বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী নাদিয়া আক্তারকে কথিত বিজয়ী ঘোষণা করে এক কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে নাইজেরিয়ান প্রতারকদের একটি চক্র। অবশেষে ওই প্রতারক চক্রটিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট।
অর্গানাইজড ক্রাইমের কর্মকর্তারা জানান, নাদিরা আক্তার পেশায় একজন চিএশিল্পী। ইংল্যান্ডের এক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় তিনি তার কিছু ছবি পাঠিয়েছিলেন। এই তথ্যটি নাইজেরিয় প্রতারকরা সংগ্রহ করে। এরপর তাকে একজন ফোন দিয়ে নিজেকে ইংল্যান্ডের ওই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার একজন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি ইংল্যান্ড থেকে বলছি। তুমি ইংল্যান্ডে প্রতিযোগিতার জন্য যে ছবি পাঠিয়েছ, সেটা পুরষ্কার পেয়েছে। তোমার পুরস্কার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
পরে শামীমা রহমান নামক একজন নাদিয়া আক্তারকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমি চট্রগ্রাম বন্দর থেকে বলছি। আপনার নামে একটি পার্সেল এসেছে। এতে তিন লাখ পাউন্ড আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ পর্সেলটি স্ক্যান করে পাউন্ড দেখে আটকে দিয়েছে। পার্সেলটি ছাড়িয়ে নিতে অনেক টাকা লাগবে।’
এরপর থমাস কিং নামক আরেকজন নাদিরা আক্তারকে ফোন করে জানায়, সে তার নামে যে পার্সেল পাঠিয়েছে তা চট্রগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আটকে দিয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। পার্সেলটিতে তিন লাখ পাউন্ডসহ আরও মূল্যবান উপহার আছে বলে তাকে পার্সেলটি যেকোনও মূল্যে ছাড়িয়ে আনতে বলে।
দফায় দফায় থমাস কিং এবং শামীমা রহমান নাদিয়াকে ফোন দিয়ে পার্সেলটি ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য টাকা দিতে বলতে থাকে। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় তিন কোটি টাকা ও বিভিন্ন দামি উপহারের জন্য তাকে টাকা খরচ করতে রাজি করিয়ে ফেলে তারা। ওই প্রতারক চক্রের কথায় বিশ্বাস করে পার্সেলটি ডেলিভারি নেওয়ার জন্য তাদের দেওয়া ব্যাংক হিসাব নম্বরে দুই লাখ ৯০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন নাদিয়া। এরপর প্রতারক চক্রটি আরও টাকা লাগবে বলে জানায়।
সিআইডি কর্মকর্তারা বলেন, চিত্রশিল্পী নাদিয়া তাদের কথামতো আরেকটি ব্যাংক হিসাব নম্বরে দুই লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। তারপরও পার্সেলটি তিনি হাতে না পেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখনও নাদিয়া বুঝতে পারেননি যে তিনি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। প্রতারক চক্রটি তাকে জানায়, তিন কোটি টাকার পার্সেল এত অল্প টাকায় ছাড়িয়ে নেওয়া যাবে না, আরও টাকা লাগবে। পার্সেলটি ছাড়িয়ে নিলে অবৈধ উপায়ে পার্সেলটি আনার বিষয়ে মামলাতে ফেঁসে যেতে পারেন বলে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তারা দ্রুত টাকা দিতে বলে। নাদিরা আক্তার মামলার ভয়ে এবং তিন কোটি টাকার পুরষ্কারের প্রলোভনে বিভিন্ন সময়ে প্রতারক চক্রের দেওয়া একাধিক অ্যাকাউন্টে মোট এক কোটি এক লাখ ৯৮ হাজার টাকা জমা দেন।
এরপরও পার্সেলের কোনও খোঁজ না পেয়ে থমাস কিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এসময় থমাস পার্সেল দিতে পারবে না বলে জানায়। সে বলে, অনেক ঝামেলা হয়ে গেছে। পার্সেলটি আর দেওয়া যাবে না এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করে দেয়। এ বিষয়ে আর যোগাযোগ করলে পরিণাম খারাপ হবে বলে হুমকি দেয়। এরপর আর থমাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি নাদিয়া। পরে তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন তিনি।
সিআইডি সদর দফতরের অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২০ অক্টোবর বনানী থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় নাইজেরীয় ওই প্রতারক চক্রটিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ২ ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা ও খিলক্ষেত লেক সিটি এলাকা থেকে ওই প্রতারণার ঘটনায় জড়িত দুই বাংলাদেশিসহ পাঁচ নাইজেরিয়ানকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার পাঁচ নাইজেরীয় ব্যক্তি হলো— ওগোখোয়া ওনোচি (৩২), মরিস (৩৪), ওবিনা (৩৫), হ্যানরি ওরফে শর্ট হ্যানরি (২৪), অ্যান্থনি কেজিতো অ্যারেঞ্জি (২৬)। গ্রেফতার দুই বাংলাদেশি মো. কাউসার আহমেদ ও রাইসুল ইসলাম আসাদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই প্রতারক চক্রটি নাদিয়ার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে।
সিআইডি জানায়, প্রতারক চক্রটি প্রথমে অবস্থাসম্পন্ন একজনকে টার্গেট করে। এর পর টার্গেটের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর নাইজেরিয়ানরা নিজেদের ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান বলে পারিচয় দেয়। ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান নাগরিকদের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ভিকটিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করে বিশ্বস্ততা অর্জন করে বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। আর বাংলাদেশি সহযোগীদের কাজ ব্যাংক হিসাব নম্বর সংগ্রহ করে ওই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা। এসব অ্যাকাউন্টে লেনদেনের মাধ্যমে তারা ৫% হিসাবে কমিশন পেয়ে থাকে। এভাবে সুকৌশলে প্রতারক চক্রটি বহুদিন ধরে প্রতারণা করে চলছিল।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম জানায়, চক্রটির মূল উৎপাটনে তদন্ত অব্যাহত আছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
আরও পড়ুন-
শাহজালালে স্বর্ণসহ দুই বিমানকর্মী আটক
শাহজালালে বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার, যাত্রী আটক








