নব্য জেএমবির ‘হাল’ ধরেছে মুসা, পরিকল্পনা ছিল বড় হামলার

নুরুজ্জামান লাবু
২৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩:০০আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৬:১১

আশকোনার জঙ্গি আস্তানা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবির হাল ধরেছিল তানভীর কাদেরী। আজিমপুরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে মারা যায় সেও। এরপর আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে মারা যায় আরেক শীর্ষ জঙ্গি সারোয়ার জাহান। ভারতে পালিয়ে গেছে শীর্ষ জঙ্গি মামুনুর রশিদ রিপন। নূরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকলেট ও রাজীব গান্ধী লাপাত্তা গুলশান হামলার পর থেকেই। এ কারণে নব্য জেএমবির হাল ধরেছিল মাঈনুল ওরফে মুসা। তার পরিকল্পনা ছিল ‘বড় হামলা’র। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিচ্ছিল সে। মজুদ করেছিল বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য। সেগুলো দিয়ে হ্যান্ড মেইড গ্রেনেডও তৈরি করেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। নিজে আত্মগোপনে থাকলেও রাজধানীর আশকোনায় তার আস্তানায় ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট (সিটিটিসি)অভিযান চালিয়ে সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিয়েছে।

সিটিটিসির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাওয়ার কারণে নব্য জেএমবির হাল ধরার চেষ্টা করছিল মাঈনুল ওরফে মুসা। এ জন্য মুসাকে গ্রেফতার করতে আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছিলাম।’

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান,  মুসার বিষয়টি তারা প্রথম জানতে পারেন গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে অভিযানের পর। আজিপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে তানভীর কাদেরীর কিশোর ছেলে আদালতে দেওয়া তার জবানবন্দিতে মাঈনুল ওরফে মুসার কথা বলে। জঙ্গি তানভীরের কিশোর ছেলে তার জবানবন্দিতে বলে,  ‘মেজর জাহিদ ও মাঈনুল ওরফে মুসার সঙ্গে আমার বাবার দীর্ঘদিন আগে থেকে পরিচয় ছিল। আমার বাবা, মেজর জাহিদ ও মুসাসহ উত্তরার ১৩ নম্বও সেক্টরের একটি মসজিদে নামাজ পড়তো। তারা প্রায়ই উত্তরার লাইফ স্কুলের মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে একসঙ্গে জগিং করতো।’ ওই কিশোর আরও বলে,  ‘বাবার মাধ্যমেই মেজর জাহিদ ও মুসার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। আমাকে ও আমার ভাইকে মুসা অংক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের বিষয় পড়াতো।’ কিশোরটি জবানবন্দিতে আরও বলে,  ‘প্রায়ই আমার বাসায় জাহিদ আংকেল, আন্টি (জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার), মেয়ে জুনায়রা ওরফে পিংকি এবং মুসা আংকেল আন্টিসহ যাতায়াত করতো। জাহিদ আংকেলের বাসা ছিল উত্তরা ১৩ নং সেক্টরে। তাদের বাসায় আমরাও যেতাম। মুসা আংকেল, আন্টিসহ ওই বাসায় যেত।’

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, উত্তরার লাইফ স্কুলে এক সময়ে শিক্ষকতা করতো মাঈনুল ওরফে মুসা। সেখান থেকেই নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও তানভীর কাদেরীর সঙ্গে তার পরিচয়। এক পর্যায়ে নব্য জেএমবির দলে ভিড়ে যায় মুসা। ধীরে ধীরে সে নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠে। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল এই মুসা। তামিম চৌধুরীসহ নব্য জেএমবির তানভীর কাদেরী, জাহিদ, রাশেদ, জাহাঙ্গীর, মারজান, বাসারুজ্জামানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। আজিমপুরে আস্তানা থেকে উদ্ধারের পর জাহিদের মেয়ে পিংকী ওই সময় সিটির কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল, তার মা মুসা আংকেলের বাসায় গিয়েছে। তাহরীম ও পিংকীর দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই মুসাকে খুঁজতে শুরু করে পুলিশ সদস্যরা।

সূত্র জানায়, আশকোনার আস্তানায় মুসার স্ত্রী-সন্তান থাকলেও সে নিয়মিত এখানে থাকতো না। অন্য জঙ্গিদের স্ত্রীদের নিজের বাসায় রেখে সে অন্য একটি আস্তানায় থাকতো। প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার সে আশকোনার বাসায় আসতো। সেই হিসেবে গত শুক্রবার তার আশকোনার আস্তানায় আসার কথা থাকলেও সে আসেনি। মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে বছর চল্লিশ বয়সী দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিও আসতো। পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, মুসা অন্য কোনও আস্তানাতেও একইভাবে বিস্ফোরকদ্রব্য দিয়ে হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরি করছিল।

সিটি সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে উত্তরার লাইফ স্কুল থেকে মুসার জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণখানের এক মসজিদের ইমামের সঙ্গে তার সখ্যের তথ্য পাওয়া যায়। গোয়েন্দারা ধারণা করেন, মুসা দক্ষিণখান এলাকার কোথাও আত্মগোপন করে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসার আশকোনার আস্তানার সন্ধান পায়। সূত্র আরও জানায়, নব্য জেএমবির অনেক নেতাকর্মী নিহত ও গ্রেফতার হলেও মুসা নিজে দায়িত্ব নিয়ে সংগঠন গোছানোর কাজ করছিল। এ কারণে সে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করে। নিজের বাসাতেই হ্যান্ডগ্রেনেড ও সুইসাইডাল ভেস্ট তৈরি করে। আশকোনায় অভিযান চালানো বোম্‌ব ডিসপোজেবল ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, এই আস্তানা থেকে পাওয়া প্রতিটি সুইসাইডাল ভেস্টে ৫টি করে হ্যান্ড মেইড গ্রেনেড রাখা হয়েছিল। সব গ্রেনেডের একটি ‘কি পয়েন্ট’ তৈরি করা হয়। যেন একটি পিন খুললেই পাঁচটি গ্রেনেড একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়।

সিটির উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘একটি সুইসাইডাল ভেস্ট বিস্ফোরিত করেছে জঙ্গি সুমনের স্ত্রী। আরেকটি সুইসাইডাল ভেস্ট ছিল জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহারের কাছে। আত্মসমর্পণের আগে সে ওই সুইসাইডাল ভেস্টটি খুলে রাখে। এছাড়া আরও দু’টি সুইসাইডাল ভেস্ট সেখানে দেখা যায়। এগুলো দিয়ে বড় হামলার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে জানান এই কর্মকর্তা।

 আরও পড়ুন: সুইসাইডাল ভেস্ট: আত্মঘাতী হামলার ভয়ঙ্কর উপকরণ

/এমএনএইচ/

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম