অপরাধ চক্রের ‘রাঘববোয়ালেরা’ থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

সুজন কৈরী
১০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০১ আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০১

কেউ অর্থের জোগান দেন, কিন্তু ঘটনাস্থলে থাকেন না। কেউ সীমান্তের ওপার থেকে চালান নিয়ন্ত্রণ করেন। কেউ মাঠপর্যায়ের কয়েকটি স্তর ব্যবহার করে মাদক, চাঁদাবাজি কিংবা অন্য সংঘবদ্ধ অপরাধ পরিচালনা করেন। আবার কেউবা স্থানীয় প্রভাব বলয়, কিংবা প্রযুক্তির আড়ালে থেকে অপরাধ চালিয়ে যান। কেউ টার্গেট কিলিংয়ের নির্দেশ দেন, থাকেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তাদের হয়ে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত খুনি, চোরাচালান পণ্যের বাহক, খুচরা কারবারি কিংবা মাঠপর্যায়ের সহযোগীরা। কিন্তু অপরাধের নেপথ্যের নির্দেশদাতা, অর্থদাতা ও নিয়ন্ত্রকরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। যাদের বলা হয় ‘বড় ভাই’, ‘গডফাদার’ কিংবা ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’।

দেশজুড়ে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, গ্রেফতার ও বিশেষ অভিযানের মধ্যেও এমন চিত্র সামনে আসছে। তবে ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা অপরাধী’ নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একক কোনও শ্রেণিবিন্যাস নেই। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা, অপরাধ তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট তথ্য এবং অপরাধ বিশ্লেষকের বক্তব্য পর্যালোচনায় প্রধানত পাঁচ ধরনের অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এদের মধ্যে অপরাধের অর্থদাতা, সীমান্তভিত্তিক চোরাকারবারি, পাইকার ও মূল নিয়ন্ত্রক, স্থানীয় প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক এবং সাইবার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীচক্র।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু পলাতক আসামির নয়, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের দৃশ্যমান অংশের সঙ্গে নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীর সরাসরি যোগাযোগ থাকে না। মাঝখানে একাধিক ব্যক্তি বা স্তর ব্যবহার করায় মাঠের অপরাধী ধরা পড়লেও তদন্তের পথ ধরে ওপরের স্তরে পৌঁছানো তদন্ত- সংশ্লিষ্টদের অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

অপরাধের প্রথম স্তরে রয়েছেন অর্থদাতারা। সংঘবদ্ধ অপরাধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, অস্ত্র বা অন্যান্য উপকরণের জোগান দিলেও তারা সাধারণত ঘটনাস্থলে থাকেন না। ফলে সরাসরি অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণে আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগের সূত্র অনুসরণ করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, সীমান্তভিত্তিক চোরাকারবারি। মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশের পর স্থানীয় বাহক ও একাধিক মধ্যস্থতাকারীর হাত বদল হয়। সীমান্তের ওপারে অবস্থানকারী নিয়ন্ত্রক কিংবা দেশের ভেতরে থেকে চালান সমন্বয়কারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার তুলনামূলক জটিল হয়ে ওঠে।

তৃতীয় ধাপে রয়েছেন পাইকার, নির্দেশদাতা ও মূল হোতারা। তারা সরাসরি অপরাধ না করে নিচের স্তরের লোকজন ব্যবহার করেন। মাদক বেচাকেনা, চাঁদাবাজি, দখল, হত্যাকাণ্ড কিংবা অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধে এই বহুস্তরীয় কাঠামো তদন্তকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

চতুর্থত, স্থানীয় নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনও কোনও এলাকায় অপরাধীচক্র স্থানীয় প্রভাব, অর্থ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। যারা সাধারণত কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে।

এছাড়া দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সাইবার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীচক্র। ভুয়া পরিচয়, একাধিক ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, অনলাইন যোগাযোগ এবং দেশের বাইরে থাকা ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহারের কারণে এসব অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত মূল ব্যক্তিকে শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন।

পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে সহিংস অপরাধ, কিশোর গ্যাং, সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট ও ডিজিটাল জালিয়াতিকে দেশের আইনশৃঙ্খলার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ ব্যবস্থাপনা শাখার ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটিটি গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে।

‘কেউ গ্রেফতার, কেউ পলাতক’

মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজধানীর আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা প্রতিদিনই নানা ধরনের অপরাধীদের গ্রেফতার করি। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু জামিনে বের হয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘অনেক অপরাধী মনে করেন, তাদের বড়ো ভাই বা আশ্রয়দাতা আছে। তাছাড়া এছাড়া মনেপ্রাণে অপরাধ প্রবণতা কাজ করায় তারা আর ভালো হতে পারে না।’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমার থানা এলাকাতেও চিহ্নিত কিছু অপরাধী রয়েছে। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছে। আবার কেউ কেউ পলাতক। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’’

