হঠাৎ করেই যেন কেমন বিষণ্ণ লাগছে, কেমন একটা মন খারাপের মতো অনুভূতি। নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই অবসাদ জেঁকে বসেছে যেন। কাজে আগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে না, শীতের ঝরা পাতার মতোই নিজেকে লাগছে নিষ্প্রাণ। কেন এমন হচ্ছে জানেন?
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি)
এটি এক ধরনের সিজনাল ডিপ্রেশন, যাকে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি) বা উইন্টার ব্লুজও বলা হয়। ঋতু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের বিষণ্ণতা জেঁকে বসতে পারে। দুঃখের অনুভূতি, শক্তির অভাব, স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপে আগ্রহ হ্রাস, অতিরিক্ত ঘুমানো এবং ওজন বৃদ্ধি হতে পারে এই ধরনের অবসাদের কারণে।
শীতের সময় রুক্ষ হয়ে পড়ে প্রকৃতি। এই রুক্ষতা আমাদের মন খারাপ করিয়ে দেয়। এছাড়া শীতকালে দ্রুত দিন শেষ হয়ে যায়, হঠাৎ হঠাৎ কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। বাইরে বের হতে পোহাতে হয় নানা বিড়ম্বনা। সব মিলিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে আমাদের মনও। এক ধরনের আশ্চর্যজনক অবসাদে যেন আক্রান্ত হয়ে পড়ি আমরা।
উইন্টার ব্লুজের লক্ষণ
- দিনের বেশিরভাগ সময় বা প্রায় প্রতিদিন বিষণ্ণ লাগা।
- দুশ্চিন্তা।
- কার্বোহাইড্রেট তৃষ্ণা এবং ওজন বৃদ্ধি।
- চরম ক্লান্তি এবং শক্তির অভাব।
- আশাহীনতা বা মূল্যহীনতার অনুভূতি।
- মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া।
- বিরক্ত বা উত্তেজিত বোধ করা।
- অঙ্গ (হাত এবং পা) ভারী বোধ হওয়া
- সামাজিকতায় অনাগ্রহ এবং আনন্দদায়ক সব কাজে আগ্রহ হ্রাস।
- ঘুমের সমস্যা (সাধারণত অতিরিক্ত ঘুমানো)।
- মৃত্যু বা আত্মহত্যার চিন্তা।
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি) এর কারণ
- শীতকালে সূর্যের দেখা কম পাওয়া যায়। এতে আমাদের জৈবিক ঘড়ির পরিবর্তন হয়। এই অভ্যন্তরীণ ঘড়ি আমাদের মেজাজ, ঘুম এবং হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এটি স্থানান্তরিত হয়, তখন আমাদের প্রতিদিনের অভ্যস্ত সময়সূচী বদলে যায় এবং দিনের আলোর দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য করতে অসুবিধা হয়। এতে হতাশা বাড়ে আমাদের।
- মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা বিঘ্নিত হয়। নিউরোট্রান্সমিটার নামক মস্তিষ্কের রাসায়নিক স্নায়ুর মধ্যে যোগাযোগ পাঠায়। এই রাসায়নিকগুলোর মধ্যে রয়েছে সেরোটোনিন, যা খুশির অনুভূতি নিয়ে আসে। সূর্যের আলো সেরোটোনিন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, তাই শীতকালে সূর্যালোকের অভাবে আমাদের বিষণ্ণতা কাজ করে।
- ভিটামিন ডি এর ঘাটতির কারনেও হতে পারে উইন্টার ব্লুজ। কারণ সেরোটোনিনের মাত্রাও ভিটামিন ডি থেকে বৃদ্ধি পায়। যেহেতু সূর্যের আলো ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে, তাই শীতকালে কম রোদে ভিটামিন ডি-এর অভাব হতে পারে।
- মেলাটোনিন একটি রাসায়নিক যা ঘুম এবং আমাদের মনকে প্রভাবিত করে। সূর্যালোকের অভাব অনেক ক্ষেত্রে মেলাটোনিনের অতিরিক্ত উৎপাদনকে উদ্দীপিত করতে পারে। এতে শীতকালে অলস লাগতে পারে আমাদের।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
- ১৮ থেকে থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা উইন্টার ব্লুজের ঝুঁকিতে আছেন।
- মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্তরাও এই ধরনের অবস্থার ঝুঁকিতে থাকেন।
- এসএডি বা অন্যান্য বিষণ্ণতা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আত্মীয়দের মধ্যে থাকলে এর ঝুঁকি বাড়ে। সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগে আক্রান্তরাও উইন্টার ব্লুজের ঝুঁকিতে থাকেন।
- যারা মেঘলা অঞ্চলে থাকেন বা শীতপ্রধান দেশে থাকেন, তারা রয়েছেন এসএডির ঝুঁকিতে।
সমাধানে কী করবেন?
- বাইরে বেশি সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। ইচ্ছে না করলেও বাইরে যান। বেশি বেশি সময় কাটান দিনের আলোতে।
- অফিস বা বাসায় যেন পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বাসায় কাজ করলে ডেস্ক সেট করুন জানালার পাশে। অফিসের ডেস্কেও যেন দিনের আলো আসে সেই ব্যবস্থা করুন সম্ভব হলে।
- বন্ধু বা প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। শীতের আবহ উপভোগ করুন তাদের সঙ্গে। সবাই মিলে দলবেঁধে পিঠা খেতে বের হতে পারেন।
- শীতের সময়ে শরীরচর্চা করতে অনীহা বোধ করেন অনেকে। যে কারণে হরমোনের ক্ষরণ এবং কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। হরমোনের হেরফেরেও কিন্তু মনখারাপের তীব্রতা বাড়তে পারে। তাই চেষ্টা করুন নিয়মিত ব্যায়াম করতে।
- শীতের দিনে বাইরে যেতে ইচ্ছা না করলে অন্তত বিকেলের কিছুটা সময় ছাদে বা বারান্দায় কাটানোর চেষ্টা করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি ভিটামিন ডি সম্পূরক গ্রহণ করতে পারেন।
তথ্যসূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এবং মনোচিকিৎসক জান্নাতুল নাঈমা









