শুধু প্রাণভিক্ষা বাকি বদর কমান্ডারের

উদিসা ইসলাম
০৫ মে ২০১৬, ২১:২৮আপডেট : ০৫ মে ২০১৬, ২১:৩৩

কারাগারের পথে প্রিজন ভ্যানে মতিউর রহমান নিজামী একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল, এখন সেই বদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামীর শুধু প্রাণভিক্ষা চাওয়া বাকি। ফাঁসি কার্যকরের আগে নিজামী চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারবেন মাত্র। যদিও এতদিন নিজামী বলে এসেছেন, একাত্তরে সংঘটিত কোনও অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণে মামলা করা হয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী নিজামীকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে হলে আগে তার অপরাধও স্বীকার করে নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ নিজামীর আপিলের রিভিউ খারিজ করার মধ্য দিয়ে ফাঁসি কার্যকরে আর কোনও আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
এখন নিজামী কী করবেন—এ নিয়ে তার আইনজীবীরা বলছেন, এটি একেবারেই তার নিজের বিষয়। আমাদের কিছু বলার নেই। এর আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পর নাটের ‘গুরু’ এবং শীর্ষ নেতা নিজামী ফাঁসির আগে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা, সে নিয়েও দলে আছে নানা আলোচনা। কেবল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন বলে কারাকর্তৃপক্ষ জানিয়েছি। আর জামায়াতগুরু নামে খ্যাত শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধী গোলাম আযম আপিল মামলা থাকাকালীন কারাগারে মারা যান।

আরও পড়তে পারেন: এই নিজামীই সেই নিজামী

নিজামী মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রামে 'বদর দিবস, পাকিস্তান ও আলবদর' শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয়তে লেখেন, 'দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তানের কিছু মুনাফিক (মুক্তিযোদ্ধা) তাদের (ভারতের) পক্ষ অবলম্বন করে ভেতর থেকে আমাদের দুর্বল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাদের মোকাবিলা করে তাদের সব ষড়যন্ত্র বানচাল করেই পাকিস্তানের আদর্শ ও অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে; শুধু পাকিস্তান রক্ষার আত্মরক্ষামূলক প্রচেষ্টা চালিয়েই এ পাকিস্তানকে রক্ষা করা যাবে না।' তিনি এ লেখার মাধ্যমে বদর বাহিনীকে আক্রমণাত্মক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোপন প্রতিবেদনে (ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তান, মাসে দু'বার এ প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠানো হতো) উল্লেখ করা হয়, একাত্তরের ১৪ জুন জামালপুর ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় নিজামী বলেছিলেন, ইসলাম রক্ষায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এ জন্য তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন।

আরও পড়তে পারেন: চূড়ান্ত বিচারে নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল

নিজামী জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের দীর্ঘদিন সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড ছিলেন পরবর্তীতে তিনি আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। অথচ ট্রাইব্যুনালে দাড়িয়ে নিজেকে বাঁচাতে করেছেন মিথ্যাচার। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তিনি নিজেকে দোষী মনে করেন কিনা অভিযোগ গঠনের পূর্বে ট্রাইব্যুনালের এমন প্রশ্নের জবাবে নিজামী বলেন, মহামান্য আদালত, আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই মুক্তিযুদ্ধে সময়ে আমার অনুসারীরা রাজনীতি অন্য কোনও কিছুতে জড়িত ছিল না। এ রকম রক্তাক্ত গণহত্যার মত কোনও পরিস্থিতি তৈরিতে আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

নিজামী দালিলিক প্রমাণ অস্বীকার করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত আমার সব বিবৃতি আমার নিজের নয়। মুক্তিযুদ্ধে আমার রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল। মানবতার বিরুদ্ধে কোনও অনৈতিক বিষয়ে ও কর্মকাণ্ডে আমি নিজে কখনও জড়িত ছিলাম না। উল্লিখিত কোনও ঘটনাই আমার সামনে, আমার জানামতে বা আমার সম্মতিতে ঘটেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টো ওই গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছেন।  তিনি সরকার ও ট্রাইব্যুনালকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, কোনও সরকারই শেষ সরকার নয়। একইভাবে, পৃথিবীতে কোনও বিচারই শেষ বিচার নয়। আপনাদের (বিচারক) আল্লাহর বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সঠিক বিচারের বিষয়ে একটিসহ দুটি হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা সবচেয়ে ভালো বিচারক হবেন, সেই প্রার্থনা করি। এরপর তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৪ সালে এ মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়ে রায়ে বলা হয়, আদালত সম্মত হয়েছেন যে, তিনি (নিজামী) যে মাত্রায় হত্যা, গণহত্যা ঘটিয়েছেন, তাতে সর্বোচ্চ সাজা না দিলে, তা হবে ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা। জামায়াতের আজকের আমির নিজামী চার দশক আগে ছিলেন জামায়াতেরই ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নাজিমে আলা বা সভাপতি এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত আলবদর বাহিনীর প্রধান।

২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করার পর একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১৩ সালের ২৮ মে জামায়াত আমিরের বিচার শুরু হয়।

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি