পুরান ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যার ঘটনার একবছর পেরিয়ে গেছে। সেই সময়ে এই হত্যার ভিডিও ভাইরাল হলে ক্ষোভে ফুসে ওঠে সারাদেশ। দেশের মানুষ এই হত্যার দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি জানায়। তবে নৃশংস এই হত্যার ঘটনায় এখনও শুরু হয়নি বিচার। এমনকি মামলা তুলে নিতে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে নিহতের পরিবার।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়লেও একবছরেও শুরু হয়নি বিচার। মামলাটি এখনও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আটকে রয়েছে। এই অবস্থায় বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মামলার নথি থেকে আরও জানা যায়, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২০ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। পরে তদন্ত শেষে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ১৩ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকলেও আট জন এখনও পলাতক।
বিচারের জন্য মামলা স্থানান্তর
মামলার তদন্ত শেষে একই বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও আসামিদের নাম-পরিচয়সহ কিছু বানান ও তথ্যগত অসংগতি ধরা পড়ে। পরে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। অধিকতর তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের জুনে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হলে আদালত সেটি গ্রহণ করেন। পরে ২১ জুন মামলাটি ঢাকার মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারের জন্য ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলাটি অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জিয়াউল হক। তিনি বলেন, “মামলাটি বর্তমানে বিচারিক আদালতে রয়েছে। তবে এখনও বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। সেই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়ন হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের দিকে তাকিয়ে সরকারের উচিত মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো। এতে বিচার দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে।”
মামলায় বিচার কাজ শুরু হতে এত সময় কেন লাগছে, এমন প্রশ্নের জবাবে জিয়াউল হক বলেন, “তদন্ত শেষে গত ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে আসামিদের নাম-পরিচয়ে অসংগতি থাকায় তা গ্রহণ করেনি আদালত। পরে অধিকতর তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের জুনে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হলে আদালত সেটি গ্রহণ করেন।”
১২ জুলাই ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ গঠনের পরই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান এই আইনজীবী।
সোহাগের পরিবারকে হত্যার হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, “মামলা তুলে নিতে নিহত সোহাগের স্ত্রী-সন্তানদের ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।”
পরিবার যা জানালো
সোহাগের পরিবারের অভিযোগ, পলাতক কয়েকজন আসামি সম্প্রতি সংসদ নির্বাচনের পর এলাকায় ফিরে এসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা মামলা তুলে নিতে পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন।
নিহত সোহাগের ভাগনি বিথি বলেন, “এই হত্যায় সরাসরি জড়িত ইমরান বাবার নাম ও তার বয়স পরিবর্তন করে অব্যাহতি পেয়েছে। সে দোকানের সামনে এসে প্রতিনিয়ত আমাদের প্রাণ-নাশের হুমকি দিচ্ছে। ইমরান বলছে তোর মামাকে যেভাবে মারছি, তোদেরও মেরে বস্তায় ভরবো, রেডি থাক।”
বিথি বলেন, “মামা মারা যাওয়ার পর মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। (সোহাগের বড় বোন ও মামলার বাদি মঞ্জুয়ারা বেগম)। মামার দোনকটি এখন আমি ও আমার বাবা পরিচালনা করছি। এই ইমরান মামার কাছে কয়েক লাখ টাকা চাদা দাবি করে। মামা চাদা না দেওয়ায় হত্যার শিকার হয়।”
তিনি বলেন, “মামলার ২ নম্বর আসামি টিটু এখনও গ্রেফতার হয়নি। সে নিয়মিত অনলাইনে, ফোনে মামা ছেলে-মেয়ে ও আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। সে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হত্যা মামলার আসামিরা কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, এই দায় পুলিশ এড়াতে পারে না। আমরা বাঁচতে চাই, রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাই।”
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
এই বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স (সিপিএস) বিভাগে অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, “প্রথম প্রতিবেদনে আসামিদের নাম-পরিচয়সহ কিছু বানান ও তথ্যগত অসংগতি ধরা পড়ায় সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার সময় নষ্ট হয়েছে। এছাড়া বাবার নাম ও বয়স বয়স পরিবর্তন করে আসামি অব্যাহতি পেয়েছে। এখানে তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি রয়েছে। তারা এই দায় এড়াতে পারে না। হত্যা মামলার আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় পুলিশ এই দায় এড়াতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্তার সংকট আরও বাড়বে।”
তিনি বলেন, “যেসব কর্মকর্তার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়তে দেরি হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এছাড়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব দ্রুত বিচার শেষ করা ও বাদীর পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া।”








