একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নেত্রকোনার রাজাকার কমান্ডার মো. ওবায়দুল হক তাহের (৫৫) ও তার সহযোগী রাজাকার আতাউর রহমান ননীর (৫৮) ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শুরু থেকেই তাদের আইনজীবীদের প্রধান বক্তব্য ছিল, ‘১৯৭১ সালে আসামিদের বয়স কম ছিল এবং তারা রাজাকার ছিলেন না।’ ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত রায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নিরস্ত্র মানুষকে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং হত্যার অভিযোগে এই দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মামলার এই দুই বিষয়ও খণ্ডন করে দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল বলছেন, প্রথমত মনে রাখা দরকার, এটা বলাই যাবে না যে, অভিযুক্তরা স্থানীয় রাজাকারের সদস্য নন বলে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ নেই। তাদের একজন ‘ইন্ডিভিজ্যুয়াল’ হিসেবেও বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে তাদের অপরাধের জন্য।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে লিখছেন, অভিযুক্তরা রাজাকার বাহিনীতে ছিলেন না—এমন যুক্তি দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন দালিলিক প্রমাণ হিসেবে নেত্রকোনা সদর উপজেলার রাজাকার আলবদর আলসামসের তালিকা দিয়েছে। একই সঙ্গে ওবায়দুল হকের বাবা মওলানা মঞ্জুরুল হকের পাকিস্তানপ্রীতির উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ দালিলিক প্রমাণ হিসেবে নেত্রকোনায় ভাবগম্ভীর পরিবেশে শহীদ আল মাদানী দিবস পালিত শিরোনামে ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বরের একটি পত্রিকা উপস্থাপন করেছে। যেখানে উল্লেখ আছে, অভিযুক্তের বাবা মওলানা মঞ্জুরুল হক নেত্রকোনার নেজাম ই ইসলামীর সভাপতি ছিলেন। সেই পথ ধরেই ওবায়দুল হক তাহের পাকিস্তানি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। বেশিরভাগ দালিলিক প্রমাণ নষ্ট করে ফেলা হয় বলেও প্রসিকিউশন পক্ষে আইনজীবী যুক্তি দিয়েছেন।
যদিও ননী তাহেরের আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার চেষ্টা করেছেন, এই প্রমাণাদির ভিত্তি নেই সেটা প্রতিষ্ঠা করতে। তিনি বলেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিটের তৈরি করা একটা তালিকা দিয়ে অভিযুক্তদের রাজাকার বানানো সম্ভব নয়। কারণ, এই দলিলের কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই। তিনি এও বলার চেষ্টা করেছেন, তাদের কোনও প্রমাণে তারা বলতে পারেননি, ১৯৭১ সালে এই অভিযুক্তরা রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন। যদিও একাধিক সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে তাহের-ননীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ননীর পক্ষে আইনজীবীরা দাবি করেন, ওই সময় তিনি নাবালক ছিলেন। অষ্টম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী কখনও রাজাকার সহযোগী হয়ে উঠতে পারে না। ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেন, তারা আসামিপক্ষের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তদন্ত কর্মকর্তা আসামি ননীর এসএসসির যে কাগজ জমা দিয়েছেন, তাতে তার জন্মসাল ১৯৫৬ সালের ৭ জুলাই উল্লেখ রয়েছে। যাতে বোঝা যায় ১৯৭১ সালে তার বয়স ১৫ বছর। ট্রাইব্যুনাল রায়ে লিখেছেন,
যেখানে আমাদের সমাজে বয়স কমিয়ে কাগজপত্র তৈরির সামাজিক প্রবণতা লক্ষ করা যায়, সেখানে এটা কোনওভাবেই প্রমাণ করা যায় না যে, তার বয়স বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আসামিপক্ষের প্রয়াসেরও সমালোচনা করেছেন ট্রাইব্যুনাল এই বলে যে, আসামিপক্ষ এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার সময় তার কাছ থেকে হ্যাঁ-না কোনও উত্তর নেননি।
এ মামলার প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বলেন, আসামিপক্ষ তাদের পক্ষে খুবই হালকা অবস্থান নিয়েছেন। তারা রাজাকার ছিলেন না, বয়স কম ছিল—এসব যুক্তি যে সত্য নয়, সে সব তো প্রমাণ করে দেওয়া গেছে। আরও দালিলিক প্রমাণ দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু কোনওভাবেই সেই সুযোগ এই দুই অভিযুক্ত রাখেননি। স্বাধীনতার ৪৪বছর পর এত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে যেটুকু দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাতেই প্রমাণ করা গেছে তারা রাজাকার হিসেবে বর্বরোচিত অপরাধ করেছেন।
/এমএনএইচ/








