সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মেয়র, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে ১৮টি মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইসঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও তার পরিবারের সদস্যসহ সাত জনের সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ জারির অনুমোদন এবং ভোলা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরীসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলায় চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান দুদকের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম।
কুষ্টিয়ার সাবেক এমপি ও স্বজনদের বিরুদ্ধে মামলা
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য কম দেখিয়ে গোপন করা এবং ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য প্রাথমিক যাচাইয়ে পাওয়া গেছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রউফের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৬০৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা অনুমোদন করা হয়েছে। তার স্ত্রী জান্নাতুন নাহারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৯২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আবদুর রউফকে সহায়তাকারী দেখিয়ে পৃথক আরেকটি মামলা অনুমোদন করেছে কমিশন।
কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণীতে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ৫৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তার ছোট ভাই ও দৌলতপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৩৪ লাখ ১৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ১ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক আরেকটি মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।
আবু জাহিরের বিরুদ্ধে সম্পদ গোপন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ
হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আবু জাহিরের বিরুদ্ধে দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে ৭ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৭ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন এবং ৯ কোটি ৩২ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৯ টাকার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া তার চারটি ব্যাংক হিসাবে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৭৫৬ টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগের কথা জানিয়েছে দুদক। তার বিরুদ্ধে দুদক আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রহিম উল্লাহ ও নয়নের বিরুদ্ধে মামলা
ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাজী রহিম উল্লাহর বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫২১ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা অনুমোদন করেছে কমিশন।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।
তার স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াছমিন লুবনার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এবং ওই সম্পদ অর্জনে সহায়তার অভিযোগে নয়নসহ দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি মামলা অনুমোদন করেছে দুদক।
কাদের মির্জা, স্ত্রী ও ছেলের বিরুদ্ধে তিন মামলা
বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখার অভিযোগে মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তার স্ত্রী আখতার জাহান বকুলের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এবং এতে সহায়তার অভিযোগে কাদের মির্জাসহ দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।
এ ছাড়া কাদের মির্জার ছেলে মির্জা মাসরুর কাদের তাশিকের বিরুদ্ধে বাবার সহায়তায় ৮১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরও একটি মামলা অনুমোদন করেছে কমিশন। সব মিলিয়ে কাদের মির্জা ও তার পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতায় তিনটি মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।
যশোরের সাবেক মেয়র ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুই মামলা
যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম চাকলাদারের বিরুদ্ধে ২৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার ২২১ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তার স্ত্রী শামীমা শারমিনের বিরুদ্ধে ৬ কোটি ৭২ লাখ ৯ হাজার ৪৫৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এবং এতে সহায়তাকারী হিসেবে জহিরুল ইসলাম চাকলাদারকে আসামি করে পৃথক আরেকটি মামলা অনুমোদন করেছে দুদক।
নঈম নিজাম ও ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক নঈম নিজামের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ১৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনেছে দুদক।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, তার নিজের ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ১৯টি ব্যাংক হিসাবে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ৬১ হাজার ৯১৩ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ অর্থের উৎস গোপন, রূপান্তর, স্থানান্তর ও হস্তান্তরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুদক আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নঈম নিজামের স্ত্রী ও সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ১৮০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করেছে দুদক।
কমিশনের অনুমোদন অনুযায়ী, তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮১৪ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন, রূপান্তর, স্থানান্তর ও হস্তান্তরের অভিযোগে তার বিরুদ্ধেও দুদক আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে পৃথক মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা
খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৫১ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ বিবরণীতে ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ১২০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা অনুমোদন করেছে দুদক।
তার স্ত্রী জাকিয়া মাহাবুবের নামে ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৬১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি মামলা অনুমোদন করা হয়েছে।
বদি ও পরিবারের পাঁচ জনের সম্পদ বিবরণী চায় দুদক
এদিকে কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও তার পরিবারের সদস্যসহ পাঁচ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বদির বিরুদ্ধে ১০ কোটি ২১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮৮ টাকা, তার স্ত্রী শাহীন আক্তারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার ৯১১ টাকা, মেয়ে সামিয়া রহমান সানির বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৩৪ লাখ ২৯ হাজার ৪১৮ টাকা এবং ছেলে আব্দুল্লাহ আরমান শাওনের বিরুদ্ধে ৫২ লাখ ২৩ হাজার ৯১ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।
বদির ভগ্নিপতি ওমর ফারুকের বিরুদ্ধেও ২৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সম্পদ বিবরণীর নোটিশ জারির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যশোর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৬ টাকা এবং তার স্ত্রী ফারদীনা রহমানের বিরুদ্ধে ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হওয়ায় তাদের দুজনের সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ জারির অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
সাবেক এমপি নুরুন্নবীসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
অন্যদিকে ভোলা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরীসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ ৩ হাজার ৩৩৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলায় ২০২১-২২, ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির ৩৫৬টি প্রকল্পের মধ্যে তদন্তে ১১টি প্রকল্পে কোনও কাজ না করেই ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৩ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায়। আরও চারটি প্রকল্পে ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকার কাজ কম করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।
তদন্ত শেষে সাবেক সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী, লালমোহনের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহাগ ঘোষ, তজুমদ্দিনের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতিসহ মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে দাবি করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।









