গরিবের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৬ ঘণ্টার তাণ্ডব, টেরই পেলো না পুলিশ?

ইমরান আলী
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০০ আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:২৮

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে ৫০ বছরের পুরোনো মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডায় প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভবন ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে সেখানে হামলা চালায়। ভোর পর্যন্ত চলে ভাঙচুর ও লুটপাট। ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও নগদ অর্থ। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি নিজেদের দাবি করে ‘সমমনা ব্যবসায়ী পরিষদ লিমিটেড’-এর ব্যানারও টাঙিয়ে যায় হামলাকারীরা।

নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার দীর্ঘ সময় পরও পুলিশ কেন তা ঠেকাতে পারেনি; এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ একবার ঘটনাস্থলে এলেও পরে চলে যায়। এরপরই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে হামলাকারীরা।

শনিবার সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

যেখানে প্রতিদিন সেবা নিতেন ৩০০-৩৫০ মা ও শিশু

মিরপুর-১ এর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের ঠিক পেছনে রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি। বিপরীতে মূল সড়ক, পাশে এপেক্স জুতার শোরুম ও ওপরে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। মার্কেটের ভেতরের সরু রাস্তা ধরে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক দিয়ে মা ও শিশুরা স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসতেন।

স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়া এই কেন্দ্রে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মা ও শিশু সেবা নিতেন। প্রান্তিক পরিবারের গৃহিণী ও শিশুদের জন্য এটি ছিল টিকা ও প্রাথমিক চিকিৎসার অন্যতম ভরসার জায়গা। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় সেখানে এখন আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো চিহ্ন নেই। শত শত মানুষের চোখের সামনে টিনের ছাদ থেকে শুরু করে ভেতরের সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। আসবাবপত্র, ওষুধসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

মিরপুর স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে ভাঙচুর। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল সেখানে আসে। পূর্ব পাশের মূল সড়কে ভেকু রাখা হলেও সেটি ভেতরে ঢোকানো সম্ভব হয়নি। পরে হাতুড়ি, খুন্তিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে ভাঙচুর শুরু করে তারা। ভোর পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব।

ছয় ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে এমন ভাঙচুর চললেও পুলিশ তা ঠেকাতে পারেনি কেন; এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, শত শত মানুষের সামনে ঘটনাটি ঘটেছে। কারা জড়িত, প্রশাসন তা জানে। তার অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেও সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি দেখে চলে যায়।

তিনি বলেন, এখানে ছোট ছোট শিশুদের টিকা দেওয়া হয়, গর্ভবতী মায়েরা সেবা নিতে আসেন। সাধারণ মানুষ বড় হাসপাতালে যেতে পারেন না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কর্মীরা মমতার সঙ্গে সেবা দেওয়ায় এটি মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল।

আব্দুল লতিফ বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা বিরল। এখানে হামের টিকাও দেওয়া হতো। তার অভিযোগ, জায়গাটি দখল করে দোকান নির্মাণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের স্বার্থেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, দলীয় লোকজন থেকে শুরু করে প্রশাসন সবাই জানে। এখন ভাঙার পর সবাই যেন সাধু।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আশপাশের কিছু ব্যবসায়ীও ভাঙচুরের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস করা হয়েছে।

কারা এই ‘সমমনা ব্যবসায়ী পরিষদ’?

হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গায় ‘সমমনা ব্যবসায়ী পরিষদ লিমিটেড’-এর ব্যানার টাঙানো হয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এতদিন যে সংগঠনের নাম তারা শোনেননি, সেই সংগঠন হঠাৎ এসে ৫০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস করার পর জায়গাটির মালিকানা দাবি করল কীভাবে?

ভাঙচুর শেষে ব্যানারও টানিয়ে দেওয়া হয়। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠনটির সভাপতি মিজান মিয়া এবং সেক্রেটারি হাজরা। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপে টাঙানো ব্যানারে সংগঠনটির ঠিকানা হিসেবে বৈশাখী মার্কেটের নাম দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের বিপরীতে ওই মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষের সামনে ‘সমমনা ব্যবসায়ী পরিষদ’-এর ছোট সাইনবোর্ডও দেখা গেছে। তবে অফিসটি বন্ধ ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, খুব বেশিদিন হয়নি তারা ওই সাইনবোর্ড দেখেছেন। মিজান মিয়া ও হাজরা নামের দুজন সংগঠনটি পরিচালনা করেন। তাদের দাবি, সমিতির নামে চাঁদাও তোলা হয় এবং মার্কেটের সামনের ফুটপাত থেকেও টাকা সংগ্রহ করা হয়।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সংগঠনটির সঙ্গে থাকা কয়েকজন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ওই জায়গা নিয়ে আইনি জটিলতা থাকলেও ৫০ বছর ধরে সেখানে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছিল। মার্কেট প্রতিষ্ঠার আগেও প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ছিল।

