X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

যেভাবে ভারতে পাচারের শিকার হলেন তরুণী

আপডেট : ২২ জুন ২০২১, ২২:০৮

অভাব অনটনের সংসারে চাকরির খোঁজ করছিলেন রাফিসা (ছদ্মনাম)। এরপর পড়েন পাচারকারীর ফাঁদে। পাচার হওয়ার পর তাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে পাচার করা হয়েছে সেই তরুণীর ছোটবোন রাইসা (ছদ্মনাম) এবং তাদের খালাকেও। রাইসা পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও জানা যায়নি রাফিসা ও তার খালার ভাগ্যে কী ঘটছে। ভারত থেকে পালিয়ে আসার পর রাইসা একটি মামলা দায়ের করেছেন রাজধানীর হাতিরঝিল থানায়। সেখানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন কীভাবে তারা পাচারের শিকার হলেন।

মামলার এজাহারে রাইসা বলেন, তার বাবা পেশায় একজন টাইলস মিস্ত্রি। মা-বাবার সাথে তারা চার বোন মাতুয়াইলে থাকতেন। ২০১৪ সালে তার বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পরের বছর তাদের মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পরে চার বোন মা এবং সৎবাবার সঙ্গেই থাকতেন। চার বোনের মধ্যে রাইসা দ্বিতীয়। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম তাদের সৎ বাবাই। সংসারের টানাপোড়েনে নবম শ্রেণি অধ্যয়নকালেই পড়ালেখা স্থগিত করে বড় বোন রাফিসা। খুঁজতে থাকেন চাকরিও। এসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় ভারত প্রবাসী নারী নদীর সঙ্গে। দুজনের মধ্যে কথোপকথনের এক পর্যায়ে তার সঙ্গে চাকরির ব্যাপারেও কথা হয়।

স্বল্প টাকায় ভারতে বিউটি পার্লারে চাকরি নিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন নদী। তার কথা মতো যশোরের বেনাপোল থানাধীন ইসরাফিল হোসেন খোকন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন রাফিসা। গতবছর ২০ নভেম্বর রাতে ইসরাফিলের কথামতো বাসে করে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পরে সেখান থেকে ভারতে পাচারের শিকার হন তিনি।

নারী পাচারে অভিযুক্ত নদী। ছবি: সংগৃহীত

এখানেই শেষ নয়, এরপর ফোনে ছোটবোন রাইসাকে ফাঁদে ফেলেন নদী। রাইসা তার এজাহারে বলেন, ভারতে পৌঁছে কয়েকদিনের মধ্যে বোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তাদের। পরে জানানো হয়, তার বোন অসুস্থ। এর দুই-তিন দিন পর নদী তাদের বাসায় এসে উপস্থিত হন। তিনি জানান, রাফিসা অনেক অসুস্থ। ব্যাঙ্গালুরুতে একটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। ভালো চিকিৎসা হচ্ছে কিন্তু দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। বিদেশে রক্তের সম্পর্কে কেউ থাকলে হয়তো খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। তখন আমার মা যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলে নদী তাকে যেতে বারণ করে। নদী বড় বোনের দেখাশোনা করার জন্য ছোটবোন নিয়ে যেতে চান। নদীয় বলেন, সেখানে গিয়ে বড় বোনের দেখাশোনা করার পরে বড় বোন সুস্থ হলে দুজনে মিলে সেখানে পার্লারে কাজ করে ভালো টাকা ইনকাম করতে পারবেন।

রাইসা বলেন, আমার মা প্রথমে রাজি না হলেও পরে বড় বোনের কথা চিন্তা করে আমাকে ভারতে পাঠাতে রাজি হয়। তবে আমাকে একা না পাঠিয়ে আমার সাথে আমার ছোট খালাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য নদীকে মা অনুরোধ করে। তখন নদী আমাকে এবং আমার ছোট খালা জেরিনকে ভারতে পাঠানোর জন্য ব্যবস্থা করবে বলে আমার মাকে আশ্বাস দেন।

