নবজাতককে গোসল করাতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল কোমর বা নিতম্বের কাছে নীলচে-ধূসর একটি দাগ। দেখতে অনেকটা কালশিটের মতো। কোথাও দাগটি ছোট, কোথাও আবার বেশ বড়। তখন স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মায়ের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—শিশুটি কি কোথাও আঘাত পেয়েছে?
সব সময় তা নয়। এমন দাগের একটি পরিচিত কারণ হলো মঙ্গোলিয়ান স্পট বা কনজেনিটাল ডার্মাল মেলানোসাইটোসিস। এটি সাধারণত জন্মের সময় বা জন্মের পরপরই দেখা যায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয়।
দাগটি নীলচে দেখায় কেন?
এই দাগের সঙ্গে ত্বকের রঞ্জক কোষ বা মেলানোসাইটের সম্পর্ক রয়েছে।
ভ্রূণের বিকাশের সময় মেলানোসাইট নামের কোষগুলো ত্বকের নির্দিষ্ট স্তরে অবস্থান নেয়। কিছু ক্ষেত্রে এসব কোষ ত্বকের গভীর স্তর ডার্মিসে থেকে যায়। সেখানে রঞ্জক জমে থাকার কারণে ত্বকের ওপর নীলচে বা নীল-ধূসর ছোপ দেখা যায়।
ত্বকের গভীরে রঞ্জক থাকার কারণেই দাগটির এমন নীল বা ধূসর রং দেখা যায়। তাই দেখতে কালশিটের মতো হলেও এটি কোনও আঘাতের দাগ নয়।
কোথায় বেশি দেখা যায়?
মঙ্গোলিয়ান স্পট সবচেয়ে বেশি দেখা যায় শিশুর কোমরের নিচের অংশ, মেরুদণ্ডের গোড়া ও নিতম্বে। তবে পিঠ, কাঁধ, হাত-পাসহ শরীরের অন্য জায়গাতেও এটি দেখা যেতে পারে।
দাগটি সাধারণত সমতল থাকে এবং ত্বকের পুরুত্ব বা গঠনে পরিবর্তন আনে না। মূল পরিবর্তনটি হয় ত্বকের রঙে। এর আকার কয়েক সেন্টিমিটার হতে পারে, আবার কিছু দাগ তুলনামূলক বড়ও হয়।
শিশুর জন্য কি বিপজ্জনক?
সাধারণ মঙ্গোলিয়ান স্পট ক্ষতিকর নয়। এটি কোনও সংক্রমণ নয় এবং সাধারণত ব্যথা বা অস্বস্তিও সৃষ্টি করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক শিশুর দাগ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। কারও ক্ষেত্রে শৈশবেই এটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে একই হারে দাগ মিলিয়ে যায় না; কিছু ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিনও থেকে যেতে পারে।
কেন কিছু শিশুর মধ্যে বেশি দেখা যায়?
মঙ্গোলিয়ান স্পট বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিশুর মধ্যেই দেখা যেতে পারে। তবে কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি সাধারণ।
তাই কোনও শিশুর শরীরে এমন দাগ থাকাকে অস্বাভাবিক বা রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখার কারণ নেই।
কালশিটে ভেবে ভুল হতে পারে
মঙ্গোলিয়ান স্পটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি দেখতে অনেকটা আঘাতের দাগের মতো হতে পারে। বিশেষ করে শিশুর শরীরের এমন জায়গায় দাগটি থাকলে, যেখানে আঘাতের কালশিটে দেখা যেতে পারে, সেখানে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থাকে।
তাই শিশুর জন্মের পর এমন দাগ চোখে পড়লে চিকিৎসককে বিষয়টি জানিয়ে রাখা ভালো। প্রয়োজনে শিশুর মেডিকেল রেকর্ডে দাগটির উল্লেখ বা ছবি সংরক্ষণ করাও কাজে লাগতে পারে। এতে ভবিষ্যতে দাগটিকে নতুন কোনো আঘাত হিসেবে ভুল বোঝার সম্ভাবনা কমে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মঙ্গোলিয়ান স্পট সাধারণত চিকিৎসার বিষয় নয়। তবে শিশুর শরীরে কোনো নতুন বা অস্বাভাবিক দাগ দেখা দিলে সেটিকে নিজে থেকেই মঙ্গোলিয়ান স্পট ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
দাগটি যদি জন্মের সময় না থাকে, দ্রুত পরিবর্তিত হয়, ব্যথা বা চুলকানি তৈরি করে, রক্তপাত হয়, ত্বকের গঠন বদলে যায় কিংবা অন্য কোনো উপসর্গের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকিৎসক সাধারণত শিশুর ত্বক পরীক্ষা করেই দাগটির ধরন সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন। প্রয়োজন হলে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শও দিতে পারেন।
‘মঙ্গোলিয়ান স্পট’ নামটি কেন?
‘মঙ্গোলিয়ান স্পট’ নামটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে কনজেনিটাল ডার্মাল মেলানোসাইটোসিস নামটি এই অবস্থাকে আরও নির্ভুলভাবে বর্ণনা করে।
তাই শিশুর কোমর বা নিতম্বে নীলচে-ধূসর দাগ দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি শরীরের একটি নিরীহ জন্মদাগ, যা সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ফিকে হয়ে যেতে পারে। তবে দাগটি কী, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলে শিশুর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।