মার্কেটের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ১০ কাঠার প্লটটি দখলের উদ্দেশ্যেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন ধীরে ধীরে জায়গাটি দখল করে সেখানে মার্কেট নির্মাণ এবং কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করার চেষ্টা হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

কমিশনারের চোখেও ছয় ঘণ্টার ঘটনা

শনিবার দুপুরে রাড্ডার ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শনে আসেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভাঙচুর ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মিরপুরে স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে ভাঙচুর। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পুলিশের কোনো সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাস্থলের পাশে থানা থাকা সত্ত্বেও কেন তা ঠেকানো গেলো না; এ প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, গভীর রাতে ঘটনা ঘটেছে। জানার পর পুলিশ সময়মতো ঘটনাস্থলে এসেছিল কি না এবং পুলিশের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় দারুসসালাম জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সালেহ্ মুহম্মদ জাকারিয়াকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেবে। এরপর পুলিশের কারও অবহেলা বা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাস্থল দেখে কমিশনার বলেন, তার কাছে মনে হয়েছে, এ কাজ আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টায় সম্ভব নয়; সময় নিয়েই ভাঙচুর করা হয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার জানান, ঘটনাটি জানার পর তিনি মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনারকে নির্দেশনা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে নির্দেশনা রয়েছে। মামলায় একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

হামলার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পুলিশ কোনো দল বা মত দেখবে না, অপরাধীকে দেখবে। যে অপরাধ করবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো বেআইনি কার্যক্রম বা দখল কেউ করতে পারবে না।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, তবু টিকা দিতে এলেন মা-শিশুরা

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শনিবার আর বসার জায়গা ছিল না। তারপরও টিকা নিতে আসা মা ও শিশুদের ফিরিয়ে দেননি স্বাস্থ্যকর্মীরা। স্বাস্থ্যকর্মীরা পূর্ব পাশের গেটে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে সেবা দেন। প্রায় একশর বেশি মা ও শিশু সেখানে আসে।

বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন সংসদ সদস্য সানজিদা আক্তার তুলি। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা কারও কাম্য নয়। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে এবং তারা তাদের ওপর আস্থা রাখতে চান।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সংসদ সদস্য তুলি। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে মা ও শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি চলে, তাই এটি বন্ধ করা যাবে না। আপাতত বসার ব্যবস্থা না থাকায় মিরপুর-১-এর তার কার্যালয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের বসার ব্যবস্থা করার কথা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। গরমের মধ্যে সেখানে ফ্যানেরও ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান তিনি।

জড়িতরা যে দলেরই হোক, দল বিবেচনা করা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে যা ঘটেছে তা বড় অপরাধ এবং এর শাস্তি হবে।

এদিকে ধ্বংসযজ্ঞের পর শনিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। সেখানে প্রায় ছয়জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তারা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তারা সেখানে এসেছেন।

৫০ বছরের পুরোনো যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে প্রতিদিন শত শত মা ও শিশু কম খরচে চিকিৎসা ও টিকা নিতে আসতেন, রাতভর ভাঙচুরের পর সেখানে এখন পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। আর সেই ধ্বংসস্তূপের পাশেই শনিবারও অপেক্ষা করেছেন টিকা নিতে আসা মা ও শিশুরা।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
বিমানবন্দরে হারানো ব্যাগ ফিরে পেলেন যাত্রী, ভেতরে ছিল যা
জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৮০, চলছে যাচাই-বাছাই: পুলিশ
মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর: গাফিলতি ছিল কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে
সর্বশেষ খবর
কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ কয়েদির মৃত্যু
কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ কয়েদির মৃত্যু
সিঙ্গাপুর ম্যাচের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ
সিঙ্গাপুর ম্যাচের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ
বিমানবন্দরে হারানো ব্যাগ ফিরে পেলেন যাত্রী, ভেতরে ছিল যা
বিমানবন্দরে হারানো ব্যাগ ফিরে পেলেন যাত্রী, ভেতরে ছিল যা
সচিব পরিচয়ে কম দামে জমি বিক্রির কথা বলে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ
সচিব পরিচয়ে কম দামে জমি বিক্রির কথা বলে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ
সর্বাধিক পঠিত
অবিবাহিত দিবস: একা আছি, বেশ আছি!
অবিবাহিত দিবস: একা আছি, বেশ আছি!
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত
পুলিশের নতুন ইউনিট গঠনের ঘোষণা, শাখা থাকবে যেসব এলাকায়
পুলিশের নতুন ইউনিট গঠনের ঘোষণা, শাখা থাকবে যেসব এলাকায়
দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না?
হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না?