তিনি গত ১৬ ডিসেম্বর তাদের দুজনকে বেনাপোল পাঠান নদী। সেখানে সকাল ছয়টার দিকে ইসরাফিল হোসেন খোকন তাকে এবং তার খালাকে আল-আমিন নামে একজনের বাসায় নিয়ে যান। রাতে সেই বাসায় ইসরাফিল হোসেন খোকন ফের আসেন। এসময় তার সাথে বিনাশ শিকদার, আব্দুল হাই, আমিরুল ও সাইফুল নামে আরও চারজন আসেন। এরপর তাদের নিয়ে রাত ১১টার দিকে আলামিন, আব্দুল হাই, আমিরুল ও সাইফুল হেঁটে রওনা হন। ঘণ্টাখানেক হাটার পর আমরা ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছালে বিজিপি তাকে এবং আমার ছোট খালাকে আটক করে। তখন আলামিনসহ বাকিরা ওখান থেকে পালিয়ে গিয়ে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারের সাথে যোগাযোগ করেন। পরদিন সকালে মেম্বার তাদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিজিপির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে।

এজহারে রাইসা আরও বলেন, তারপর সেখান থেকে আবার আল-আমিনের বাসায় আমাদের নিয়ে আসা হয়। পরে আল-আমিন আমাদের শিখিয়ে দেন, পরবর্তী সময়ে বিজিবি যদি তাদের আটক করে আমরা যেন স্থানীয় মেম্বার আমাদের মামা হন পরিচয় দেই। এর দুই দিন পর আবার আমাদের ভারতীয় সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় আমরা আবার আল-আমিনের বাসায় ফিরে আসি। আমি এবং আমার খালা ভারতে যেতে অনিচ্ছা পোষণ করলে আলামিন ভারতে আমার বোনকে আশ্রয়দাতা তাসলিমা নামে একজনের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপ ইমোতে কথা বলিয়ে দেন। তিনি জানান, আমার বড় বোন অনেক অসুস্থ। তাই আমাদের যেতেই হবে। এরপর যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে ইসরাফিল হোসেন খোকন এর নির্দেশে আল-আমিন সাতক্ষীরার আনিস নামে একজনের সাথে যোগাযোগ করেন। সেখানে যাওয়ার পর আলম নামে একজনের বাসায় আমাদের রাখা হয়।

১৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে দশটার দিকে মেহেদি হাসান বাবু, মহিউদ্দিন ও সালাম নামের তিনজন লোক তাকে এবং তার খালাকে নিয়ে বের হন বলে এজাহারে উল্লেখ করেন রাইসা। তিনি বলেন, প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটার পর একটি পাকা রাস্তায় পৌঁছালে মেহেদি হাসান বাবু নামে এক ব্যক্তি পাকা রাস্তার ওপারে একজনকে দেখিয়ে বলেন তার কাছে যাওয়ার জন্য।

এরপর তারা পাকা রাস্তা পার হয়ে সেই লোকটির কাছে যান। প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর সেই অজ্ঞাত লোকটি অন্য আরেকজনের কাছে তুলে দেন। ওই লোকটিও প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর তাদের একটি বাসায় পৌঁছে দেয়। ওই বাসাটির মালিক ছিলেন বকুল ওরফে ছোট খোকন নামে এক ব্যক্তি। এরপর সেই বাসায় এক ব্যক্তি আসেন যাকে পলক মন্ডল বলে সম্বোধন করছিলেন বকুল। ভারতে যাওয়ার আগে আমার এবং আমার খালার ছবি নেওয়া হয়। পলক মন্ডল সেই ছবি দিয়ে তৈরি করা আধার কার্ড দেন আমাদের। পরদিন সকালে পলক মন্ডল আমাদের দুজনকে নিয়ে ব্যাঙ্গালুরুর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তিনদিন পর আমাদের পলক মন্ডল তাসলিমার বাসায় নিয়ে যান। এর একদিন পর আমাকে বিউটি পার্লারের কাজের কথা বলে বেঙ্গালুরুর ইলেকট্রনিক সিটির একটি বাসায় এবং আমার খালাকে কেরালার একটি হোটেলে পাঠানো হয়।

রাইসা বলেন, এরপর থেকে তাদের উপরে চলে অমানবিক যৌন নির্যাতন। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনদিন পর তাকে তাসলিমার বাসায় ফেরত পাঠানো হলে সেখানেই প্রথম তার বড় বোনের সঙ্গে দেখা হয়।

