রহস্যময় রূপে অপরূপ মেঘ-পাহাড়ের দেশ খাগড়াছড়ি

ফিচার ডেস্ক
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৩ আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৩

সবুজ পাহাড়ের সারি, মেঘের আনাগোনা, পাহাড়ি ঝরনার কলতান আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি প্রকৃতির এমন নানা রূপ একসঙ্গে দেখতে পারেন খাগড়াছড়িতে। এখানে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে রয়েছে নানা আকর্ষণ। কোথাও অন্ধকার গুহার রোমাঞ্চ, কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনা, আবার কোথাও পাহাড়চূড়ায় শান্ত জলাশয়। ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের বিরতি নিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য খাগড়াছড়ি এক অনন্য স্থান।

চট্টগ্রাম বিভাগের এই পার্বত্য জেলার আয়তন প্রায় ২ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, পূর্বে ত্রিপুরা ও মিজোরাম, দক্ষিণে রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা। পাহাড়ি জনপদ, চেঙ্গী ও মাইনী নদীর উপত্যকা এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এই জেলার স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে।

খাগড়াছড়ির দর্শনীয় স্থানসমূহঃ পর্যটকদের জন্য খাগড়াছড়িতে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এখানে রয়েছে আকাশ-পাহাড়ের মিতালী, চেঙ্গী ও মাইনী উপত্যকার বিস্তীর্ণ সমতল ভূভাগ ও উপজাতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যতা। মহালছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙ্গা যেদিকেই চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানের বর্ণনা দেওয়া হলো-

আলুটিলা পাহাড়ের রহস্যময় গুহা (ছবি: সংগৃহীত)

আলুটিলা পাহাড় ও রহস্যময় গুহা: খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র। একে খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশ পথও বলা হয়ে থাকে। এই পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা যায় খাগড়াছড়ি শহরের বিস্তৃত দৃশ্য। এখানে রয়েছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি চমৎকার ডাকবাংলোও রয়েছে এখানে। পর্যটকরা চাইলে এখানে রাত্রিযাপনও করতে পারবেন।

আলুটিলার মূল আকর্ষণ প্রাকৃতিক গুহা। এই গুহা ২৮২ ফুট দৈর্ঘ্য এবং গুহার একপাশ থেকে অন্য পাশে যেতে সময় লাগবে ১৫ মিনিট। অন্ধকার গুহার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পেরোতে হয় পাথুরে পথ ও পানির ধারা। গুহার ভেতরে আলো কম থাকায় টর্চ লাইট বা মশাল নিয়ে যেতে হবে। গুহায় প্রবেশ পথের টিকিট মূল্য ১০ টাকা। চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে অথবা লোকাল বাস অথবা সিএনজি করে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে যেতে পারবেন। লোকাল বাসে ভাড়া লাগবে ১০-১৫ টাকা।

রিছাং ঝর্ণা (ছবি: সংগৃহীত)

রিছাং ঝর্ণায় প্রকৃতির সান্নিধ্য: খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার, পর্যটন মোটেল থেকে ৭ কিলোমিটার এবং আলুটিলা থেকে ২ কিলোমিটার দূরে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় অবস্থিত রিছাং ঝরনা। এখানে যেতে হলে আলুটিলা থেকে চাঁদের গাড়ি, লোকাল বাস বা সিএনজিতে আরও ২ কিলোমিটার এগিয়ে হৃদয় মেম্বার এলাকায় পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে ঝরনার দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। এই পথ হেঁটে অথবা মোটরবাইকে যাওয়া যায়। মোটরবাইকে জনপ্রতি যাওয়া-আসার ভাড়া প্রায় ১৫০ টাকা। চাঁদের গাড়ি বা সিএনজিতে গেলে ঝরনা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে নামতে হবে, বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে। আলুটিলা থেকে লোকাল বাসে হৃদয় মেম্বার এলাকায় যেতে ভাড়া লাগে প্রায় ৫ টাকা। রিছাং ঝরনার কাছেই রয়েছে আরও একটি ঝরনা, যা রিছাং ঝরনা-২ বা অপু ঝরনা নামে পরিচিত। তবে সেখানে যাওয়ার পথ কিছুটা দুর্গম। রিছাং ঝরনা থেকে হেঁটে পৌঁছতে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগে।

