সন্ধ্যার পর যে বনে ঢোকে না কেউ, রাতে কী ঘটে সেখানে?

ফিচার ডেস্ক
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:১৯আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:১৯

ভারত ভ্রমণে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে দিল্লি, আগ্রা, কলকাতা কিংবা রাজস্থানের পাশাপাশি ধর্মীয় পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ বৃন্দাবন। বিশেষ করে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও অনেক ভক্ত বৃন্দাবনে যান। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও নানা কিংবদন্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকা এই শহরে রয়েছে অসংখ্য মন্দির ও ধর্মীয় স্থান।

তবে ভারতের উত্তর প্রদেশের বৃন্দাবনে রয়েছে এমন এক পবিত্র বন, যাকে ঘিরে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে নানা রহস্যময় কাহিনি ও ধর্মীয় বিশ্বাস। নাম নিধিবন। নিধিবনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় এর রাতের রহস্য নিয়ে। দিনের বেলায় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকলেও সূর্যাস্তের আগেই খালি করে দেওয়া হয় পুরো প্রাঙ্গণ। এরপর বন্ধ হয়ে যায় প্রবেশদ্বার। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিদিন রাতের নীরবতায় এখানেই রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণেই সন্ধ্যার আগেই দর্শনার্থীদের বের করে দিয়ে পুরো প্রাঙ্গণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই বিশ্বাস, অদ্ভুত আকৃতির তুলসীগাছ এবং রাতের নানা রহস্যময় কাহিনি নিধিবনকে করে তুলেছে বৃন্দাবনের অন্যতম আলোচিত আধ্যাত্মিক গন্তব্য। এটি ভক্তি, লোককথা ও দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিশ্বাসে ঘেরা একটি পবিত্র বনভূমি।

নিধিবন কী?

নিধিবন বৃন্দাবনের একটি তুলনামূলক ছোট পবিত্র বনভূমি। এখানে ঘন হয়ে বেড়ে উঠেছে অসংখ্য তুলসীগাছ। স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থানেই প্রতি রাতে শ্রীকৃষ্ণ রাধা ও গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা করেন।

নিধিবনের বিশেষত্ব হলো, সন্ধ্যা নামার আগেই পুরো এলাকা খালি করে দেওয়া হয়। পুরোহিত, নিরাপত্তাকর্মী ও দর্শনার্থীরা বেরিয়ে যাওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রবেশদ্বার। রাতের বেলায় সাধারণ দর্শনার্থীদের সেখানে অবস্থান করার অনুমতি নেই।

নিধিবন ঘিরে যত রহস্য

নিধিবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ভক্তদের বিশ্বাস, সন্ধ্যার পর নিধিবন বন্ধ হয়ে গেলে শ্রীকৃষ্ণ এখানে এসে রাধা ও গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা করেন।

এখানকার তুলসীগাছগুলোর আকৃতিও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। গাছগুলো তুলনামূলক খাটো, বাঁকানো এবং পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। অনেক গাছকে জোড়ায় জোড়ায় বেড়ে উঠতে দেখা যায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাতের বেলায় এসব গাছ গোপী ও তাঁদের সঙ্গীর রূপ নেয় এবং ভোরে আবার গাছের রূপে ফিরে আসে।

এসব বিশ্বাস ও কিংবদন্তিই নিধিবনকে বৃন্দাবনের অন্যতম রহস্যময় ধর্মীয় স্থান হিসেবে পরিচিত করেছে।

রং মহলে রাতের আয়োজন

নিধিবনের সবচেয়ে আলোচিত স্থানগুলোর একটি রং মহল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাসলীলার পর রাধা ও শ্রীকৃষ্ণ এখানে বিশ্রাম নেন।

দীর্ঘদিনের একটি ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিধিবন বন্ধ করার আগে রং মহলে শয্যা সাজিয়ে রাখা হয়। সেখানে পানি, মিষ্টি, কাজল, চিরুনি ও অন্যান্য সামগ্রীও রাখা হয়। এরপর পুরো স্থানটি রাতের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পরদিন সকালে শয্যাটি এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায় এবং রাখা সামগ্রীগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন দেখা যায়। ভক্তরা এসব ঘটনাকে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে এগুলো মূলত স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত কাহিনির অংশ।

রাতে নিধিবনে প্রবেশ নিষেধ কেন?