পুলিশ সদর দফতরের সাম্প্রতিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাগুলোতেও পলাতক আসামির গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার তদন্ত ও বিচার অগ্রগতি এবং সাজা হওয়ার হার পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে প্রভাবশালী কেউ রয়েছে কিনা, সেই তথ্য সংগ্রহেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘দেশে থাকলে আজ হোক কাল ধরা পড়বে’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে চিহ্নিত ও তালিকাভুক্তসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধী গ্রেফতার হচ্ছে। তারপরও অনেক অপরাধী দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে ডিএমপি কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সব অপরাধীকেই আইনের আওতায় আনতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অনেক অপরাধী গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বা আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করে। তারপরও আমরা নিয়মিতভাবে অনেক অপরাধীকে গ্রেফতার করছি। কাউকে আজ ধরা সম্ভব না হলে কাল কিংবা পরশু ধরা হবে। আগে বা পরে তাকে ধরা পড়তেই হবে। ধরাছোঁয়ার বাইরে কেউ থাকার সুযোগ নেই।’’

তিনি বলেন, ‘‘তবে কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করলে তাকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে।’’

নতুন চ্যালেঞ্জ সাইবার অপরাধী

প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে নতুন ধরনের অপরাধীকে হাজির করেছে। গত ১ অক্টোবর স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ চালু করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। অনুমোদিত কাঠামোয় ইউনিটটির জনবল ৪ হাজার ৫৯২। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায় পর্যন্ত সাইবার অপরাধে সেবা ও তদন্তের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত অপরাধে একজন আসামির অবস্থান বা পরিচয় শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হলেও সাইবার অপরাধে অপরাধী এক জেলায় বসে অন্য জেলার মানুষকে প্রতারণা করতে পারে, এমনকি দেশের বাইরেও থাকতে পারে। ফলে ডিজিটাল ফরেনসিক, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় ছাড়া মূল হোতার কাছে পৌঁছানো কঠিন।

‘শুধু মাঠের অপরাধী নয়, পুরো চেইন ধরতে হবে’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সাধারণত যেসব অপরাধীর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন বা প্রশাসনের ভেতরে যোগাযোগ থাকে, তারাই বেশি সময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাহক বা ছোট অপরাধীরা ধরা পড়ে, কিন্তু নির্দেশদাতা, অর্থদাতা, গডফাদার কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা আড়ালে বা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘বিশেষ করে চাঁদাবাজি, দখল, মাদক, পরিবহন খাতের অবৈধ নিয়ন্ত্রণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধে একটি স্তরভিত্তিক নেটওয়ার্ক থাকে। এই নেটওয়ার্কের ওপরের স্তরের ব্যক্তিরা সরাসরি অপরাধে দৃশ্যমান না থাকায় এবং প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা থাকায় অনেক সময় আইনের আওতায় আসতে দেরি হয়।’’

তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘‘অপরাধ দমনে শুধু ঘটনাস্থলের অপরাধীকে ধরলে হবে না, কার নির্দেশে অপরাধ হচ্ছে, কারা অর্থ দিচ্ছে, কারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুরক্ষা দিচ্ছে এবং কারা এর সুবিধাভোগী, এই পুরো চেইনকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে।’’

আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কতজন অপরাধী গ্রেফতার হচ্ছে, সেটি নয়। একটি অপরাধের তদন্ত বাহক বা মাঠপর্যায়ের অপরাধী থেকে অর্থদাতা, নির্দেশদাতা, নিয়ন্ত্রক ও সুবিধাভোগী পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কিনা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নির্ধারণে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই ‘ওপরের স্তর’ পর্যন্ত পৌঁছাতে আর্থিক অনুসন্ধান, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় এবং আন্তঃসংস্থা সহযোগিতাকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

/জেইউ/এপিএইচ/ইউএস/
সম্পর্কিত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
পুলিশ চলে যেতেই বাড়িতে হামলা-লুট, স্বামীকে বাঁচাতে হামলাকারীদের পা ধরেন স্ত্রী
বাধা দিতেই ছুরিকাঘাত, পুলিশ পরিদর্শকের মোবাইল-টাকা লুট
সর্বশেষ খবর
দ্রুতই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস রোসাটমের
দ্রুতই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস রোসাটমের
ভারতের ২৪৯ রান টপকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবিশ্বাস্য জয়
ভারতের ২৪৯ রান টপকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবিশ্বাস্য জয়
স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস আজ
স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস আজ
বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলাম তোরে, ফুলের টোকাও লাগতে দিইনি মা
বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলাম তোরে, ফুলের টোকাও লাগতে দিইনি মা
সর্বাধিক পঠিত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম তৈরি কেএনএফের, ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা
১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম তৈরি কেএনএফের, ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা