রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ঠিকাদার আনিসুর রহমান আনিস (৪৫) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির জনির বন্ধু ছিলেন। কমিশনারের সহযোগিতায় আনিস ওই এলাকায় ইট, বালুসহ বিভিন্ন ব্যবসা করতেন। এতে আরেকটি গ্রুপ ব্যবসায়িক সুবিধা না করতে পারায় ক্ষিপ্ত হয়ে আনিসকে হত্যা করতে পারে বলে প্রতিবেশী ও পুলিশের ধারণা।
সোমবার রাত ৯ টার দিকে মিরপুর মডেল থানার পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ইকবাল রোডের মুখে ৪০২ ও ৮০৮/১ বাড়ির মাঝখানে আনিসকে মুখোশধারী দুই যুবক গুলি করে পালিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
মঙ্গলবার দুপুরে ইকবাল রোডে গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম শেওড়াপাড়া হয়ে পীরেরবাগের দিকে যেতে ৪০২ ও ৮০৮/১ ভবনের মাঝখানের রোডটিই ইকবাল রোডের মুখ। ৮০৮/১ নম্বর ভবনটি নির্মাণাধীন। রোডের মুখেই একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি। খুঁটির গোড়ায় ছোপছোপ রক্ত, ইট দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। সেখানে দাড়িয়েই সোমবার রাতে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন আনিস। তখন তাকে দুই মুখোশধারী যুবক কয়েক রাউন্ড গুলি করে পালিয়ে যায়। সামনের ৪০২ নম্বর বাড়িটির নিচতলায় একটি চায়ের দোকান ও ফয়সাল মেডিসিন নামে আরও একটি ওষুধের দোকান রয়েছে। চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলেন আনিসের বন্ধু রবিউল ইসলাম। ঘটনার সময় দোকান দু’টিতে আরও মানুষ ছিল। তবে সবাই গুলির শব্দে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
রবিউল ইসলাম রবি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই জন মুখোশধারী পায়ে হেঁটে এসে আনিসকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তার মাথায়, কানে, পিঠে ও হাতে গুলি লাগে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইকবাল রোডের দশতলা একটি ভবনের কাজের ঠিকাদার কমিশনার জনি। সেখানে বালু সরবরাহ করতেন আনিস।’ তবে কারা কেন, গুলি করেছে, এ বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারেননি।
ঘটনাস্থলের পাশেই একটি টং দোকানের বয় শাকিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দোকানে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ দেখি মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। আমি দ্রুত দোকান বন্ধ করে ফেলি। সবাই দৌড়ায়। পরে দেখি একজন লোক পড়ে আছেন। কেউ ধরছে না। একটু পর কয়েকজন মানুষ তাকে ধরে সিএনজিতে করে নিয়ে যান।’
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কমিশনার হুমায়ুন কবির জনির সঙ্গে কথা বললে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্কুল জীবন থেকেই আনিসের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্ব। একসময় আনিস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। এরপর মাঝখানে সে মালয়শিয়ায় চলে যায়। মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসার পর আমার সঙ্গে তার আবার যোগাযোগ হয়। এরমধ্যে আমি কমিশনার নির্বাচিত হই। তখন থেকে তিনি আমার সঙ্গেই আছেন। আমার একটা সাইডে বালু সরবরাহ করতেন। আমি যে এলাকায় থাকি, সেই এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছেন তিনি। আমার সঙ্গেই থাকতেন সবসময়।’
খুনের বিষয়ে হুমায়ুন কবির জনি বলেন, ‘তিন কারণে খুন হতে পারেন আনিস। প্রথমত, ডিস ব্যবসা নিয়ে আকতার ও হালিমের সঙ্গে ঝামেলা ছিল তার। তারাও কিছু করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আনিস এক সময় নিজেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার সময়ের সন্ত্রাসী রনি, জুয়েল, সালাম সবাই বিভিন্ন সময় মারা গেছে। শুধু আনিস একাই বেঁচেছিলেন। তাদের পুরনো কিছু প্রতিপক্ষ আছে। তারাও এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। তৃতীয় কারণ হচ্ছে, আমার শক্তি দুর্বল করার জন্য কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। তবে আমি কখনও চিন্তা করিনি আনিসকে মেরে ফেলার মতো কোনও শত্রু আছে। আনিস নিজেও হয়তো ভাবেননি। কারণ তিনি ভালো হয়ে গেছেন। ব্যবসা বাণিজ্য করছিলেন।’
হুমায়ুন কবির জনি বলেন, ‘মিরপুরে নাটা বেলাল নামে একজন সন্ত্রাসী আছে। সে বিভিন্ন জায়গায় খুন-খারাবি করে। কিছুদিন আগে সেনপাড়া এলাকায় একটা অভিযানে গিয়েছিল বেলাল। তখন ওই এলাকার ছেলেপেলে তাকে ধাওয়া দিলে সে গাড়ি রেখে পালিয়ে যায়। ডিস আকরাম তাকে শেল্টার দেয়। যারা তাকে গুলি করছে, তাদের দৈহিক যে গঠনের বর্ণনা পেয়েছি, তাতে নাটা বেলালের সঙ্গে মিলে যায়। আমি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
আনিসের বাবার নাম তোবারক হোসেন খান। পূর্বকাজীপাড়ার ৪৯২/১ নিজেদের বাড়িতে তিনি থাকেন। তার প্রথম স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ঘরের সন্তান আনিস। তার দুই সংসারে পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে। আনিস ছিলেন মেঝো। তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনের একটি মসজিদের সামনেই রাখা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে আনিসের লাশ রাখা হয়েছে। তার বাবা ও ভাইয়েরা কান্নাকাটি করছেন। স্ত্রী শীলা মেয়েকে নিয়ে বিলাপ করছিলেন।
তোবারক হোসেন বলেন, ‘আমাদের কোনও শত্রু নেই। কেন, কারা হত্যা করলো বুঝতেছি না। ছেলেটা নিজের বাড়ি না থেকে শেওড়াপাড়ায় ভাড়া থাকতো। কমিশনারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। তাই সবসময় ওই এলাকাতেই থাকতো।’
আনিসের ছোট ভাই আসিফ বলেন, ‘সান এন্টারপ্রাইজ নামে আনিসের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মূলত বিভিন্ন কনস্ট্রাকশনের কাজ করতেন তিনি। ভাইয়া কখনও কোনও হুমকির কথা বলেননি। কারা, কেন তাকে হত্যা করেছে, বুঝতেছি না। ঘটনার পর পুলিশ এসেছিল, দাফনের পর আমরা মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
মঙ্গলবার আসরের নামাজের পর কাজীপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রেষারেষি থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। আমরা জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’