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথায় বলা হয়, রাতে নিধিবনে শ্রীকৃষ্ণের লীলাদর্শনের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের জীবনে নানা দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে মিল রেখেই সূর্যাস্তের পর পুরো বনভূমি বন্ধ রাখার রীতি প্রচলিত হয়েছে।

তাই ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্ধ্যার পর নিধিবনের ভেতরে প্রবেশ বা অবস্থান করার চেষ্টা না করা। ধর্মীয় স্থান হিসেবে এর নিয়মকানুন ও স্থানীয় রীতির প্রতি সম্মান দেখানো।

নিধিবনের ভেতরে যা দেখবেন

আয়তনে ছোট হলেও নিধিবনের ভেতরে বেশ কয়েকটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। এর মধ্যে রং মহল, বাঁকানো তুলসীগাছের বনভূমি, বিশাখা কুণ্ড, ললিতা কুণ্ড এবং বাঁশি চোর রাধারানি মন্দির উল্লেখযোগ্য।

রহস্যময় তুলসীবন: নিধিবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এখানকার বাঁকানো ও পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তুলসীগাছ। এসব গাছকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নানা ধর্মীয় বিশ্বাস ও কিংবদন্তি।

বিশাখা কুণ্ড: ছোট এই পবিত্র জলাশয়টি বৈষ্ণব ঐতিহ্যে রাধার ঘনিষ্ঠ সখী বিশাখা সখীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্বাস করা হয়। সকালের দিকে জায়গাটি তুলনামূলক শান্ত থাকে।

ললিতা কুণ্ড: রাধার অন্যতম প্রধান সখী ললিতা সখীর সঙ্গে এই পবিত্র জলাশয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রচলিত বিশ্বাস। ভক্তরা এখানে প্রার্থনা ও কিছু সময় নিরিবিলিতে কাটান।

বাঁশি চোর রাধারানি মন্দির: নিধিবন প্রাঙ্গণের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি। শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলাকাহিনির সঙ্গে এই মন্দিরের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশ থেকে গেলে কখন যাবেন?

নিধিবন ঘুরে দেখার জন্য সকাল সবচেয়ে ভালো সময় হতে পারে। ভোরের দিকে আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক থাকে এবং দর্শনার্থীর ভিড়ও কম থাকে। ফলে শান্ত পরিবেশে পুরো জায়গাটি ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।

সাধারণত ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় হাতে রাখলে নিধিবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে দেখা সম্ভব। তবে জন্মাষ্টমী, পূজা বা বিশেষ ধর্মীয় আয়োজনে ভিড় বেড়ে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশ থেকে বিশেষ কোনও উৎসবকে কেন্দ্র করে গেলে আগে স্থানীয় সময়সূচি ও প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম জেনে নেওয়া ভালো।

নিধিবনে কীভাবে যাবেন?

নিধিবন বৃন্দাবনের কেন্দ্রীয় এলাকায় অবস্থিত। বিখ্যাত বাঁকে বিহারি মন্দির থেকেও এটি হাঁটা দূরত্বের মধ্যে। বৃন্দাবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে অটোরিকশা ও ই-রিকশায় সহজেই নিধিবনের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।

বাংলাদেশ থেকে বিমানে দিল্লি হয়ে বৃন্দাবন যাওয়ার পরিকল্পনা করলে সড়ক বা রেলপথে পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থা করা যায়। আবার আগ্রা বা দিল্লির সঙ্গে বৃন্দাবনকে মিলিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা করলেও সময় বাঁচানো সম্ভব।

