আইনজীবীকে পুলিশে দিয়েছিল জনতা। পরে ঢাকার পল্লবী থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল বাশারকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম এ আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশন এলাকায় লোকজন অ্যাডভোকেট আবুল বাশারকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। পরে তাকে সন্ত্রাসীবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন পল্লবী থানার এসআই সালাহউদ্দিন আল-মামুন। পরে শুনানি নিয়ে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
শুনানিতে যা হলো
এদিন দুপুরে বাশারকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। দুপুর ২টার দিকে জামিন বিষয়ে শুনানি হয়। বাশারের আইনজীবীরা তার উপস্থিতিতে শুনানি করতে আদালতে আবেদন করেন।
পৌনে ৪টার দিকে বাশারকে এজলাসে তোলা হয়। আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায় এজলাস কক্ষ। আইনজীবীরা সেলফি তোলা, ভিডিওতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এভাবে চলতে থাকে বেশ কিছু সময়।
একপর্ায়ে আদালতের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এজলাস কক্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়োজিত করা হয়। এরপর এজলাস কক্ষে আসেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউকর ওমর ফারুক ফারুকী। ধীরে ধীরে এজলাস কক্ষে আসেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।
অতিরক্তি ভিড়, কোলাহল থাকায় প্রসিকিউটর ফারুকী আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন,‘‘মামলার শুনানি হওয়ার পরিবেশ নাই। শুনানির পরিবেশ হতে হবে। এরপর মামলার শুনানি শুরু হবে।’’
যারা ওকালতনামা দিয়েছেন তাদের ছাড়া বাকিদের বেরিয়ে যেতেন বলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
তখন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সোহাগ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে বলেন,‘‘আদালতের পরিবেশ শান্ত থাকবে।’’
এসময় আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের শান্ত থাকতে বলেন তিনি। তবে তারপরও ওকালতনামা ব্যতীত আইনজীবীদের বের করে দেওয়া হয়। পরে আওয়ামীপন্থী সব আইনজীবী এজলাস ত্যাগ করেন।
এরপর বিকাল সাড়ে ৪টায় বিচারক এজলাসে ওঠেন। আসামিরপক্ষে কোনও আইনজীবী আছেন কিনা জানতে চাওয়া হয়। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাশার আদালতকে জানান, তিনি নিজেই শুনানি করবেন। ওকালতনামা জমা দিয়ে শুনানি শুরু করেন তিনি।
শুনানিতে যা বললেন বাশার
তিনি বলেন,‘গতকাল (বুধবার) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় বাসায় ফিরছিলাম। আমার ২২ মাসের একটা বাচ্চা আছে। তারজন্য দুধ কিনতে একটা ফার্মেসিতে যাই। পকেটে টাকা না থাকায় বিকাশ থেকে টাকা তুলতে পাশের একটি দোকানে যাচ্ছিলাম। তখন ৩/৪ জন আমার পথরোধ করেন। তাদের সাথে মাদক নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। তারা আমার গায়ে হাত তোলেন, মারধর করেন, মব সৃষ্টি করেন। ওই এলাকায় আমি অনেক বছর যাবত বসবাস করি। স্থানীয় লোকজন আমিকে উদ্ধার করেন। পরে ৯৯৯ এ ফোন করেন।’’
বাশার বলেন,‘‘২০১৬ সালে আমি আইনজীবী হই। কারও সাথে কখনও বেয়াদবি করিনি। নিয়মিত কোর্ট করি। আমি আপনার (বিচারক) কাছে ন্যায়বিচার চাই।’’
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
ওমর ফারুক ফারুকী মামলার বিষয়ে তুলে ধরে বলেন, ‘‘সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক স্লোগান দেওয়া হয়। সরকার উৎখাতের মিছিল করে। পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে নিয়েও স্লোগান দেয়। তারা সন্ত্রাসী কায়দার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় লোকজন তাকে চেনে। তিনি মিছিলে ছিলেন। তারাই তাকে চিহ্নিত করে আটক করেন। কয়েকদিন যাবত দেশের শান্তিপূর্ণ আবহকে নষ্ট করতে স্লোগান দিচ্ছেন। কয়েক জায়গায় বোমা বর্ষণ করছেন। গুলশানের মতো জায়গায়ও তারা স্লোগান, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।’’
তিনি বলেন,‘‘এখানে (আদালতে) অনেকে সাদা শার্ট পড়ে এসেছিল মব সৃষ্টি করতে। মব সৃষ্টির পাঁয়তারা করছিল। মব করার চেষ্টা করেছিল। দেশবাসীকে তা দেখানোর চেষ্টা করেছিল। এ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তীকালে ব্যবস্থা নেবেন। এপর্যায়ে জামিনের বিরোধিতা করছি। জামিন দিলে এ ধরনের অবস্থা চলতে থাকবে। দেশের শান্তি বিঘ্নিত হবে।’’
জবাবে বাশার বলেন,‘‘বর্তমান যুগ তো তথ্য প্রযুক্তিতে আগানো। মামলার ঘটনার দিন থেকে গতকাল (বুধবার) পর্যন্ত আমি কোনও মিছিলে গিয়েছিলাম কিনা, তার কোনও ভিডিও, স্ক্রিনশর্ট, লোকেশন চেক করলেই তো হয়। আমার কাছে কোনও ধরনের কিছু পায়নি।’’
পরে প্রসিকিউটর ফারুকী বলেন,‘‘পুলিশ চিহ্নিতের আগে জনগণ তাকে চিহ্নিত করে পুলিশে দিয়েছে। তার জামিনের বিরোধিতা করছি।’’
পরে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, গেল ৩১ জুলাই সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পল্লবীর মেট্রোরেল এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল করে। তারা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রসহ অপপ্রচার করে মিছিল করছিল। পুলিশ সেখানে গিয়ে কয়েকজনকে আটক করে। আর কয়েকজন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওইদিন পল্লবী থানার এসআই সোহান মোল্লা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা দায়ের করেন।








