সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশের পর থেকে কিছু বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কি তাহলে বহাল হয়ে গেলো? অবশ্য এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন রিটকারী আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
রায়ের পরই বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছ থেকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ফিরে গেছে বলে দাবি করেছেন রিটকারী আইনজীবী। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল এর বিরোধীতা করে বলছেন, ‘সংবিধানের যে কোনও সংশোধনকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সংবিধানের ধারা পুনঃস্থাপন করা সংসদের কাজ।’
আর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে বিচার বিভাগ তা বাতিল করতে পারবে। কিন্তু এ কারণে আগের কোনও সিদ্ধান্ত ‘অটোমেটিক্যালি’ আইন পরিষদের সম্মতি ছাড়া বহাল হওয়ার সুযোগ নেই।
গত বছরের ৫ মে হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। ওই রায়ের ফলে সংসদের বিচারক অপসারণ ক্ষমতা বাতিল হয়ে যায়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার।
আপিলে সরকার ও রিটকারী পক্ষ ছাড়াও অ্যামিকাসকিউরিদের মতামত নেয় আপিল বিভাগ। দীর্ঘ আপিল শুনানিতে ১০ জন অ্যামিকাসকিউরির মধ্যে ৯ জনই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জনগণের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দেন। গত ৩ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার (১ আগস্ট) বের হয় সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রায়ের পর থেকেই মন্তব্য করছেন, ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ হলেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল হয়ে যাবে এমন সুযোগ নেই। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যদি সংসদ সেটি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ না নেয় সেক্ষেত্রে এর পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে কেউ ভাবছে না। ওনারা নিজেদের মতো করে রেস্টর (পুনঃস্থাপন) করেছেন। কিন্তু আমার বক্তব্য হলো, সংবিধানের যে কোনও ধারা সংশোধন করা বা বাদ দেওয়া সবই সংসদের ব্যাপার। কোর্ট যদি নিজেই রেস্টর করে দেন তাহলে সংসদের থাকার কোনও মানে নেই।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘আমার কথা হলো, আদালত যে কোনও সংবিধানের যে কোনও সংশোধনকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন। কিন্ত সংবিধানের কোনও ধারা পুনঃস্থাপন বা রেস্টর করা সংসদের কাজ, আমার বিবেচনায় এটাই বলে।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও আইন যদি সাংঘর্ষিক হয় বিচার বিভাগ তা বাতিল করতে পারে, এ কথা সংবিধানে বলা আছে। তবে যে আইন বাতিল তা কার্যকর করতে হলে আইন পরিষদকেই সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা বিচার বিভাগের নেই। তারা বলতে পারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হবে। কিন্তু কি হবে এবং কিভাবে হবে তা নির্ধারণ করবে আইন পরিষদ অর্থাৎ সংসদ। অটোমেটিক্যালি কোনও আইন পুনর্বহাল হতে পারে না।’
ঢাবি’র এই অধ্যাপক মনে করেন, বিচার বিভাগ নির্দেশনা দিয়ে ইচ্ছে পোষণ করতে পারে। কিন্তু কি আইন কিভাবে হবে তা করবে আইন পরিষদ। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে বিচারক অপসারণ নীতি কি হবে তা নিয়ে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এ শূন্যতা থাকুক তা কারও কাম্য না। আইন পরিষদ, বিচার বিভাগ দুটোই গো ধরে থাকলে সমাধান হবে না। সংসদ আবারও একটি আইন করলে আবারও তা চ্যালেঞ্জ হবে। এটি নেভার এন্ডিং চেইন হতে পারে। জাতি এটা দেখতে চায় না।’
এদিকে রিটকারী আইনজীবী এসব যুক্তিতে না গিয়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা আবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ফিরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে কাউন্সিল কার্যকর হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না সংসদ আইন প্রণয়ণ করবে আর সংবিধানের রক্ষক হলো সুপ্রিম কোর্ট৷ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা যে কোনও আইনই সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিতে পারে।’
/ইউআই/জেএইচ/