দেবতা পুকুর (ছবি: সংগৃহীত)

দেবতা পুকুরের শান্ত পরিবেশ: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত দেবতা পুকুর খাগড়াছড়ির অন্যতম আকর্ষণ। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই পুকুরটি খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের নুনছড়ি ত্রিপুরা গ্রামে অবস্থিত। পুকুরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৬০০ ফুট। পর্যটন মোটেল থেকে নুনছড়ি গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার, আর মাইছছড়ি থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি রুটের লোকাল বাসে মাইছছড়ি পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে হেঁটে গ্রামে পৌঁছনো যায়। চাইলে চাঁদের গাড়ি, সিএনজি বা ব্যক্তিগত গাড়িতে সরাসরি নুনছড়ি ত্রিপুরা গ্রাম পর্যন্ত যেতে পারেন। তবে পুকুরে পৌঁছতে পাহাড়ি পথে প্রায় এক থেকে সোয়া এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে যাওয়া-আসায় চাঁদের গাড়ির ভাড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

মাটিরাঙ্গার শতবর্ষী বটবৃক্ষ (ছবি: সংগৃহীত)

শতবর্ষী বটবৃক্ষের বিস্ময়: মাটিরাঙ্গা উপজেলার খেদাছড়ার কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে বিশাল এক প্রাচীন বটগাছ। পাঁচ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বটবৃক্ষের বয়স সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। অসংখ্য ঝুরি ও ডালপালা ছড়িয়ে থাকা গাছটি দেখতে প্রতি বছর ভিড় করেন বহু পর্যটক। খাগড়াছড়ি শহর থেকে বাসে মাটিরাঙ্গা বাজারে পৌঁছে সেখান থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে অথবা মোটরবাইকে যেতে হবে। মোটরবাইকে গেলে জনপ্রতি ভাড়া আনুমানিক ১০০ টাকা।

পানছড়ি অরণ্য কুটির ও রাবার ড্যাম (ছবি: সংগৃহীত)

পানছড়ি অরন্য কুটির ও রাবার ড্যাম: খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং পানছড়ি উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শান্তিপুর অরণ্যকুটির। প্রায় ৬৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই কুটিরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে ৪৮ দশমিক ৫ ফুট উচ্চতার বিশাল বৌদ্ধমূর্তি। এর মূল মূর্তির উচ্চতা ৪২ ফুট এবং বেদির উচ্চতা সাড়ে ৬ ফুট। ২০০৪ সালে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বৌদ্ধমূর্তি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন বহু পর্যটক। অরণ্যকুটির থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে রয়েছে একটি রাবার ড্যাম। অরণ্যকুটিরে যাওয়ার পথেই পড়বে এই ড্যামটি।খাগড়াছড়ি শহড়ের চেঙ্গি স্কোয়ার থেকে সিএনজি নিয়ে সরাসরি অরণ্যকুটির যাওয়া যায়। আপ-ডাউন ভাড়া ৮০০ টাকা পড়বে। মেইন রোড থেকে ৩ কি.মি. ভিতরে পাহাড়ের উপর অরণ্যকুটির। যাওয়ার পথে চেঙ্গি নদীর উপর নির্মিত রাবার ড্যাম দেখা যাবে।

সাজেক ভ্যালি (ছবি: সংগৃহীত)

সাজেক ভ্যালি: রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক ইউনিয়ন আয়তনের দিক থেকে জেলার সবচেয়ে বড়। সাজেক রাঙামাটির অন্তর্গত হলেও সেখানে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়ক। তাই খাগড়াছড়ি ভ্রমণে গেলে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে সাজেক ভ্যালি। খাগড়াছড়ি শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা।

খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বর থেকে চাঁদের গাড়ি বা সিএনজি রিজার্ভ করে সাজেক যাওয়া যায়। চাইলে ব্যক্তিগত মাইক্রোবাস বা গাড়িও নিয়ে যেতে পারেন। চাঁদের গাড়ির ভাড়া আনুমানিক ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং সিএনজির ভাড়া ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।

