মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় শূন্য হওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে শুরু হয়েছে প্রার্থী ও ভোটের সমীকরণ। বিএনপিতে মির্জা ফখরুলের পরিবারের সদস্যসহ একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় থাকলেও জামায়াত আগের নির্বাচনের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকেই বিবেচনায় রাখছে।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী) সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে শনিবার (২২ আগস্ট) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অচিরেই তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। আসন্ন উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন তৎপরতা শুরু না হলেও ভেতরে-ভেতরে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। প্রধান দলগুলো একক নাকি জোটগতভাবে অংশ নেবে, তাও জানা যায়নি।
নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে; এটি মোটামুটি নিশ্চিত। এই আসনটিতে বিএনপির একাধিক প্রার্থীর নাম সামনে আসছে। আবার মির্জা ফখরুলের ইমেজকে কাজে লাগাতে তার পরিবারের কাউকে দল থেকে প্রার্থী করা হতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। তবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা এ বিষয়ে জানতে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে বলছেন। অপরদিকে পরিচিত মুখ হিসেবে জামায়াতের আগের প্রার্থী দেলাওয়ারই মনোনয়ন পাচ্ছেন; এমনটাই ‘প্রায় নিশ্চিত’ বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
ভোটের মাঠে অতীত পরিসংখ্যান
স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের এ আসনটি ঐতিহাসিকভাবেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৯টি নির্বাচনের মধ্যে সাতটিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে পাঁচটিতে এমপি হয়েছেন দলটির নেতা প্রয়াত রমেশ সেন। বাকি দুবার জয় পেয়েছেন একই দলের খাদেমুল ইসলাম।
আর মাত্র দুটি নির্বাচনে জয় পেয়েছে বিএনপি। এ আসন থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জয় পেয়েছিলেন তিনি।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকে প্রায় ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় পান মির্জা ফখরুল। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ এবং জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ভোট। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। আর জামায়াত কখনও জয় না পেলেও আসনটিতে দলটির উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে।
বিএনপিতে আলোচনায় কারা
ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী কে হচ্ছেন, দলগতভাবে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। তারপরও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র ছিলেন।
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির দুই সহ-সভাপতি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও সুলতানুল ফেরদৌস নম্র চৌধুরী মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তবে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসাবিজ্ঞানী শামারুহ মির্জাও এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে। যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা এ ব্যাপারে এখনও মুখ খোলেননি।
আগের প্রার্থীতেই ভরসা জামায়াতের
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনে বিএনপিতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন। বিগত নির্বাচনে তিনি মির্জা ফখরুলের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ৪১ হাজারের মতো ভোট পেয়ে আলোচিত হন।
দলটির নেতারা মনে করেন, তখন মির্জা ফখরুল জাতীয় নেতা হিসেবে হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। এ কারণে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। সেখানে তরুণ প্রার্থী হিসেবে দেলাওয়ার যে ভোট পেয়েছেন, সেটি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা মনে করেন, উপনির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট হলে ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে।
দুই দলের নানা সমীকরণ
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে একাধিকবার নির্বাচন করায় এই আসনে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছেন মির্জা ফখরুল। তবে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত হওয়ায় আসনটিতে বেশিরভাগ সময়ই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে আসছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে ক্লিন ইমেজের কারণে তার প্রতি এক ধরনের উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভোটারদের। সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে সংখ্যালঘুসহ দলটির বড় অংশের ভোট পড়ে তার বাক্সে। এমনটি মনে করেন স্থানীয়রা।
ঠাকুরগাঁও সদরের মুন্সীপাড়ার আর্ট গ্যালারি এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী গোলাম দস্তগীর রাসেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান কোনও অংশে কম নয়। তবে জয়-পরাজয়ে প্রায় লাখের মতো সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর। তাদের ভোট যেদিকে যাবে, সেদিকের পাল্লা ভারী হবে।’
তার মতে, উপনির্বাচনে মির্জা ফখরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে কাউকে প্রার্থী করা হলে বিএনপির জয়ের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে।
অন্যদিকে অতীতে এ আসনটিতে জামায়াতের কোনও প্রার্থী জয় না পেলেও তাদের উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে। ১৯৯১ সালে এককভাবে নির্বাচন করে দলটির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পেয়েছিলেন ২৬ হাজার ভোট। যেখানে মির্জা ফখরুল ৩৬ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন।
তবে সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটির তরুণ প্রার্থী মির্জা ফখরুলের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটির প্রার্থী হিসেবে দেলাওয়ার হোসেন ১ লাখ ৪১ হাজার ভোট পাওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন নেতাকর্মীরা। দলটির একটি সূত্র জানিয়েছে, দেলাওয়ার প্রথম নির্বাচনেই তাক লাগানো ভোট পেয়েছেন। নির্বাচনি এলাকার অলিগলিতে তার পদচারণা ছিল। তাই তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার গ্রেফতার ও টানা ৫৩ দিনের রিমান্ডে থাকার কারণে ভোটারদের মধ্যে তার প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
অপেক্ষা করতে বললেন দুই দলের নেতারা
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হচ্ছেন কে, এমনটি জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড ও অঞ্চল নেতারা খোঁজখবর নিচ্ছেন। অচিরেই চূড়ান্ত প্রার্থী নিশ্চিত করা হবে বলে জানান।
তার মতে, বিগত নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন রেকর্ড ভোট পেয়েছেন। তার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির আরেক নেতা বলছেন, ‘দেলাওয়ার হোসেনই জামায়াতের প্রার্থী হচ্ছে, এটি প্রায় নিশ্চিত। তারপরও দলীয় সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে এটা বলা যাচ্ছে না।’
অন্যদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রার্থিতা নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষ করে নির্বাচন আসলে প্রার্থী বাছাই বা মনোনয়ন ফরম বিক্রিসহ সে ধরনের কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। আকাশে সূর্য উঠলে যেমন সবাই দেখতে পায়, কোনও ধরনের সিদ্ধান্ত হলে নিশ্চয়ই সবাই জানতে পারবেন। এ জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।’









