‘লক্করঝক্কর’ বাসের শহরে চলবে ২৫০০ কোটির ইলেকট্রিক বাস 

আতিক হাসান শুভ
২১ জুন ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ১০:৪৬

রাজধানীবাসীর ভোগান্তি কমাতে এবং বায়ুদূষণ রোধে এবার ঢাকায় ইলেকট্রিক (বিদ্যুৎ-চালিত) বাস নামানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বায়ুর গুণগত মান ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন এবং পরিবহন খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

নগরবাসী বলেছেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস চালু করার উদ্যোগ ইতিবাচক। পরিবেশ রক্ষায় এটি নিঃসন্দেহে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তবে পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন লক্করঝক্কর বাসের সঙ্গে ইলেকট্রিক বাসের পাল্লা দিয়ে চলা বড্ড বেমানান। তাই ইলেকট্রিক বাস চলাচলের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে রাজধানীর গণপরিবহনের বেহাল দশা সংশোধন করা জরুরি। একইসঙ্গে ঢাকায় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতেও জোর দেওয়ার দাবি তাদের।

পুরোনো বাসের জায়গায় ইলেকট্রিক বাস প্রতিস্থাপন

রাজধানীতে যত পুরোনো বা লক্করঝক্কর বাস রয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে পুরোনো বাসগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন বাস চলাচলে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও ভাবছে সরকার।

পুরোনো বাস প্রতিস্থাপন কীভাবে হবে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে— রাজধানী থেকে পুরোনো বাস সরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু ধরেই তো তা সম্ভব নয়। এ নিয়ে আবার বাস মালিকদের তোপের মুখে পড়তে হবে। তাই ধীরে ধীরে এ কাজ করা হবে। মানুষ যখন আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা পাবে, তখন এমনিতেই পুরোনো জিনিস বাদ দেবে। সরকারের পক্ষ থেকে লক্করঝক্কর বাস চলাচল কড়াকড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস চলাচলের বিষয়ে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। প্রযুক্তি নির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর পুরোনো সব বাসকে পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হবে।

যা আছে ইলেকট্রিক বাস প্রকল্পে

ইলেকট্রিক বাস প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০০ ইলেকট্রিক বাস কেনা হবে। এসব বাস চলবে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে। অপারেটর দিয়ে পরিচালনা করা এসব বাস। এসব বাসের জন্য মোট তিনটি চার্জিং ডিপো নির্মাণ করা হবে।

জানা গেছে, পূর্বাচলে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ১ দশমিক ৩ একর জায়গায় চার্জিং স্টেশনসহ ডিপো হবে। এই ডিপোতে বাসগুলো থাকবে। আরেকটি ডিপো হবে রাজউকের ঝিলমিল এলাকায়। আরেকটি ডিপো কাঁচপুরে করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া বিআরটিএ তাদের অংশে ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) করাসহ আরও বেশ কিছু পরিকল্পনা করেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নীতিমালা প্রণয়ন, বৈদ্যুতিক বাসের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি পরিবেশদূষণ রোধে জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে পরিবহন খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বৈশ্বিক জলবায়ুসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো এবং টেকসই নগর পরিবহনকে উৎসাহিত করতে কাজ করবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশদূষণ রোধ ও বায়ুমান উন্নয়ন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা, সবার জন্য উপযোগী গণপরিবহন সম্প্রসারণ, যানজট হ্রাস, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করবে।

কারা আনবে, কেমন হবে ইলেকট্রিক বাস?

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই বাস অনুমোদন দেওয়ার পদ্ধতি, বাসের ধরন ও ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। তা থেকেই ইলেকট্রিক বাস নামানোর এই পরিকল্পনা।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সূত্র জানা গেছে, ইলেকট্রিক বাস নামানোর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া হবে ২১৩৫ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে বাকি ৩৬৫ কোটি টাকা। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ডিটিসিএ।

এই প্রকল্পের আওতায় কোম্পানিভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের অধীনে ইলেকট্রিক বাস (ই-বাস) চালু করা হবে। ঢাকা শহরের যানজট কমানো, গণপরিবহনের সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য ডিটিসিএসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি, বেসরকারি সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

জানা গেছে, ইলেকট্রিক বাসে স্বয়ংক্রিয় দরজা খোলা-বন্ধের (অটো-ডোর) এবং ই-টিকেটিং ব্যবস্থা থাকবে। বাস থাকবে একেবারে চকচকে। সুশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কাউন্টারভিত্তিক সেবা চালু হবে। বাসের গায়ে রুট নম্বর ও কোম্পানির নাম লেখা থাকবে। একই কোম্পানির সব বাসের রং অভিন্ন হবে। বাসগুলো চলবে বড় কোম্পানির অধীন ফ্রাঞ্চাইজির ভিত্তিতে।

