কল্পনা করুন, চারপাশ সচল, আপনি সবকিছু দেখছেন, কিন্তু আপনার নিজের মনে হচ্ছে—আপনি মৃত। এমন অদ্ভুত অনুভূতির কথা ভাবলেই ধাক্কা খাওয়ার কথা। কিন্তু কোটার্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষের বাস্তবতা ঠিক এমনই। এই বিরল মানসিক রোগে মানুষ নিজেকে জীবন্মৃত মনে করতে শুরু করে, কখনও কখনও তাদের শরীরের কোনও অংশ কাজ করছে না বলে ধরে নেয় তারা নিজেরাই।
কোটার্ড সিনড্রোম রোগের নাম এসেছে ফরাসি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ জুলস কোটার্ড-এর নামে। ১৮৮২ সালে তিনি প্রথমবার এই রোগের লক্ষণগুলি নোট করেন। কোটার্ড মূলত লক্ষ্য করেছিলেন যে কিছু রোগী বিশ্বাস করে তারা মৃত, অথচ তাদের শারীরিক অবস্থার কোনও সমস্যা নেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, কোটার্ড সিনড্রোমের উপসর্গ সিজোফ্রেনিয়া, বিষণ্ণতা এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার-এর রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এছাড়া কিছু বিরল ক্ষেত্রে ভাইরাস প্রতিরোধী ঔষধ, স্ট্রোক বা নিউরোলজিক্যাল সমস্যা এই উপসর্গকে প্রজ্বলিত করতে পারে।
তবে বিশ্বে কোটার্ড সিনড্রোমের প্রকৃত হার খুবই কম—মানসিক রোগীদের মধ্যে আনুমানিক ০ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে ০৫ শতাংশ। অর্থা,ৎ এটি একেবারে বিরল মানসিক রোগ। সাধারণ মানুষ বা মানসিক রোগে আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে এটি দেখা যায়।
লক্ষণ
কোটার্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত:
নিজের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, মনে করে মৃত;
মনে করে শরীরের কিছু অংশ কাজ করছে না, কখনও কখনও সম্পূর্ণ অকার্যকর;
আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকে, কারণ তারা মনে করে জীবিত থাকার অর্থ নেই;
খাবার-দাওয়া এড়িয়ে চলে, হাইজিন উপেক্ষা করে;
সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বন্ধু ও পরিবার থেকে দূরে থাকে;
মাঝে মাঝে ভীতিকর বা অদ্ভুত বিশ্বাস যেমন “আমার আত্মা চলে গেছে” বা “আমার রক্ত নেই” প্রকাশ পায়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ঝুঁকি
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতার ফলে রোগীর শারীরিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব পড়তে পারে;
খাবার না খাওয়ার কারণে পুষ্টিহীনতা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে;
সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মানসিক ও আবেগীয় চাপ আরও বৃদ্ধি পায়;
চিকিৎসা না নিলে আত্মহত্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
চিকিৎসা ও সমর্থন
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোটার্ড সিনড্রোম গুরুতর হলেও সঠিক চিকিৎসায় রোগী অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারে।
মানসিক রোগ ও বিষণ্ণতা প্রতিরোধী ঔষধ, মেজাজ স্থিতিশীল রাখার চিকিৎসা প্রয়োজনে ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।
তবে কোটার্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থতার জন্য পরিবার ও বন্ধুদের নিয়মিত সমর্থন ও ধৈর্যশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি।
পপ কালচারে কোটার্ড সিনড্রোম
কোটার্ড সিনড্রোমের ধারণা কিছু সিনেমায় ও গল্পে এসেছে। ২০০৭ সালের “The Machinist”-এ ক্রিস্টিয়ান বেল চরিত্রটি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে মানসিক বিভ্রান্তি অনুভব করে, যা কোটার্ড সিনড্রোমের ধারণার সঙ্গে মিল রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু সাই-ফাই বা থ্রিলার সিনেমা এই রোগের কনসেপ্ট থেকে অনুপ্রাণিত।
সচেতনতা জরুরি
পরিচিত কারো মধ্যে যদি এমন লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে অবহেলা না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো চিকিৎসা ও সমর্থনের মাধ্যমে রোগীর জীবনমান অনেক উন্নত করা সম্ভব।









