সড়কের পাশে দুর্ঘটনায় রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছেন একজন মানুষ। তাকে ঘিরে ভিড় জমেছে। কিন্তু ভিড়ের বেশিরভাগ মানুষের হাতেই মোবাইল ফোন। কেউ ভিডিও করছেন, কেউ লাইভে যাচ্ছেন, কেউ আবার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মধ্যেই হয়তো আহত মানুষটি সাহায্যের অপেক্ষায় ছটফট করছেন।
শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, আগুন লাগা, নদীতে কেউ ডুবে যাওয়া, কারও ওপর হামলা, কিংবা অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাতেও প্রায়ই একই দৃশ্য দেখা যায়। সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগে অনেকের হাত চলে যায় মোবাইল ফোনের দিকে। প্রশ্ন হলো, এমন কেন হয়?
মানুষ কি আগের চেয়ে কম সহানুভূতিশীল হয়ে যাচ্ছে? নাকি এর পেছনে কাজ করছে মানুষের আচরণ ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের আরও জটিল কোনো ব্যাখ্যা?
মনোবিজ্ঞানে একটি পরিচিত ধারণা আছে—‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’। এর মূল কথা হলো, কোনও বিপদে যত বেশি মানুষ উপস্থিত থাকে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে আসার প্রবণতা তত কমে যেতে পারে। কারণ প্রত্যেকে মনে করেন, অন্য কেউ হয়তো সাহায্য করবে। ফলে দায়িত্বটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে যায়, কিন্তু কাজটি করেন না কেউই।
এই প্রবণতা শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য না করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অফিসে অন্যায় আচরণ দেখেও অনেক মানুষ চুপ থাকেন। স্কুলে কাউকে নিপীড়নের শিকার হতে দেখেও অনেকে মুখ খোলেন না। কারণ তারা ভাবেন, ‘আমি না বললেও কেউ না কেউ নিশ্চয়ই বলবে।’
কিন্তু মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই আচরণে যুক্ত হয়েছে নতুন আরেকটি মাত্রা। আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায় সবকিছুই নথিবদ্ধ করতে চাই।
খাবার থেকে ভ্রমণ, আনন্দ থেকে দুর্ঘটনা—সবকিছুই ক্যামেরাবন্দি হচ্ছে। ফলে অনেক সময় মানুষ অবচেতনভাবেই প্রত্যক্ষদর্শীর চেয়ে দর্শক হয়ে ওঠেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও তারা যেন পর্দার আড়াল থেকে ঘটনা দেখছেন।
গবেষকেরা বলছেন, ক্যামেরা হাতে নেওয়ার মুহূর্তে মানুষের মনোযোগ অনেক সময় পরিস্থিতি মোকাবিলার বদলে সেটি ধারণ করার দিকে সরে যায়। তখন ‘আমি কীভাবে সাহায্য করবো’ প্রশ্নটির জায়গা দখল করে নেয় ‘আমি কীভাবে এটা রেকর্ড করবো’।
অবশ্য সব ভিডিও ধারণই যে খারাপ, তা নয়।
কোনও অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ, উদ্ধারকর্মীদের জন্য তথ্য সংগ্রহ কিংবা ঘটনার নথি রাখার ক্ষেত্রে ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন একজন মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন, তখন প্রথম দায়িত্বটা কী? ভিডিও করা, নাকি সাহায্য চাওয়া?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত সাহায্যের ব্যবস্থা করা। অ্যাম্বুলেন্স ডাকা, আশপাশের মানুষকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা—এসবের গুরুত্ব ভিডিও ধারণের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ একটি ভিডিও হয়তো লাখো মানুষ দেখবে। কিন্তু সময়মতো সাহায্য না পেলে একজন মানুষ হয়তো আর কখনও সেই ভিডিও দেখার সুযোগই পাবেন না।
প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে একটি ঘটনাকে কোটি মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতাও দিয়েছে।
কিন্তু সেই ক্ষমতা যদি আমাদের মানবিকতাকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়— কোনও মানুষ বিপদে পড়লে আমরা কি তার পাশে দাঁড়াবো, নাকি তার শেষ মুহূর্তের দর্শক হয়ে থাকবো? কারণ ইতিহাস খুব কমই মনে রাখে কে ভিডিও করেছিলেন।
কিন্তু একজন মানুষ বেঁচে গেলে, তিনি হয়তো সারাজীবন মনে রাখবেন—সেদিন কে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।








