মেক্সিকোয় ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা মৃতদের স্মরণে উৎসব পালনের ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। তবে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে এই উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন তুলনায় নতুন। আর এর নেপথ্যে রয়েছে জেমস বন্ডের একটি ছবি।
মৃত পূর্বপুরুষদের স্মরণে মেক্সিকোয় পালিত হয় ‘ডে অব দ্য ডেড’। প্রাক-কলম্বীয় যুগের নানা রীতির সঙ্গে খ্রিস্টানদের ‘অল সেন্টস ডে’-র ঐতিহ্য মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই উৎসব। এত দিন মূলত পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়ার উপলক্ষ ছিল এটি। মৃত আত্মীয়দের সমাধিতে গিয়ে ফুল, খাবার এবং তাদের জীবদ্দশায় পছন্দের নানা জিনিস সাজিয়ে বেদি তৈরি করেন পরিবারের লোকজন।
কিন্তু ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস বন্ডের ছবি ‘স্পেক্টর’ এই উৎসবে যোগ করে নতুন মাত্রা। ছবির শুরুতেই দেখা যায়, ব্রিটিশ গুপ্তচর ০০৭ মেক্সিকো সিটির রাস্তায় মৃত মানুষের সাজে সজ্জিত এক বিশাল জনতার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। ছবিতে দেখা সেই দৃশ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে শহরে শুরু হয় ‘ডে অব দ্য ডেড’ শোভাযাত্রা।
শনিবার এই শোভাযাত্রার দশম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মেক্সিকো সিটির রাস্তায় নেমেছিল মানুষের ঢল। বিশালাকার কঙ্কালের মূর্তি, বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত ভাসমান মঞ্চ, পালকের মুকুট ও মুখোশ পরা শিল্পীদের উপস্থিতিতে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। সঙ্গে ছিল সঙ্গীতশিল্পী ও অ্যাক্রোব্যাটদের পরিবেশনা।
পর্তুগাল থেকে আসা ৩২ বছর বয়সি পর্যটক আনা সুয়ারেসের কাছে এই আয়োজন ছিল অসাধারণ। তার কথায়, মানুষের আনন্দ, পোশাক, ফুলসহ এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। যারা আর পৃথিবীতে নেই, তাদের স্মরণ করতে এত মানুষের একসঙ্গে মিলিত হওয়া তাকে মুগ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ বছর বয়সি পর্যটক ইসাবেল হ্যালসির কথায়, নানা দেশের, নানা স্বভাবের মানুষের ভিড়, রং আর উৎসবের আবহে এই শোভাযাত্রা দারুণ উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মেক্সিকো সিটির মেয়র ছিলেন মিগেল আঞ্জেল মানসেরা। তাঁর উদ্যোগেই ২০১৬ সালে প্রথম এই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। মানসেরা জানান, শুরু হওয়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে এই আয়োজন নিয়ে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়। সবাই জানতে চাইতেন, পরের শোভাযাত্রা কবে হবে। তাঁর কাছে গোটা উদ্যোগটাই ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
এ বছর শোভাযাত্রা দেখতে মেক্সিকো ও বিদেশ থেকে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করেছিলেন শহরের প্রশাসনিক কর্তারা। একই সপ্তাহান্তে শহরে আয়োজিত হয়েছিল ফর্মুলা ওয়ান গ্রাঁ প্রি প্রতিযোগিতাও। জেমস বন্ডের ছবিতে ব্যবহৃত বিশালাকার কয়েকটি মূর্তি ২০১৬ সালের প্রথম শোভাযাত্রাতেও দেখা গিয়েছিল। মানসেরার কথায়, এক সময়ের ছোট আয়োজন এখন বিশাল উৎসবে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে তিনি গর্বিত।
এ বছরের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ রাজধানীর প্রধান চত্বর জোকালোতে তৈরি ১১ তলা উচ্চতার ‘ক্যাটরিনা’ ভাস্কর্য। এটি অভিজাত পোশাকে সজ্জিত এক নারী কঙ্কালের প্রতিরূপ। ইবেরো-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্তো মন্তালভোর মতে, এক সময়ের ঘরোয়া ও ঘনিষ্ঠ পারিবারিক উদ্যাপন এখন গণ-উৎসবে পরিণত হয়েছে। পর্যটকদের ভিড়ে অনেক সমাধিক্ষেত্রও এখন জমজমাট। ফলে সেখানে জায়গা পাওয়া নিয়ে স্থানীয় পরিবারগুলির সঙ্গে পর্যটকদের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। তার প্রশ্ন, দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখে কি বদলে যাচ্ছে এই স্মরণ-অনুষ্ঠানের রীতি, নাকি উৎসবের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকেরা?