুরস্কের আয়দিন প্রদেশের পর্যটন শহর কুশাদাসির উপকূলের কাছে ডুবিয়ে দেওয়া হয় ৫৪ মিটার দীর্ঘ বিমানটি। এর পেছনে ছিল দুটি উদ্দেশ্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন একটি আবাসস্থল তৈরি করা এবং কুশাদাসিকে ডাইভিং পর্যটনের আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।
জুনের এক শান্ত ও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে শুরু হয় বিমানটিকে সমুদ্রের তলদেশে নামানোর কাজ। বিশাল উড়োজাহাজটিকে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাতে সময় লাগে তিন ঘণ্টারও বেশি। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২২ মিটার গভীরে বালুময় সমুদ্রতলে স্থাপন করা হয় এয়ারবাসটিকে। তবে ডাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা শুরু হয় প্রায় ১৭ মিটার গভীরতা থেকে।
আকাশে দীর্ঘ কর্মজীবন
সমুদ্রের নিচে যাওয়ার আগে এয়ারবাস এ-৩০০টির আকাশে দীর্ঘ কর্মজীবন ছিল। ১৯৮০ সালে ফ্রান্সের তুলুজে তৈরি বিমানটি ওই বছরের ১৪ মার্চ প্রথমবার আকাশে ওড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে হাজার হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করে এটি।
প্রায় দুই দশক গ্রিসের অলিম্পিক এয়ারওয়েজের হয়ে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহৃত হয় বিমানটি। পরে এটিকে পণ্যবাহী উড়োজাহাজে রূপান্তর করা হয়। ২০০৬ সালের জুন থেকে তুরস্কে কার্গো পরিবহনের কাজে উড়ছিল এটি।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানের পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে বিমানটি পরিচালনা করা আর লাভজনক ছিল না। ৩৬ বছর বয়সে অবসর নেয় এয়ারবাসটি।
এরপরও অবশ্য এর গল্প থেমে যায়নি। আয়দিন পৌরসভা একটি বেসরকারি বিমান সংস্থার কাছ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার তুর্কি লিরায় বিমানটি কিনে নেয়। সে সময় এর মূল্য ছিল প্রায় ৯৩ হাজার মার্কিন ডলার।
ইস্তাম্বুল থেকে কুশাদাসি, তারপর সমুদ্রের তলায়
অবসর নেওয়ার পর বিশাল বিমানটিকে সরাসরি সমুদ্রে নেওয়ার উপায় ছিল না। তাই প্রথমে সেটিকে বিভিন্ন অংশে খুলে ফেলা হয়। এরপর সড়কপথে ইস্তাম্বুল থেকে কুশাদাসিতে নিয়ে যাওয়া হয় অংশগুলো।
কুশাদাসিতে পৌঁছানোর পর আবার জোড়া লাগানো হয় পুরো উড়োজাহাজ। এবার অবশ্য আকাশে ফেরার জন্য নয়। বরং অপেক্ষা করছিল তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত যাত্রা—সমুদ্রের গভীরে পাড়ি দেওয়া।
ডুবিয়ে দেওয়ার আগে বিমানটির ভেতর থেকেও সরিয়ে ফেলা হয় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান। কাচ ও ধারালো অংশের মতো ডুবুরিদের জন্য বিপজ্জনক জিনিস পরিষ্কার করা হয়। ককপিটের মূল যন্ত্রপাতি, তার ও সুইচও সরিয়ে নেওয়া হয়।
সব প্রস্তুতি শেষে বিশাল এয়ারবাসটিকে সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা হয়। ঝড় বা শক্তিশালী স্রোতে যাতে বিমানটি সরে না যায়, সে জন্য সেটিকে সমুদ্রতলের সঙ্গে শক্তভাবে স্থির করা হয়।
ডুবুরিদের জন্য পানির নিচে ‘বিমানভ্রমণ’
সমুদ্রের নিচে নামার পর এয়ারবাসটির নতুন জীবন শুরু হয়। বিশাল কাঠামোটি ধীরে ধীরে সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়। এ ধরনের ডুবে থাকা কাঠামো সময়ের সঙ্গে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জন্য নতুন আবাসস্থল তৈরি করতে পারে।
তবে সামুদ্রিক জীবনের পাশাপাশি মানুষের কাছেও এটি তৈরি করেছে নতুন আকর্ষণ। ডুবুরিরা পানির নিচে নেমে বিমানের বিশাল কাঠামোটি দেখতে পারেন। পাশের অংশ দিয়ে প্রবেশ করে ঘুরে দেখা যায় দীর্ঘ অভ্যন্তরও।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা অবশ্যই ককপিট। মূল নিয়ন্ত্রণযন্ত্র সরিয়ে ফেলা হলেও ককপিটের কাঠামোটি রাখা হয়েছে। ফলে ডুবুরিরা সেখানে প্রবেশ করতে পারেন এবং তিনটি আসনের একটিতে বসার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন। যে জায়গা থেকে একসময় পাইলট আকাশযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতেন, এখন সেখানে পানির নিচে সাঁতার কাটছেন ডুবুরিরা।
তুরস্কের সবচেয়ে বড় ‘ডুবন্ত বিমান’
ডাইভিং পর্যটন বাড়াতে তুরস্ক এর আগেও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর কাছে কয়েকটি ছোট বিমান সমুদ্রে ডুবিয়েছিল। কিন্তু এয়ারবাস এ-৩০০ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার প্রকল্প।
৫৪ মিটার দীর্ঘ বিমানটির ডানার বিস্তার প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ মিটার। তুরস্কে ইচ্ছাকৃতভাবে সমুদ্রের তলদেশে নামানো বিমানগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে বড়।
একসময় আকাশে উড়ত, যাত্রী ও পণ্য নিয়ে ছুটত দেশ থেকে দেশে। এখন তার ডানা আর নড়ে না, ইঞ্জিনও গর্জে ওঠে না। তবু শেষ হয়ে যায়নি তার যাত্রা। আকাশের উড়োজাহাজটি এখন সমুদ্রের নিচে একদিকে সামুদ্রিক জীবনের আশ্রয়, অন্যদিকে ডুবুরিদের জন্য এক অভিনব ‘আন্ডারওয়াটার এয়ারক্রাফট’।
সূত্র: এনডিটিভি