পুরোনো ও লক্করঝক্কর বাসে ভরা রাজধানী

রাজধানীর রাস্তা থেকে পুরোনো বাস তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিভিন্ন সরকার। কিন্তু কোনও সরকারই তা করতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে অনেকে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের যোগসাজশকে দায়ী করলেও মূলত সরকারের সদিচ্ছার অভাবে যুগ যুগ ধরে চলছে পুরোনো ও লক্করঝক্কর বাস।

বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৮টি। ঢাকায় নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৫৪ হাজারের মতো। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ বাস-মিনিবাস মেয়াদোত্তীর্ণ (২০ বছরের বেশি বয়সী)।

তবে বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে রাজধানীতে চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ বাস-মিনিবাসের হার আরও বেশি। কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে। প্রতিদিনই কোনও না কোনও যানবাহনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। সে হিসাবে সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। এছাড়া ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই, এমন যানবাহন এই মেয়াদোত্তীর্ণ যানের মধ্যে পড়ে না।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুরোনো ও লক্করঝক্কর বাস রাজধানীর সৌন্দর্য নষ্ট করছে। একইসঙ্গে এসব বাসের বেপোরোয়া চলাচল যানজট যেমন বৃদ্ধি করছে তেমনই মানুষের জীবনকে হুমকির সম্মুখীন করছে। রাজধানীতে ইলেকট্রিক বাস নামানোর যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে তাকে সাধুবাদ জানাই। তবে তার আগে পুরোনো বাসে একটা হিল্লে করা দরকার।

সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তবে কিছু বিষয় নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে তার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘বিগত সময়েও আমরা দেখেছি, সরকার কোনও উদ্যোগ নিলে কেবল বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা করে। যাত্রীদের অংশীজন হিসেবেই মনে করে না সরকার। যার কারণে আমাদের কোনও পরামর্শ নেয় না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সব প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক বাধা প্রতিকূলতা থাকে। সেসব বিষয় মাথায় নিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিদেশি এক্সপার্টদের মতামত নেওয়া দরকার। কারণ দেশের অভ্যন্তরে যাদের মতামত নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, দিনশেষে তার ফলাফল ব্যর্থতার রূপ নেয়। বিগত সময়েও সরকার হকার উচ্ছেদ বাস টার্মিনাল এসব স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু সঠিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর কারণ সরকারের অভ্যন্তরে সুবিধাবাদী লোকরা এসব কিছু হতে দেয় না, ফলে বদনাম হয় সরকারের।’’

মোজ্জাম্মেল হক বলেন, ‘‘প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে বুঝে-শুনে লোকজন নিয়োগ দেওয়া দরকার।’’

/আরকে/
সম্পর্কিত
পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের ফিটনেসসহ সব কাগজই ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ
প্রাণ বাঁচানো গেলেও দুর্ঘটনা ঠেকানোর উপায় কী
যাত্রী নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলায় ফেরিঘাট দুর্ঘটনায় প্রাণরক্ষা
সর্বশেষ খবর
‘ইন্সপেক্টরকে গাছে ঝুলায় দেবো’ বলা পুলিশ কমিশনারকে স্ট্যান্ড রিলিজ
‘ইন্সপেক্টরকে গাছে ঝুলায় দেবো’ বলা পুলিশ কমিশনারকে স্ট্যান্ড রিলিজ
ভিক্টর হুগোর দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ঢাকায় সৌধের বিশেষ আয়োজন
ভিক্টর হুগোর দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ঢাকায় সৌধের বিশেষ আয়োজন
বেসামরিকদের সুরক্ষায় ইসরায়েলি বাহিনীই সেরা: নেতানিয়াহু
বেসামরিকদের সুরক্ষায় ইসরায়েলি বাহিনীই সেরা: নেতানিয়াহু
যে বাবারা শুধু চরিত্র নন, হয়ে উঠেছিলেন প্রজন্মের আবেগ
যে বাবারা শুধু চরিত্র নন, হয়ে উঠেছিলেন প্রজন্মের আবেগ
সর্বাধিক পঠিত
হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকের সতর্কবার্তা জারি
হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকের সতর্কবার্তা জারি
৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ ঘোষণা মামুনুল হকের
৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ ঘোষণা মামুনুল হকের
আলোচিত ৩ ইউপির কী নাম রাখতে বললেন প্রধানমন্ত্রী, যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী
আলোচিত ৩ ইউপির কী নাম রাখতে বললেন প্রধানমন্ত্রী, যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী কবে ভারত সফরে যাবেন, জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
প্রধানমন্ত্রী কবে ভারত সফরে যাবেন, জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান