আজকের হোটেল আগামী দিনের হাসপাতাল

Send
জনি হক
প্রকাশিত : ২২:১৫, এপ্রিল ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৩, এপ্রিল ০৮, ২০২০

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটানে ফোর সিজনস হোটেলস্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের প্রাণকেন্দ্রে চারতারকা হোটেল আইরে গ্রান ওদেল কোলনে ৩৬৫টি রুম আছে। ব্রেতিরো পার্ক ও শহরটির সবচেয়ে বড় হাসপাতালগুলোর একটি এর কাছেই অবস্থিত। সংস্কারের পর হোটেলটির সাজানো কক্ষে এ বছরের শুরুর দিকে অতিথিরা আনন্দেই সময় কাটিয়েছেন। নানান নকশার রঙিন কাচের জানালা ও শান্ত বাগানের পাশাপাশি তারা পাশেই পেয়েছেন একটি চিত্রশালা।

গত মাসের মাঝামাঝি থেকে আইরে গ্রান ওদেল কোলনের দুটি ভবন পরিণত হয়েছে হাসপাতালে। করোনাভাইরাসের হালকা উপসর্গ রয়েছে এমন রোগীরা চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন এখানে।

বিশ্বব্যাপী পর্যটন স্থবির হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। এমন অবস্থায় রোগীদের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া হাসপাতাল থেকে চাপ কমাতে অতিথিশূন্য হোটেলগুলো কাজে লাগাচ্ছে অনেক দেশ। কিছু হোটেল এখন কোভিড-১৯ রোগীদের আশ্রয়স্থল। তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশনে ব্যবহার হচ্ছে কয়েকটি হোটেল।

যেসব হোটেল হাসপাতালের কাছাকাছি সেগুলো স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশ্রামের জন্য আলাদা রাখা হচ্ছে যারা প্রতিদিন রোগীদের সংস্পর্শে আসেন। চীনের উহানে এই কৌশল অবলম্বন করে বিশেষায়িত সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। কিছু হোটেল চিকিৎসক ও নার্সদের আইসোলেশনের জন্য সামরিক নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল চীন সরকার।

কোভিড-১৯ রোগীদের সংস্পর্শে আসায় স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে। তাদের মাধ্যমে পরিবার বা অন্যরা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তাই বেশি। তাই তাদের জন্য পৃথক বাসস্থানের জায়গা করতে বেছে নেওয়া হচ্ছে হোটেল।

করোনাভাইরাস মহামারির সঙ্গে লড়তে আইরে গ্রান ওদেল কোলনের মতো ইউরোপ জুড়ে কয়েক ডজন হোটেল এখন স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার হচ্ছে। মাদ্রিদের প্রায় ৪০টি হোটেলের মালিকরা ভবিষ্যতের কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য ৯ হাজার বেড যুক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে বেস্ট ওয়েস্টার্ন, ট্রাভেলজ ও হিলটনের মতো ব্র্যান্ডের মালিকরা নিজেদের কিছু হোটেল অস্থায়ী করোনাভাইরাস ওয়ার্ডে রূপান্তরের বাস্তবতা নিরূপন করতে দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপের বৃহৎ আতিথেয়তা সংস্থা অ্যাকর ফ্রান্সে নার্সিং কর্মীসহ করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়ে যাওয়া সবার জন্য ৪০টি হোটেল উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও একই পথ অনুসরণ করা হচ্ছে। আমেরিকান হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে হাসপাতালের কর্মীদের জন্য ৯ লাখ ২৪ হাজার ১০৭টি বেড আছে। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন পূর্ণ।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে একহাজার মানুষের জন্য হাসপাতালের বেড আছে তিনটিরও কম। জাপানে এই হার ১৩টির বেশি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১২টির বেশি ও জার্মানিতে ৮টি।

নিউ ইয়র্কে ১০ হাজারেরও বেশি হাসপাতাল বেড তৈরির জন্য হোটেল কক্ষ ও কলেজের ছাত্রাবাসকে অস্থায়ীভাবে রূপান্তর করছে মার্কিন সেনা কর্পস অব ইঞ্জিনিয়ার্স। পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ইঞ্জিনিয়ার ও কমান্ডিং জেনারেল চিফ লে. জে. টড টি. সেমোনাইট বলেন, ‘হোটেলগুলো ফাঁকা। মানুষের চাকরি নেই। তাই অল্প সময়ের জন্য এসব কক্ষকে আইসিইউতে পরিণত করা হচ্ছে।’