প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি

নিধিবনে প্রবেশের জন্য সাধারণত কোনও প্রবেশমূল্য নেই। সব দর্শনার্থীকেই নির্ধারিত প্রবেশপথ ও চলাচলের পথ অনুসরণ করতে হয়।

গ্রীষ্মকালে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনের সময় উল্লেখ করা হয়। শীতকালে, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সময় থাকে। দুপুর ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সাধারণত প্রাঙ্গণ বন্ধ থাকে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সূর্যাস্তের আগেই নিধিবন খালি করে দেওয়া হয়। তাই বিকালে গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দর্শন শেষ করে বের হয়ে আসতে হবে। ভ্রমণের দিন স্থানীয়ভাবে সময়সূচি নিশ্চিত করে নেওয়াই নিরাপদ।

গাইড নেওয়া কি প্রয়োজন?

প্রথমবার নিধিবন গেলে স্থানীয় ও বিশ্বস্ত একজন গাইড সঙ্গে থাকলে জায়গাটি বোঝা সহজ হতে পারে। ভেতরের পথগুলো নির্দিষ্ট ও ঘেরা থাকায় দর্শনার্থীরা ইচ্ছেমতো সব জায়গায় ঘুরতে পারেন না। ফলে গাইড থাকলে বিভিন্ন স্থানের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত কাহিনি সম্পর্কে জানা যায়।

তবে গাইড নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত বা বিশ্বস্ত ব্যক্তিকেই বেছে নেওয়া ভালো। অতিরঞ্জিত অলৌকিক দাবি বা অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সতর্ক থাকা উচিত।

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য শেষ কথা

নিধিবন মূলত একটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক গল্প বিশ্বাস ও লোককথার ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত। তাই ভ্রমণের সময় ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং স্থানীয় নিয়ম মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বৃন্দাবনে গিয়ে শুধু জনপ্রিয় মন্দির দর্শন নয়, নিধিবনের মতো রহস্যময় ও ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘুরে দেখলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে যারা ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোককথা জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য নিধিবন হতে পারে ভিন্নধর্মী এক স্থান।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে ‘নতুন তথ্য নেই’: ভারত
ব্রিকস সম্মেলনের আগেই মোদি-পুতিন বৈঠক
এক পাথর কেটেই তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম একশিলা মন্দির
সর্বশেষ খবর
আশি ও নব্বই দশকের লুকে ভাইরাল দেশের তারকারা
আশি ও নব্বই দশকের লুকে ভাইরাল দেশের তারকারা
প্রকল্পের মেয়াদ-ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে নতুন নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
প্রকল্পের মেয়াদ-ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে নতুন নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
মাদক নির্মূল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর বার্তা দিলেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন
মাদক নির্মূল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর বার্তা দিলেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন
‘কেয়ামতের মাছ’ ভেসে আসার ৬ দিন পর ৬ আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত, কাকতালীয় নাকি সংকেত?
‘কেয়ামতের মাছ’ ভেসে আসার ৬ দিন পর ৬ আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত, কাকতালীয় নাকি সংকেত?
সর্বাধিক পঠিত
বাঁধনের ওপর হামলা: আসিফ নজরুল বললেন, ‘ব্যবস্থা নিলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে’
বাঁধনের ওপর হামলা: আসিফ নজরুল বললেন, ‘ব্যবস্থা নিলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে’
সৌদি আরবে কোনও নদী নেই, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে ৩৭ মিলিয়ন মানুষ
সৌদি আরবে কোনও নদী নেই, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে ৩৭ মিলিয়ন মানুষ
সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, মধুতে চিনির সিরাপ: সংসদে সানসিলা
সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, মধুতে চিনির সিরাপ: সংসদে সানসিলা
বাঁধনের ওপর হামলা: মনিরুলকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলো তার পরিবার
বাঁধনের ওপর হামলা: মনিরুলকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলো তার পরিবার
পরীমণির বায়োপিকে কাজ করতে চান দীঘি
পরীমণির বায়োপিকে কাজ করতে চান দীঘি