সমুদ্রের বুকে বাড়ানো রানওয়ে। তার পাশে ঢেউয়ের আদলে তৈরি ছাদ, দূর থেকে দেখলে যেন বিশাল এক ঝিনুক। কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল এখন যাত্রী ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুত। আগামী সপ্তাহে নতুন টার্মিনাল দিয়ে অভ্যন্তরীণ যাত্রী চলাচল শুরু হবে। আর অক্টোবরের শেষ দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক ঘোষণা করা হবে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তারা বলছেন, এবার আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে আগের চেয়ে বেশি পরিকল্পিতভাবে।
সম্প্রতি বেবিচক চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নতুন টার্মিনাল ও বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে।
বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) সদস্য এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুরোনো টার্মিনালে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে আগামী সপ্তাহে নতুন টার্মিনাল চালু করা হবে। প্রথমে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রী ব্যবস্থাপনা সেখানে শুরু হবে। এরপর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে অক্টোবরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এয়ারলাইনগুলোকে এরই মধ্যে জানানো হয়েছে। তারা প্রস্তুতির কথা জানালে বেবিচক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এর আগে ২০২৫ সালে ১২ অক্টোবর বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিএ–১ শাখা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও ২৩ অক্টোবর তা স্থগিত করা হয়।
বেবিচক সূত্র জানায়, গত বুধবার (২৩ অক্টোবর) চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নতুন টার্মিনাল এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করেন। নতুন টার্মিনালের সব অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনগুলোও নতুন টার্মিনালে যাত্রী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সরিয়ে নিতে প্রস্তুত। শুরুতে উড়োজাহাজ থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত যাত্রী আনা-নেওয়ার জন্য গলফ কার্ট ব্যবহার করা হবে।
বেবিচক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, নতুন টার্মিনালে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম শুরুর পর পরবর্তী মাসে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হবে।
কক্সবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই পর্যটন এলাকায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনও খুব কম। পুরোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোট হওয়ায় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব ধরনের উড়োজাহাজ সেখানে চলাচল করতে পারতো না। ফলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকায় এসে এরপর কক্সবাজার যেতে হতো।
এই পরিস্থিতি বদলাতে ২০১২ সালে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে রানওয়ে ও টার্মিনাল সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের একটি অংশের পরামর্শক ছিল কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান।
জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে রানওয়ে সম্প্রসারণে নতুন জায়গা খুঁজতে হয়। শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে রানওয়ে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২১ সালে শুরু হয় এ কাজ।
প্রকল্পের আওতায় ১০৫ একর জমি উন্নয়ন করা হয়েছে। সমুদ্রের ঢেউ থেকে রানওয়েকে রক্ষায় প্রায় দুই কিলোমিটার সি-ডিফেন্স বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এতে ৩০০ কেজি ওজনের পাথর এবং চার টন ওজনের সিসি ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে। সমুদ্রের ভেতরেই এসব ব্লক তৈরি করে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ঢেউয়ের আঘাত থেকে রানওয়েকে সুরক্ষা দিতে কংক্রিটের এই বাঁধ তৈরি করা হয়।
সমুদ্রের ওপর প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট অ্যাপ্রোচ লাইট বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাট-২ এজিএল ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের স্থাপনা এটিই প্রথম।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পুরোনো রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ৬ হাজার ফুট। পরে আরও ৩ হাজার ফুট বাড়িয়ে তা ৯ হাজার ফুট করা হয়েছে। এ সম্প্রসারণের ফলে রাতে উড়োজাহাজ ওঠানামার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজেও নানা চ্যালেঞ্জ ছিল। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সংকট এবং উত্তাল সমুদ্রের কারণে কাজ এগিয়ে নিতে সমস্যা হয়েছে। নরম মাটি ও কাদা সরাতে চীনা প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন ড্রেজার ব্যবহার করেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগামী ১০০ বছরে কতটা বাড়তে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছিল। সেই হিসাবের চেয়ে বেশি উচ্চতায় সি-ডিফেন্স তৈরি করা হয়েছে। এতে কংক্রিটের ব্লক ও পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি ব্লকের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে পাথর আনা হয়েছে।
রানওয়ে ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারণের পর আরও ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট এলাকায় স্তরে স্তরে পাথর বসিয়ে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। রানওয়ের শেষ প্রান্তে অ্যাপ্রোচ লাইটের জন্য সেতুও তৈরি করা হয়েছে। এসব আলো উড়োজাহাজকে রানওয়ে ব্যবহারে পথ দেখাবে। রানওয়ে দিয়ে উড়োজাহাজ ওঠানামার সময় দুই পাশেই থাকবে বঙ্গোপসাগর।
নতুন টার্মিনালের ছাদ তৈরি করা হয়েছে ঝিনুকের আকৃতিতে। ওপরের স্টিলের কাঠামোতে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো নকশা রাখা হয়েছে। সমুদ্রঘেঁষা বিমানবন্দরের সঙ্গে মিল রেখেই এই নকশা করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি আশা প্রকাশ করেছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ বিদেশি এয়ারলাইনগুলো কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় হাইব্রিড পদ্ধতি চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন—দুই কার্যক্রমই নতুন টার্মিনালে হবে। অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন হবে পুরোনো টার্মিনালে। আর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন করে পরে পুরোনো টার্মিনালে গিয়ে উড়োজাহাজে উঠবেন।
বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রতিদিন ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করে।
বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওসার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগামী সপ্তাহে নতুন টার্মিনাল চালু হবে। অক্টোবরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক ঘোষণা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ঘোষণা দেবেন। আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বেবিচকের মাধ্যমে দুটি উন্নয়ন প্রকল্প ও একটি কারিগরি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য কক্সবাজারের পর্যটন বাজারের সঙ্গে সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরি করা।
নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালের আয়তন প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার। এর অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। টার্মিনালের আন্তর্জাতিক বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জন যাত্রী বসতে পারবেন। রয়েছে ডিউটি ফ্রি শপ, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এস্কেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন কাউন্টার, বহির্গমন ও আগমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং আগমন লাউঞ্জ।
আন্তর্জাতিক বহির্গমনে চারটি এবং আগমনে ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার থাকবে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের লাগেজের জন্য দুটি বেল্ট রয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম, সাইনেজ, সিসিটিভি ও ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন অবকাঠামোর ফলে বছরে যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে।
এ ছাড়া ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রন তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দুটি ওয়াইডবডি এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ রাখা যাবে। দুটি ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ করে চালু করা হয়েছে। ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ গাড়ির পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তৈরি করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ সড়কসহ অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় মান যাচাই শেষে বিমানবন্দরটি আইকাও সনদও পেয়েছে।
সম্প্রসারিত রানওয়ে পূর্ণ বোঝাই অবস্থায় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০-এর মতো ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চীনের যৌথ প্রতিষ্ঠান সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ চালু হলে বিদেশি পর্যটক বাড়বে এবং হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।