‘তোকে পাঁচ লাখে কিনেছি, টাকা না উঠলে রক্ষা নাই’

রিয়াদ তালুকদার
২০ নভেম্বর ২০২১, ১৮:৫৫আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২১, ১৯:৩৫

‘তোকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কিনে এনেছি, আমার পাঁচ লাখ টাকা যতদিন না উঠবে, ততদিন তোর রক্ষা নাই।’ কাজের সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশি এক নারীকে এভাবেই হুমকি দিয়ে কাজ করিয়েছেন সৌদি আরবে নারী পাচার চক্রের এজেন্ট বোরহানউদ্দিন। অভিযোগ ভুক্তভোগী এক নারীর। বোরহানের কথামতো না চললে দেওয়া হতো ইলেকট্রিক শক। এ ছাড়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তো আছেই। সৌদি আরবে কাজের সন্ধানে গিয়ে পাচার চক্রের খপ্পরে পড়েও সৌভাগ্যক্রমে দেশে ফিরে আসতে পেরেছেন আসমা (ছদ্মনাম)। তার ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের বিস্তারিত তিনি তুলে ধরেছেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে।

আসমা বলেন, ‘গিয়েছিলাম একটু ভালো থাকার জন্য। একটু ভালো খেতে আর টাকা উপার্জন করতে। কিন্তু সেই বিদেশ আমার কাল হয়ে দাঁড়ালো। সৌদি আরবে যে বাসায় কাজ করেছি সেই বাসার মালিক আমাকে খাবার দিতো একবেলা। মাঝে মধ্যে সেটাও দিতো না। খাবার চাইলেই চলতো নির্যাতন। ফ্লোরে ফেলে আমাকে পা দিয়ে পিষতো, লাথি দিতো। এসব বিষয়ে এজেন্টের সদস্যদের কাছে জানানো হলে উল্টো তারাও চালাতো নির্যাতন। বেশ কয়েকবার আমাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছে।’

এ বছরের সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখ বাসাবাড়িতে কাজের কথা বলে আসমাকে সৌদি আরবে পাঠায় পাচার চক্রের এজেন্ট। র‌্যাবের সহায়তায় গত ২৭ অক্টোবর ওই ভুক্তভোগী নারী সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরেছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের মানবপাচারকারী চক্রের ৭ সদস্যকে গত গ্রেফতার করে র‌্যাব।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী এই নারী বলেন, ‘ওই সৌদি মালিক নিজে নারী হলেও আমার ওপর এমন নির্যাতন চালাতো। পরে সেখান থেকে আমাকে নিয়ে আসা হয় অন্য এক বাসায়। সেখানেও দেওয়া হতো ইলেকট্রিক শক। ওখানে আরও পাঁচ জন মেয়ে ছিল। তাদের ইনজেকশন দিতেও দেখেছি। এজেন্টের কথামতো কাজ না করলে শারীরিক নির্যাতন লেগেই থাকতো। আমাকে বাগানে কাজ দেওয়ার কথা বললেও সেটা দেওয়া হয়নি। পাঠানো হয়েছিল বাসাবাড়িতে। ওই বাড়িতে এক নারী, তার তিন মেয়ে ও স্বামী থাকতো। ভেবেছিলাম কোনও সমস্যা হবে না। কয়েকদিন কাজ করার পর দেখলাম ওই নারীই আমার ওপর নির্যাতন শুরু করে। একদিক খিদের কষ্ট, অন্যদিকে মারধর। অত্যাচারটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ওরা লাঠি দিয়ে মারতো না। এমনভাবে অত্যাচার করতো যেন শরীরে কোনও দাগ না পড়ে।’

কীভাবে বিদেশ গেলেন জানতে চাইলে আসমা বলেন, ‘বান্ধবী নাজমার স্বামী জাহিদের মাধ্যমে পরিচয় হয় ইমরান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। জাহিদের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা আসি। সে আমাকে সৌদি আরবে ভালো বেতনে কাজের প্রলোভন দেখায়। কথাবার্তার একপর্যায়ে আমাকে আগারগাঁও নিয়ে পাসপোর্ট করিয়ে দেয় সে নিজেই। এজন্য তাকে ১৫ হাজার টাকাও দেই।

যেদিন পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়ার তারিখ সেদিন আমি আসি। আমাকে সামনে রেখে সে পাসপোর্টটি নেয়। এরপর সেটা তার কাছে রেখে দেয়। বেশ কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে ইমরান আমাকে কিছু বলে না। শুধু বলে, সময় লাগবে। করোনার কারণে দেরি হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে আমাকে হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বলে ভিসা হয়েছে। দুদিন পর ফ্লাইট। এজন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা লাগবে।

পরিবার থেকে বাধা দেওয়ার কারণে আমি যেতে না চাওয়ায় আমাকে বলা হয়, বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ার জন্য তার দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সেই টাকা দিতে হবে। না দিলে আমাকে বিদেশে যেতেই হবে। পরে ভেবেচিন্তে যেতে রাজি হই।’

এ বিষয়ে র‌্যাব ৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যারা মানবপাচারে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমাদের নজরদারি রয়েছে। বেশ কয়েকটি চক্রকে গ্রেফতার করেছি। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকটি চক্র নজরদারিতে আছে। যারা পাচারের শিকার হয়ে বিভিন্ন দেশে রয়েছেন তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা রয়েছে আমাদের।

উল্লেখ্য, আসমাকে ফাঁদে ফেলে সৌদি আরবে যেতে বাধ্য করা সেই ইমরানকেও গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। মানবপাচারের মামলায় সে এখন কারাগারে আটক আছে।

ডিআইজি মোজাম্মেল হক আরও বলেন, মূলত সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে প্রলোভন দেখিয়ে নিম্নবিত্ত নারীদের টার্গেট করে পাচারকারীরা এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সরকারি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিলে ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারবে তারা প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছে কিনা।

/এফএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পাচার থেকে ফেরত আসা নারীদের উদ্যোক্তা করার উদ্যোগ এসএমই ফাউন্ডেশনের
নারী পাচার চক্রের মূলহোতাসহ গ্রেফতার ৪
রোহিঙ্গা পাচারে সহায়তা করেছিলেন বিগত সরকারের কিছু কর্মকর্তা: টিআইপি রিপোর্ট
সর্বশেষ খবর
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
সব দলকে রাজনীতি করতে দিতে চায় বিএনপি, এর মধ্যে আ.লীগ কি আছে?
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী