বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির হাইকোর্টে করা আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরির কাজ চলছে। মিন্নির মূল আইনজীবী অসুস্থ থাকায় আইনি প্রক্রিয়ার গতি কিছুটা ধীর হলেও তিনি উচ্চ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তার আইনজীবী ও পরিবার। বর্তমানে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা মিন্নির আচার-আচরণে ভুলের স্পষ্ট অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন মিন্নির সাবেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারী আসলাম, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার এবং মিন্নির মা জিনাত জাহান মনি।
২০২০ সালে বরগুনা আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেছিলেন মিন্নি। আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করার পর থেকেই আনুষঙ্গিক পেপারবুক প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়।
মিন্নির সাবেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারী আসলাম জানান, মিন্নির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না অসুস্থ থাকায় বর্তমানে পেপারবুক গোছানো ও শুনানির প্রস্তুতি কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে আইনি যুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, “মিন্নি এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতেই স্পষ্ট দেখা গেছে তিনি তার স্বামী রিফাতকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালেও নিয়ে যান। সার্বিক পরিস্থিতিতে আমরা সম্পূর্ণ আশাবাদী যে উচ্চ আদালতে মিন্নি খালাস পাবেন।”
স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় তিন মাস আগে মিন্নিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়।
বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা বলেন, “মিন্নি বর্তমানে বরিশাল কারাগারে রয়েছেন। তার চলাফেরা ও আচার-আচরণে ভুলের জন্য অনুশোচনার ছাপ স্পষ্ট। অপরাধ করার সময় তার বয়স অনেক কম ছিল, এখন হয়তো তিনি বিষয়গুলো বুঝতে শিখেছেন। কারাগার তো মূলত আত্মশুদ্ধির জায়গা; সব আসামি যেন নিজেদের শুধরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে আমরা সেই চেষ্টাই করি। মিন্নিও নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন।”
মিন্নির শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক আকুতির কথা তুলে ধরে তার মা জিনাত জাহান মনি বলেন, “কাশিমপুর কারাগারে থাকার সময় মিন্নি সাইনুসাইটিস, ঘাড়ের তীব্র ব্যথা, লো প্রেশার ও দাঁতের যন্ত্রণায় ভুগছিল। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া বা ঘুমাতে পারতো না, এমনকি সেখানকার পানিও সহ্য হচ্ছিল না। পরে আবেদন করে তাকে বরিশাল কারাগারে নিয়ে আসি। এক সপ্তাহ আগেও তার সঙ্গে দেখা করেছি, এখন সে আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছে।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়ের বয়স অনেক কম ছিল, পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু সে তো সরাসরি হত্যায় জড়িত ছিল না; বরং নিজের জীবন বাজি রেখে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এতদিন চোখের পানি ফেলে দিন পার করেছি। আমরা আশাবাদী, হাইকোর্ট সঠিক বিচার করে আমার মেয়েকে খালাস দেবেন।”
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফের ওপর রামদা হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় একদল বখাটে যুবক। ঘটনার সময় ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সঙ্গে থাকা স্ত্রী মিন্নি একাই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে স্বামীকে রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যান, যেখানে আশপাশের অনেকে নিরব দর্শক ছিলেন। ওই নৃশংস ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ ওরফে ‘নয়ন বন্ড’ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
এই ঘটনার তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয় যখন হত্যাকাণ্ডের ২১ দিন পরে রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে নিহত রিফাত শরীফের বাবা তার ছেলে হত্যার সঙ্গে মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন।
২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় চার জনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে।

বোমা হামলাসহ নাশকতার শঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কতা জারি 





