রহস্যে ঘেরা খোয়া সাগর দীঘি

Send
জুনাইদ আল হাবিব
প্রকাশিত : ২০:২০, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২১, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯

খোয়া সাগর দীঘিস্বচ্ছ জল, আকাশের নীলাভ দৃশ্য আর চারপাশের সবুজে ঘেরা অপরূপ প্রকৃতিতে মিশে একাকার লক্ষ্মীপুরের খোয়া সাগর দীঘি। মাছরাঙা, পানকৌড়ি, সাদা বকসহ বিভিন্ন ধরনের পাখির মিলনকেন্দ্র এটি। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি জলে ডুব দেয় এবং মাছ শিকার করে ক্ষুধা মেটায়। প্রকৃতিপ্রেমীরা পাখির কলকাকলি ও ওড়াওড়ির দৃশ্য বেশ উপভোগ করেন।

২২ একর জমিজুড়ে দীঘিটির সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। চারপাশে হাঁটার পথ। শীতকালে দীঘির এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে কুয়াশার জন্য কিছুই দেখা যায় না। কুয়াশাকে আঞ্চলিক ভাষায় খোয়া বলা হয়। দীঘিটি দেখতে সাগরের মতো। তাই এর নাম ‘খোয়া সাগর দীঘি’। লক্ষ্মীপুর শহরের অদূরে দালাল বাজারের কাছে এটি অবস্থিত। দালাল বাজারকে জেলার উপশহরও বলা হয়।

প্রতিদিন বিকালে ভ্রমণপ্রেমীদের ভিড়ে মুখর থাকে খোয়া সাগর দীঘির পাড়। খোলা আকাশের নিচে মুক্ত প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে জেলা শহর থেকে বিভিন্ন বয়সীরা আসেন এখানে। দীঘির জল ছুঁয়ে আসা কোমল হাওয়া তাদের মন ছুঁয়ে যায়। ভ্রমণপিপাসুদের ছায়া হিসেবে কাজ করে বেশকিছু কড়ই গাছ। এখানে গল্পে গল্পে দারুণ সময় কাটান তরুণ-তরুণীরা। অনেকে মোবাইল ফোনে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।

খোয়া সাগর দীঘিখোয়া সাগর দীঘিকে ঘিরে ইতোমধ্যে পর্যটন মন্ত্রণালয় বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে দীঘিকে ঘিরে পর্যটনের উন্নয়নে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। দীঘির পাড়ে গেলে এখন কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ে। পর্যটকদের চলাচলের জন্য ইট দিয়ে রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতে এখানে ল্যামপোস্টের আলোয় গল্প জমে। দীঘির একপাশে মসজিদ। দিঘির সিঁড়িতে পা রেখে স্বচ্ছ জলে হাত-মুখ ধুয়ে নেন কেউ কেউ। কেউবা গোসল সেরে নেন এখানে।

লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তথ্যকোষ সমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘লক্ষ্মীপুর ডায়েরি’ থেকে জানা যায়, ২০০ বছর আগে দীঘিটি খনন করা হয়। মূলত চারপাশের এলাকার মাটি ভরাট ও মানুষের ব্যবহার্য পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনে এই উদ্যোগ নেন তৎকালীন রাজা জমিদার ব্রজবল্লভ রায়।

খোয়া সাগর দীঘির সঙ্গে মিশে আছে এক রূপকথার গল্প। একবার এক বর তার নববধূকে নিয়ে দীঘির পাড় দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন বরের পানির পিপাসা হলে যাত্রাবিরতি টেনে দীঘিতে নেমে পানি পান করেন। নববধূও পানি পানের জন্য নেমেছিলেন। কিন্তু নববধূ অঞ্জলি ভরে পানি পান করতে গেলে তার পা দুটি ধরে কে যেন নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ওই বধূ আর ফিরে আসেননি। সেই স্থানে গভীর গর্ত হয়ে আছে। শুষ্ক মৌসুমে প্রচণ্ড খরায় দীঘিটি শুকিয়ে গেলেও ওই জায়গাটি কোনোভাবেই শুকায় না!

খোয়া সাগর দীঘিযেভাবে যাবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সড়কপথে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর স্টেশন যেতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি অথবা অটোরিকশায় দালাল বাজার নামলেই পূর্ব পাশে তাকালেই দেখা যাবে খোয়া সাগর দীঘি।

নদীপথে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে চাঁদপুর পৌঁছাতে হবে। এরপর রায়পুর। তারপর আবারও লক্ষ্মীপুর শহরমুখী সিএনজিতে উঠে দালাল বাজারে এলেই চোখে পড়বে খোয়া সাগর দীঘি। লঞ্চে খরচ হবে যাওয়া-আসা ৫৮০ টাকা। আর বাস বেছে নিলে খরচ পড়বে ৮২০ টাকা।

থাকা ও খাওয়া
জেলা শহর থেকে যেহেতু খোয়া সাগর দীঘি বেশি দূরে নয়, তাই রাতে থাকা নিয়ে ঝামেলা হবে কম। শহরে উন্নতমানের বেশকিছু গেস্টহাউস গড়ে উঠেছে। এছাড়া আছে মানসম্পন্ন দুটি আবাসিক হোটেল। বাগবাড়িতে ঐতিহ্য কনভেশন ও স্টার গেস্টহাউস এবং চকবাজারে সোনার বাংলা আবাসিক রেস্টুরেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধা হাউস অন্যতম। সেক্ষেত্রে প্রতি রাতের জন্য গুনতে হবে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। গেস্টহাউসে সাধারণত খাবারের ব্যবস্থা থাকে। জেলা শহরে কয়েকটি হোটেল তো আছেই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজমহল হোস্টেল অ্যান্ড চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, রহমানিয়া হোটেল, হোটেল নূরজাহান, হোটেল মোহাম্মাদীয়া।

সতর্কতা
দীঘিটি যেহেতু বিশাল আকৃতির, তাই এর বিস্তৃতি অনেক গভীর। সেক্ষেত্রে দীঘিতে নেমে বেশি সময় ধরে গোসল করা এবং অপ্রয়োজনে বেশি সময় কাটানো বিপদের কারণ হতে পারে।

দীঘিতে মাঝে মধ্যে সাপ চোখে পড়েছে। সেক্ষেত্রে একটু সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আর সকাল বা দুপুরে না গিয়ে বিকালের দিকেই দীঘিপাড়ে যাওয়া ভালো। এতে বিকালের কোমল প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।

তবে দীঘির পাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট করা চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট যত্রতত্র না ছুড়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। আবর্জনা রাখার জন্য ছোট আকারের কিছু ডাস্টবিনের ব্যবস্থা আছে।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