ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মাসজুড়ে পালিত ট্রাফিক কর্মসূচিতে বিভিন্ন যানবাহনের বিপরীতে প্রায় পৌনে দুই লাখ মামলা হয়েছে। এর থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু এখনও সড়কে বিশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি পুলিশ। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং, যাত্রী ওঠা-নামা করানো, উল্টোপথে গাড়ি চালানো ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গের চিত্র দেখা গেছে।
এই প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার কোনও ঘাটতি নেই। তারপরও আইন না মানার প্রবণতার ফলে সব চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আইন মানতে হবে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশকে রোভার স্কাউট, বিএনসিসি ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা সহযোগিতা করছে। সড়কের বিশৃঙ্খলা দূর করতে আন্দোলন করেছিল আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাদের দেখানো পথ অনুসরণে আমরা প্রথমে ১০ দিনব্যাপী ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে ট্রাফিক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এসময় অনেক মামলা করা হয়েছে। অনেক টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। অনেক গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানোসহ রেকারিং করা হয়েছে। কিন্তু মামলা ও জরিমানা করাই শেষ কথা নয়। আমরা ট্রাফিক আইন মানার জন্য সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি।’
ডিএমপি সূত্র জানায়, সেপ্টেপম্বর মাসজুড়ে পালিত হওয়া ট্রাফিক কর্মসূচির ২৯ দিনে মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ১১২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১৩ কোটি ৭১ লাখ ২৭ হাজার ৪১৫ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগে ১৩০টি বাস স্টপেজে ‘বাস স্টপেজ শুরু’ ও ‘বাস স্টপেজ শেষ’ লেখা সংবলিত সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে। তবে যেখানে-সেখানে পার্কিং, উল্টোপথে গাড়ি চলা বন্ধ ও সড়কে যাত্রীবাহী বাস চলাচলে শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। পথচারীদের যেখানেসেখানে রাস্তা পারাপার বন্ধ করে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে বাধ্যও করা যায়নি। এছাড়া সড়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করাও সম্ভব হয়নি।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘শত বছরের অভ্যাস বা অনিয়ম একমাসে পরিবর্তন হবে, এটা আশা করা যায় না। তবে আমরা আশাবাদী সবাই সচেতন হয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।’ ট্রাফিক মাসের সফলতা তুলে ধরে কমিশনার বলেন, ‘এই মাসব্যাপী কর্মসূচিতে আমাদের অনেক সাফল্য এসেছে। ট্রাফিক আইন নিয়ে আমাদের কঠোর অবস্থানের ফলে বর্তমানে হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল-চালক ও আরোহী কমে গেছে। আগের চেয়ে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।’
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, সড়কে শতভাগ শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ সড়কে চলাচলরত বাসের মালিকানায় অনেক রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন। এছাড়া পথচারীদের জন্য ফুটপাত চলাচলের উপযোগী করতে হবে। আবার ফুটপাতের সব হকারকে উচ্ছেদ করা একদিকে যেমন অমানবিক, আরেকদিকে এখানেও নেপথ্য রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকায় যেখানে-সেখানে পার্কিং করে রাখা হয়। অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা সব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় এত বেশি সিগন্যাল বা ক্রসিং যে, স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থায় গেলে এক রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট আর অন্য রাস্তা খালি পড়ে থাকে। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আবার সিটি করপোরেশনের হাতে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, সবকিছু একবারেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সবার ভেতরেই পরিবর্তনের যে মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শতভাগ শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আইন না মানার সংস্কৃতি আমাদের বড় সমস্যা। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনুরোধ করবো, আপনারা আইন মানুন, অন্যকে আইন মানতে উৎসাহিত করুন। সবাইকে ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে, ট্রাফিক আইন মানতে হবে। সবার মাঝে আইন মানার মানসিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকলে ট্রাফিক শৃঙ্খলা কারও পক্ষে ফেরানো সম্ভব নয়।’