সাজেকে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজ। রুইলুই পাড়ায় সাজেক রিসোর্ট, রুনময় রিসোর্ট, রুইলুই পাড়া ক্লাব হাউস ও আলো রিসোর্টের মতো থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় কারবারিদের বাড়িতেও কক্ষ খালি থাকা সাপেক্ষে থাকার সুযোগ মিলতে পারে। রুইলুই পাড়া থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। সেখান থেকে ২০-২৫ মিনিট হেঁটে পৌঁছানো যায় কংলাক পাড়ায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পাড়া থেকে আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়।

এছাড়াও খাগড়াছড়িতে আরো যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- শহড়ের মধ্যে ইয়োংড বৌদ্ধ বিহার, নিউজিল্যান্ড, জেলা পরিষদ পার্ক ও ঝুলন্ত সেতু, খাগড়াছড়ি চার্চ, মং রাজার বাড়ি, লক্ষী-নারায়ন মন্দির, পাহাড়ী কৃষি গবেষনা কেন্দ্র, দিঘীনালা মানিকক্যের দিঘী, দিঘীনালা রিজার্ভ ফরেষ্ট, হাজাছড়া ঝর্ণা, মহালছড়ি হৃদ, ভগবান টিলা, দুই টিলা ও তিন টিলা, রামগড় লেক ও টি গার্ডেন, মানিকছড়ি মং রাজার বাড়িইত্যাদি।

কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাসে করে খাগড়াছড়ি যেতে হবে। নন-এসি বাস ভাড়া ৫২০ টাকা এবং এসি বাস ভাড়া ৮০০ টাকা। এসি বাস একমাত্র সেন্টমার্টিন নন-এসি বাস শ্যামলী, শান্তি পরিবহন, ঈগল, ইকোনো, সৌদিয়া, এস আলম ইত্যাদি। ঢাকা থেকে বাস ছাড়ে সকালে ও রাতে (১১.০০ টায়) এবং খাগড়াছড়ি থেকে বাস ছাড়ে সকালে ও রাতে (৯.০০ টায়)। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যেতে সময় লাগবে রাতে ৭-৮ ঘন্টা এবং দিনে ৮-১০ ঘন্টা।

 

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সেন্টমার্টিন খুলছে ১ নভেম্বর, জাহাজ ৬ তারিখে- প্রথম ৫দিন কীভাবে যাবেন
বেঙ্গালুরুতে প্রথম ডাইনোসর পার্ক, ঘুরে দেখুন প্রাগৈতিহাসিক জগৎ!
সমুদ্রের তলা দিয়ে ট্রেনযাত্রা, হংকংয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
সর্বশেষ খবর
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ: একসঙ্গে ১৮-২০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ: একসঙ্গে ১৮-২০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা
কলকাতায় ফের বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা, পুলিশের বাধার মুখে বঙ্গসেনা
কলকাতায় ফের বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা, পুলিশের বাধার মুখে বঙ্গসেনা
আন্দোলন করে সরকার পরিবর্তন নয়, নির্বাচনই একমাত্র পথ: চিফ হুইপ
আন্দোলন করে সরকার পরিবর্তন নয়, নির্বাচনই একমাত্র পথ: চিফ হুইপ
রাজধানীবাসীর জন্য সুখবর, ৬ রুটে একক কোম্পানির বাস চালু হচ্ছে রবিবার
রাজধানীবাসীর জন্য সুখবর, ৬ রুটে একক কোম্পানির বাস চালু হচ্ছে রবিবার
সর্বাধিক পঠিত
লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর
লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর
এইচএসসিতে সাফা, ফারিণ থেকে হিমি: কে কত পেয়েছিলেন
এইচএসসিতে সাফা, ফারিণ থেকে হিমি: কে কত পেয়েছিলেন
পাসের হারে শীর্ষে কোন বোর্ড, তালানিতে কোনটি
পাসের হারে শীর্ষে কোন বোর্ড, তালানিতে কোনটি
কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ‘শারীরিক সম্পর্ক’, সেই এএসপি বাধ্যতামূলক অবসরে
কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ‘শারীরিক সম্পর্ক’, সেই এএসপি বাধ্যতামূলক অবসরে
এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ আজ
এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ আজ