একই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটনে। ইলিনয় রাজ্যের শিকাগো আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম শহর। শিকাগোর মেয়র লরি লাইটফুট জানান, করোনাভাইরাসের হালকা উপসর্গ থাকা রোগী ও করোনা পরীক্ষার জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের আইসোলেশনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে পাঁচটি হোটেলের একহাজার কক্ষ। এক্ষেত্রে শিকাগোর পরিকল্পনা একটু ব্যতিক্রম। হোটেলকর্মীরাই অভ্যর্থনা ডেস্ক, রান্নাঘর ও হাউসকিপিংয়ের কাজ করছেন। যদিও কোয়ারেন্টিনে থাকা রোগীদের সংস্পর্শে আসতে হচ্ছে না তাদের। এসব দিক সামলাচ্ছে শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা।

শিকাগোর প্রাণকেন্দ্রে অক্সফোর্ড হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসের পাঁচটি হোটেল এখন হাসপাতালে রূপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি জর্জ জর্ডান বলেন, ‘যে যুদ্ধ চলছে তাতে এগিয়ে আসাটা আমাদের কর্তব্য। শহরটিকে সহায়তা করতে পেরে আমরা তৃপ্ত। শুধু শিকাগো শহরের জন্য নয়, এতে করে আমাদের হোটেলগুলোর কর্মীরা কাজ হারায়নি। আর বিনিয়োগকারীরাও খুশি হয়েছেন।’

বিশ্বজুড়ে হোটেল ব্যবসা প্রায় বন্ধ বলা চলে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশা, মন্দা ঠেকাতে ও স্বল্পসংখ্যক কর্মীদের চাকরিতে বহাল রাখতে শিকাগোর মতো মডেল হতে পারে নতুন পন্থা।

আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের (এএইচএলএ) মোটামুটি হিসাব অনুযায়ী, রুম ভাড়া না হওয়ায় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হোটেলগুলোর লোকসানের পরিমাণ ২৪০ কোটি ডলার (২০ হাজার ৩৯৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা)। আরও হতাশার ব্যাপার হলো, প্রতিদিন ২০ কোটি ডলার (১ হাজার ৬৯৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা) আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হোটেল মালিকরা।

এদিকে এএইচএলএ চালু করেছে ‘হোটেলস ফর হোপ’ শীর্ষক জাতীয় ডাটাবেজ। এতে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আমেরিকার সব হোটেল, যাতে কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়।

এএইচএলএ সভাপতি ও সিইও চিপ রজার্স বলেন, ‘অতিথি না থাকায় আমাদের সদস্য প্রচুর হোটেল এখন ফাঁকা। তাই আমরা ভেবেছি, সরকারের নির্বাচিত কর্মকর্তা ও পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে যার যার অঞ্চলের হোটেলের একটি তালিকা উপস্থাপন করতে পারলে প্রত্যেকের জন্য সহায়ক হতে পারে।

চিপ রজার্স জানান, আমেরিকা জুড়ে সাড়ে ৭ হাজারেরও বেশি হোটেল মালিক নিজেদের এসব স্থাপনাকে হাসপাতালে রূপ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এজন্য তারা কর্মীদের নিযুক্ত রাখতে চান। তার কথায়, ‘সবাই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। আরও কিছুদিন হয়তো লোকসানের মুখ দেখতে হবে তাদের। তবে হোটেল মালিকরা মনে করছেন, করোনাভাইরাস মহামারি এখন আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বিপজ্জনক। তাই এই পরিস্থিতি মুক্তি পাওয়াই সবার আগে জরুরি।’

সব হোটেল অবশ্য একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। কিছু হোটেল চলছে ভিন্ন পন্থায়। ভারতীয় ব্র্যান্ড ওইও হোটেলস অ্যান্ড হোমসের ৩০০টিরও বেশি হোটেল আছে আমেরিকায়। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সামনে থেকে লড়ে যাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের বিনামূল্যে থাকতে দেওয়া হচ্ছে এগুলোতে।

ম্যানহাটানের প্রাণকেন্দ্রে কানাডিয়ান আতিথেয়তা সংস্থা ফোর সিজনস হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসের একটি হোটেলে কাছের হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা পাঁচতারকা মানের রুমে বিনামূল্যে থাকতে পারছেন।

ম্যানচেস্টারে সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ গ্যারি নেভিলের মালিকানাধীন হোটেল ফুটবল ও দ্য স্টক এক্সচেঞ্জে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথৈ সার্ভিসের কর্মীরা বিনামূল্যে থাকতে পারছেন। এছাড়া নিউ ইংল্যান্ডের ওশান হাউস ম্যানেজমেন্ট কালেকশন স্থানীয়দের খোঁজখবর নিচ্ছে ও শিশুদের বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দিচ্ছে।

এদিকে কোয়ারেন্টিন সেন্টারের জন্য মুম্বাইয়ের পোয়াইতে নিজের হোটেল ছেড়ে দিচ্ছেন বলিউড অভিনেতা শচীন জোশি। তিনি ৩৬ কক্ষের হোটেল দ্য বিটলের মালিক।

তথ্যসূত্র: সিএনএন

 

/জেএইচ/
টপ