শ্রমিক আন্দোলন দমনে সেই পুরোনো পথেই পুলিশ?

জামাল উদ্দিন ও সুজন কৈরী
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০১ আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০১

আগে শ্রমিক আন্দোলন কিংবা শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার পেছনে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হতো। এখন একই ধরনের পরিস্থিতিতে সামনে আসছে দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নাম। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত পক্ষের পরিচয়ও বদলেছে। কিন্তু শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলে কতটা পরিবর্তন এসেছে?

ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের ব্যবহার, হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা এবং আন্দোলনের নেপথ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পুরোনো প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। শ্রমিক আন্দোলনে সত্যিই কি রাজনৈতিক অপশক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, নাকি শ্রমিকদের প্রকৃত অসন্তোষের চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?

এই বিতর্কের কেন্দ্রে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি। বর্তমানে সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এ দাবিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দুই দিন ধরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে। ঘটেছে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে। এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে নতুন মজুরি বোর্ড।

সোমবার মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

সোমবার (২ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছেন, চলমান সহিংসতার নেপথ্যে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও শিল্পমালিক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার দাবিও করেছেন তিনি। তবে ব্রিফিংয়ে অভিযুক্ত শিল্পমালিকদের পরিচয়, সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

২০২৩ সালে বিএনপি, ২০২৬ সালে আওয়ামী লীগ

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে অভিযোগ তোলার ঘটনা নতুন নয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরেও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল।

২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অভিযোগ করেছিলেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে বিএনপি উসকানি দিচ্ছে। সে সময় তিনি দাবি করেন, গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কুষ্টিয়ার এক বিএনপি নেতা শ্রমিকদের আন্দোলনে উৎসাহিত করছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথাও জানান তিনি। একই বছরের ১০ নভেম্বর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে বিএনপি ও তাদের সহযোগীদের ইন্ধনের অভিযোগ তুলেছিলেন।

সোমবার মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে একজনকে আটক কয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

তখন সরকারের বক্তব্য ছিল, প্রকৃত শ্রমিকরা নিজেদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করতে চান না। একটি রাজনৈতিক মহল শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছিল। তিন বছর পর বর্তমান সরকারের বক্তব্যেও প্রায় একই ধরনের ভাষা শোনা যাচ্ছে। তবে এবার অভিযুক্ত রাজনৈতিক পক্ষ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা।

সোমবার (২ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিগত কয়েক দিন ধরে একটি পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিক ভাইবোনদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। এর পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতায় কিছু শিল্পমালিকও জড়িত। তাদের কেউ বিগত সরকারের সময় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের কেউ কেউ এসব ঘটনার পেছনে কাজ করছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে এবং সেসব তথ্যের প্রমাণও পাওয়া গেছে। সহিংসতার ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ দাবি করেছে, মিরপুরের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী শ্রমিক পরিচয়ে অংশ নিয়ে সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

মামলায় হাজার হাজার অজ্ঞাত আসামি

শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার ঘটনাও নতুন নয়। ২০২৩ সালের পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ৩৫টি ফৌজদারি মামলায় ১৬১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আনুমানিক ৪৪ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের মামলা শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যে গ্রেফতার ও হয়রানির আশঙ্কা তৈরি করে।

সোমবার শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে সাভার এলাকায় পুলিশ সদস্যরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর পর্যন্ত মিরপুরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় চারটি মামলায় প্রায় ১০ হাজার ৫০০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মিরপুরের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা এবং ২৯ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানায়।

অন্যদিকে গাজীপুরে তিনটি মামলায় প্রায় চার হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার দুটি করেছে শিল্প পুলিশ এবং একটি গাজীপুর মহানগর পুলিশ। সেখানে অন্তত ৩০ জনকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে। এত বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নিরপরাধ শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্দোলনে ‘তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন’ দেখছে পুলিশও

সরকারের দায়িত্বশীলদের মতো এই শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পেছনে ‘তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন’ এবং ‘দেশি-বিদেশি চক্রান্ত’ দেখছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। সোমবার (২ নভেম্বর) বিকালে সাভারে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড কার্যক্রমও শুরু করেছে। এরপরও যারা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, তাদের কর্মকাণ্ডকে শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে এবং পেছনে থাকা ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে অনেক বিশৃঙ্খলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কথা বলছেন ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান

এসময় ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, আন্দোলনের মধ্যে হেলমেট ও মুখোশ পরা কিছু ব্যক্তি ভাঙচুর ও সহিংসতায় জড়িয়েছেন। তাদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তার দাবি, শ্রমিকদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে কিছু দুষ্কৃতকারী শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা কী?

সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে কালিয়াকৈর উপজেলার শফিপুর, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ এবং গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও সালনা এলাকায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং মহাসড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে পৌঁছে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। 

একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে কোনাবাড়ীতে একটি পুলিশ বক্সে এবং পল্লী বিদ্যুৎ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।

একইভাবে সকাল থেকে সাভারেও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তারা বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে এসে জড়ো হন। এ সময় নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, টাউজার লাইন, অনন্ত গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় রবিবারের মতো সোমবারও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরে শ্রমিকরা সড়কে এসে অবস্থান নিলে পুলিশ বাধা দেয়। 

সোমবার নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের বিক্ষোভ

এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তখন পুলিশ শ্রমিকদের সরাতে টিয়ারশেল ছোড়ে। এতে শ্রমিকরা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করেন। শ্রমিক-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে থমথমে অবস্থা সৃষ্টি হয়।