রাইসা বলেন, তখন আমি বুঝতে পারি আমার বড় বোনের অসুস্থতার নাটক করে আমাদের সবাইকে ভারতে পাচার করে আনা হয়েছে। আমার বড় বোন তাসলিমার সাথে তর্কে লিপ্ত হয় তার গায়ে হাত দিলে তখন তাসলিমা হৃদয় বাবু ওরফে টিকটক হৃদয়কে ফোন করে। এরপর ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মাথায় হৃদয় বাবুসহ কয়েকজন তাসলিমার বাসায় আসে। এরপর তারা সবাই আমার বড় বোনকে কে মারধর করে। এরপর তাসলিমার নির্দেশে আমাদের আনন্দপুর সার্কেলে হৃদয় বাবুর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে আমার খালাসহ আরো কয়েকজন তরুণীকে দেখতে পাই।

এরপর সেখান থেকে তাকে চেন্নাই, কেরালা, বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন হোটেল ও মাসাজ সেন্টারে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, নির্যাতনে একপর্যায়ে আমি অসুস্থ হলে তাসলিমা হৃদয় বাবুকে প্রেগনেন্সি টেস্ট করার কথা বলেন। প্রেগনেন্সি টেস্ট করালে রেজাল্ট পজিটিভ আসে। তাসলিমা ও হৃদয় বাবুসহ বাকি কয়েকজন আমাকে বাচ্চা নষ্ট করার কথা বলেন। তখন আমি তাদের হাত-পা ধরে আমাকে দেশে পাঠানোর জন্য বলি। ভেবেছিলাম প্রেগনেন্সি পজিটিভ আসার জন্য তারা আমাকে হোটেলে বা আর কোনও ম্যাসেজ সেন্টারে পাঠাবেন না। কিন্তু এরপরও তারা আমাকে জোরপূর্বক বিভিন্ন হোটেলে এবং মাসাজ সেন্টারে পাঠান।

এজহারে আরো নির্যাতিত এই তরুণী বলেন, ২০২১ সালের ২ মে বেঙ্গালুরুর একটি মাসাজ সেন্টারের জানালা ভেঙে পালাতে সক্ষম হই আমি। সেখান থেকে ট্রেনযোগে কলকাতায় এসে ৬ মে বাংলাদেশে আসি আমি। দেশে ফিরে অসুস্থ হওয়ায় হাসপাতলে ভর্তি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা বলেন আমার পেটের বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে আমার বড় বোন ও ছোট খালা জেরিন কোথায় আছে আমি জানি না।

পালিয়ে দেশে ফেরা এই তরুণী রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার ও পর্নোগ্রাফি আইনে দায়ের করেছেন। সেখানে রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় ও নদীসহ ২২ জনকে আসামি করেছেন। গ্রেফতার নদীসহ সাতজন

এই মামলার আসামিরা হলেন- নদী, ইসরাফিল হোসেন খোকন, তরিকুল ইসলাম , আল আমিন হোসেন, আব্দুল হাই, সাইফুল ইসলাম, তাসলিমা, বিনাশ শিকদার, আমিরুল ইসলাম, মেম্বার, আনিস, আলম, মেহেদি হাসান বাবু, মহিউদ্দিন, সালাম, বকুল, পলক মন্ডল, রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়, সাগর, আখিল, রুবেল, সবুজ।

এরই মধ্যে এই মামলার সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২২ জুন) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেগম মাহমুদা আক্তারের আদালত গ্রেফতার হওয়া এই সাতজনের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন- নদী, আল আমিন হোসেন, সাইফুল ইসলাম, আমিরুল ইসলাম, পলক মণ্ডল, তরিকুল ইসলাম ও বিনাশ শিকদার।

/এমএইচজে/ইউএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
ষষ্ঠ ওয়ালটন প্রেসিডেন্ট কাপ গলফ টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ
ষষ্ঠ ওয়ালটন প্রেসিডেন্ট কাপ গলফ টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ
সুন্দরবনে মাছ ধরা ও পর্যটক প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা
সুন্দরবনে মাছ ধরা ও পর্যটক প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা
পশ্চিমা নীতির কারণেই বৈশ্বিক খাদ্য সংকট: পুতিন
পশ্চিমা নীতির কারণেই বৈশ্বিক খাদ্য সংকট: পুতিন
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত