ট্রাভেলগনিঃসঙ্গ এক দ্বীপ

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ২১:১৩, জানুয়ারি ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২১, জানুয়ারি ১৫, ২০২০

ছেঁড়া দ্বীপসেন্টমার্টিনে বেড়াতে গিয়ে পাশের বিচ্ছিন্ন দ্বীপকে দেখে আসবো না তা কি হয়? তাই এবারের গন্তব্য সেই নিঃসঙ্গ ছেঁড়া দ্বীপ। সেখানে যেতে সেন্টমার্টিন ঘাট থেকে আমরা ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিলাম। ভাড়া পড়লো যাওয়া-আসা জনপ্রতি ১৫০ টাকা। এছাড়া এখান থেকে স্পিডবোট ও বড় আকারের নৌকায় যাতায়াত করা যায়। তবে দরদাম করে নেওয়া ভালো। সবাই লাইফ জ্যাকেট পরলো। সাগরের বুক চিরে আমাদের যাত্রা শুরু হলো।

ইঞ্জিনের একঘেঁয়েমি গড়গড় শব্দের কারণে কিছুটা বিরক্তি তৈরি হলেও সাগরের বিশাল জলরাশি দেখে মন জুড়িয়ে গেলো। স্বচ্ছ নীলাভ জল। যতই ছেঁড়া দ্বীপের কাছাকাছি যাচ্ছি পানি যেন ততই স্বচ্ছ হচ্ছে। শীতের কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দেওয়া সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে সাগরের জল। আকাশের নীল দেখেছি সুন্দর, তবে এ যেন আরেক সুন্দর। ছেঁড়া দ্বীপে পৌঁছাতে লাগলো মাত্র আধাঘণ্টা।

ছেঁড়া দ্বীপবাংলাদেশের মানচিত্রের নিচের দিকে ছোট ছোট গোল গোল যেসব বিন্দু দেখা যায় সেগুলো আসলে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। মূল সেন্টমার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই এর নাম ছেঁড়া দ্বীপ বা সিরাদিয়া দ্বীপ। কালের সাক্ষী প্রবাল পাথরের পথ বেয়ে আমরা হাঁটতে লাগলাম মূল দ্বীপের দিকে। পাথরগুলো ধারালো হওয়ায় এই যাত্রা কিছুটা কষ্টসাধ্য।

ছেঁড়া দ্বীপপ্রবাল পাথরের ওপর হাঁটলে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ পা পিছলেই আলুর দম! বেশ কয়েকবার পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলে নিলাম। এখানে অনেকে সাইকেল নিয়ে এসেছেন। কারণ রোদ একটু চড়া হলেই বালি আর পাথরে হাঁটা মুশকিল।

কিছু অস্থায়ী দোকান ছাড়া জিরিয়ে নেওয়ার জায়গা চোখে পড়ে না। একটি দোকানে দেখলাম সারি সারি ডাব ও নারিকেল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। চা-বিস্কুটও আছে। আমরা কিছুটা তৃষ্ণার্ত। ডাব খেয়েই হাঁটা শুরু করলাম সৌন্দর্যের অন্বেষণে।

ছেঁড়া দ্বীপচারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। আমাদের মতো অনেকে এখানে এসেছেন। দেখে মনে হলো, এতো সুন্দর দ্বীপ আর কোথাও আছে নাকি! হাত থেকে মোবাইল ফোন ফেলে দিলেই বুঝি সভ্যতার সঙ্গে সব যোগাযোগ শেষ হয়ে যাবে!

আমরা কেয়াবনের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। সেন্টমার্টিন থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ছেঁড়া দ্বীপ। জোয়ারের সময় দ্বীপের প্রায় অর্ধেকই পানিতে ডুবে যায়। আমরা গিয়েছিলাম ভাটার সময়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে যেদিকেই তাকাই প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে যেন মাথা নুয়ে যায়।

ছেঁড়া দ্বীপে পর্যটকরাবিকাল চারটার পর ছেঁড়া দ্বীপে কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না। এরপর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে পুরো দ্বীপ। ছেঁড়া দ্বীপে থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। দিনে দিনে ফিরে আসতে হয়। তবে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে রাতে ক্যাম্প করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে যেতে হবে।

কেউ যদি সেন্টমার্টিন এসে ছেঁড়া দ্বীপে না যান তাহলে পুরো ভ্রমণই বৃথা! এখানকার প্রবাল পাথর, স্বচ্ছ জলে মাছসহ জলজ নানান প্রাণির খেলা। আকাশ নীলের সঙ্গে সাগরের মিতালি, কেয়া বন আর নির্জনে থেমে থেমে ডেকে ওঠা নাম না জানা পাখি এবং অতিথি পাখির অবাধ বিচরণ ডুবিয়ে রাখে অন্যরকম নিঃসঙ্গতায়। আসলে মানুষ শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া দ্বীপের মতোই একা।
ছেঁড়া দ্বীপছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