চলমান বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পোশাকশিল্পে বিভিন্ন অঞ্চল ও ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের শ্রমিকরা কাজ করেন। শ্রমিক সংগঠনও রয়েছে অনেক। তাদের প্রত্যেকের দাবি ও অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। ফলে অনেক সময় আন্দোলন সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয় না। একপর্যায়ে কিছু ব্যক্তি কারখানার ফটকে ধাক্কাধাক্কি, ভাঙচুর কিংবা ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন।’

সহিংসতায় পুলিশের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত দুই দিনের ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। ইটপাটকেলের আঘাতে আহত সদস্যদের কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া ডিএমপি ও গাজীপুর মহানগর পুলিশের পিকআপসহ কয়েকটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট দল মূল্যায়ন করে তা নির্ধারণ করবে।’

মামলার বিষয়ে ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সাধারণত পুলিশের গাড়ি, কারখানার ফটক কিংবা অন্য কোনও সম্পদের ক্ষতিসাধন হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এসব ঘটনায় আইন অনুযায়ী মামলা করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

আশুলিয়ার বহু কারখানায় ছুটি ঘোষণা

শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের নয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে সদস্যরা শিল্পকারখানাগুলোর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সদর দফতর থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।’

শ্রমিকদের দাবি কী?

চলমান আন্দোলনের মূল দাবি ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে বর্তমান মজুরির পার্থক্য ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। এর পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও চাকরির নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবিগুলোরও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।

এদিকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদের নাম পেতে সময় লাগায় বোর্ড গঠনে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও শিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সহানুভূতিশীলভাবে নতুন মজুরি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি উদ্যোগের মধ্যেও আন্দোলন অব্যাহত থাকার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একটি মহল সহিংসতা সৃষ্টি করছে।

শ্রমিক নেতারা কী বলছেন?

সোমবার (২ নভেম্বর) বিকালে সচিবালয়ে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রমিকদের অবিলম্বে কাজে ফেরার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিক কিংবা দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছু ব্যক্তি শ্রমিক পরিচয়ে আন্দোলনস্থলে প্রবেশ করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে সহিংসতার ঘটনায় কোনও নিরপরাধ শ্রমিক বা শ্রমিক নেতা গ্রেফতার হয়ে থাকলে তাদের আইনানুগ মুক্তির বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন তিনি।

ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং নবগঠিত মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ধর্মঘট কিংবা কারখানা বন্ধের কোনও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। বরং কিছু বহিরাগত কারখানায় ঢিল ছুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে।

বাবুল আক্তারের মতে, শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মূল দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন। সরকার সেই দাবি অনুযায়ী বোর্ড গঠন করেছে। এখন বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব তুলে ধরা হবে। তিনি শ্রমিকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ডিসেম্বরের মধ্যে যৌক্তিক নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আশা প্রকাশ করেন।

আগাম তথ্য থাকার পরও কেন সংঘাত?

শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতার বিষয়ে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ১৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়কে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল।

সাভারে শ্রমিকদের বিক্ষোভ

আগাম তথ্য থাকার পরও কেন শিল্পাঞ্চলে সংঘাত এড়ানো গেলো না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি ছিল। শ্রমমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নাম আগে পাওয়া গেলে মজুরি বোর্ডও আরও আগে গঠন করা সম্ভব হতো।’

তিনি জানান, পোশাকশিল্প এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে পুলিশ সদর দফতরে বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং পুলিশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ফোকাল পয়েন্টও নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘সুরক্ষা’ অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান ও ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতীতে যেকোনও আন্দোলন বা অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সংশ্লিষ্টতা খোঁজার প্রবণতা ছিল। এখন একই ধরনের অভিযোগ ভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে উঠছে। এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন বা অনুপ্রবেশের অভিযোগ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। তবে সেটি সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের নামে নির্বিচারে বলপ্রয়োগ কিংবা বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হলে নিরপরাধ শ্রমিকদের হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার বদলের সঙ্গে পুলিশের আচরণও বদলাবে, এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিক। কিন্তু পুরোনো কৌশল অব্যাহত থাকলে পুলিশ সংস্কারের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

/ইউএস/
সম্পর্কিত
‘যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, তাদের আন্দোলনকারী হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ’
শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত-নিহতের খবর গুজব, কোনও সংঘাতে জড়ায়নি বলছে পুলিশ
রাজধানীতে বাসের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
সর্বশেষ খবর
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন ম্যাক্সওয়েল
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন ম্যাক্সওয়েল
‘যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, তাদের আন্দোলনকারী হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ’
‘যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, তাদের আন্দোলনকারী হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ’
রূপগঞ্জে এয়ার কমপ্রেসর বিস্ফোরণে ৪ জন দগ্ধ
রূপগঞ্জে এয়ার কমপ্রেসর বিস্ফোরণে ৪ জন দগ্ধ
জেলহত্যা দিবস আজ  
জেলহত্যা দিবস আজ  
সর্বাধিক পঠিত
সিএনজি অটোরিকশায় ব্যানার লাগিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে মাইকিং
সিএনজি অটোরিকশায় ব্যানার লাগিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে মাইকিং
অনুর্বর জমিতে ৩০ দিনেই ফুটলো জাফরান, লাদাখে কৃষির নতুন সম্ভাবনা
অনুর্বর জমিতে ৩০ দিনেই ফুটলো জাফরান, লাদাখে কৃষির নতুন সম্ভাবনা
নিষেধাজ্ঞার সুফল কই, কেন এত কমলো ইলিশের উৎপাদন
নিষেধাজ্ঞার সুফল কই, কেন এত কমলো ইলিশের উৎপাদন
এক মাসের ব্যবধানে আবারও বাড়লো এলপিজির দাম
এক মাসের ব্যবধানে আবারও বাড়লো এলপিজির দাম
বরিশালে বাস ধর্মঘটে ভোগান্তিতে যাত্রীরা
বরিশালে বাস ধর্মঘটে ভোগান্তিতে যাত্রীরা