যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকান খাবারের জনপ্রিয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গত ১৫ বছরে দেশটিতে মেক্সিকান খাবারকে ঘিরে যে রন্ধনশিল্পের নবজাগরণ ঘটেছে, তাতে মার্কিনদের রসনার পরিধি টেক্স-মেক্স, টাকো কিংবা ন্যাচোসের প্রচলিত গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছে।
মেক্সিকান ও মেক্সিকান-আমেরিকান শেফরা তাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব স্বাদ, রান্নার কৌশল ও ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। বড় শহর শিকাগো, ফিলাডেলফিয়া কিংবা নিউ অরলিন্স থেকে শুরু করে ছোট শহরেও এখন পাওয়া যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় মেক্সিকান খাবার।
এই পরিবর্তনকে সামনে রেখে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক, সম্পাদক ও আলোকচিত্রীদের একটি দল। তাদের পছন্দের রেস্তোরাঁগুলোর তালিকায় জায়গা পেয়েছে ফুড ট্রাক, ছোট স্থানীয় খাবারের দোকান থেকে শুরু করে আধুনিক টেস্টিং-মেনু রেস্তোরাঁও।
তবে এই তালিকাকে সেরা থেকে ভালো এভাবে কোনও ক্রমতালিকা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকান রান্না কীভাবে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হচ্ছে, তার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মেক্সিকান খাবারের সঙ্গে স্থানীয় উপকরণ, অভিবাসী সম্প্রদায়ের স্মৃতি এবং আঞ্চলিক রান্নার ঐতিহ্যের যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে, এসব রেস্তোরাঁ তারই উদাহরণ। এখানে এমন ১০টি রেস্তোরাঁর কথা তুলে ধরা হলো-
নিউ অরলিন্সের আকামায়া
নিউ অরলিন্সের আকামায়া পরিচালনা করেন বোন আনা ও লিডিয়া ক্যাস্ত্রো। তাদের রান্নায় মেক্সিকান ঐতিহ্যের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব লুইজিয়ানার স্থানীয় উপকরণের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়।
স্থানীয় কাঁকড়ার সঙ্গে কলার্ড গ্রিনস ও মাসা দিয়ে তৈরি চোচোয়োতেস, চিজের আবরণে তৈরি চিংড়ির কোস্ত্রা টাকো কিংবা টমেটো ও জলপাইয়ের ঝোলে ভেরাক্রুজ-ধাঁচের ব্ল্যাকেনড ড্রাম—প্রতিটি পদেই রয়েছে ভিন্ন স্বাদের পরিচয়।
এটি মেক্সিকান ও নিউ অরলিন্সের খাবারের কৃত্রিম সংমিশ্রণ নয়। বরং শেফ আনা ক্যাস্ত্রো নিজের পরিচিত রান্নার ঐতিহ্যকে স্থানীয়ভাবে পাওয়া সেরা উপকরণ দিয়ে তুলে ধরেছেন। আর লুইজিয়ানার এই অঞ্চলে সেই উপকরণের বড় একটি অংশ আসে মেক্সিকো উপসাগর থেকে।
মাত্র দুই বছর আগে যাত্রা শুরু করেও আকামায়া ইতোমধ্যে নিউ অরলিন্সের অন্যতম আলোচিত রেস্তোরাঁ হয়ে উঠেছে। কাছেই ক্যাস্ত্রো বোনেরা চালু করেছেন কাসিমিরো নামের আরেকটি মেক্সিকান রেস্তোরাঁ, যেখানে মূলত নাশতা ও দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়।
ওকলাহোমা সিটির লা আগুয়াসকালিয়েন্তেস মার্কাদো দে কার্নেস
ওকলাহোমা সিটির লা ২৯ এলাকায় মেক্সিকান খাবারের প্রাণবন্ত এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় মেক্সিকান ও মধ্য আমেরিকান জনগোষ্ঠীর কাছে এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মেক্সিকোর আগুয়াসকালিয়েন্তেস অঞ্চল থেকে আসা মানুষের আনাগোনা এখানে বেশি।
এই বাজারের ভেতরে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান, পানাদেরিয়া বা বেকারি, কার্নিসেরিয়া বা মাংসের দোকান, অর্থ স্থানান্তরের কাউন্টার এবং মেক্সিকান রান্নার একটি ছোট রান্নাঘর।
তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারগুলোর একটি তৈরি হয় ছোট একটি বাণিজ্যিক ওভেনে। সেখানে তৈরি হয় বিরোতে, আগুয়াসকালিয়েন্তেসের ঐতিহ্যবাহী রুটি। এটি দিয়ে তৈরি করা হয় তোর্তা দে আলবানিয়িল। তাজা বিরোতের ভেতরে ভরা হয় হ্যাম, আচার দেওয়া জালাপেনিও ও ক্রেমা মেক্সিকানা।
এই খাবার স্থানীয় আগুয়াসকালিয়েন্তেস বংশোদ্ভূত মানুষের কাছে শুধু একটি স্যান্ডউইচ নয়; বরং দূরদেশে বসে শিকড়ের স্বাদ ফিরে পাওয়ার একটি মাধ্যম।
ন্যাশভিলের আলেব্রিহে
এডগার ভিক্টোরিয়ার রন্ধনযাত্রা শুরু হয়েছিল চাকরি হারানোর পর। এরপর বিভিন্ন খাবারের স্টল, পপ-আপ আয়োজন ও ফুড ট্রাকে রান্না করে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
গত বছর তিনি চালু করেন নিজের প্রথম স্থায়ী রেস্তোরাঁ আলেব্রিহে। মেক্সিকো সিটির স্ট্রিট ফুডের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে এখানে ব্যবহার করা হয় ঐতিহ্যবাহী জাতের ভুট্টা। সেই ভুট্টা দিয়েই তৈরি হয় তামালেস, তোষতাদাস, সোপেস ও টর্টিলা।
পূর্ব ন্যাশভিলের একটি শপিং মলের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত রেস্তোরাঁটির পরিবেশ খুবই সাধারণ। কিন্তু খাবারের মান ও স্বাদের কারণে এটি দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য তাকেরিয়াগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
ডেনভারের আলমা ফন্দা ফিনা
ডেনভারের আলমা ফন্দা ফিনা শেফ জনি কুরিয়েলের পারিবারিক শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় তাঁর পরিবারের পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী ফন্দা রেস্তোরাঁগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি হয়েছে এই ছোট পরিসরের রেস্তোরাঁটি। নামটিও রাখা হয়েছে তাঁর মা আলমার নামে।
এখানে ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান খাবারকে আধুনিক ও পরিশীলিত উপস্থাপনায় পরিবেশন করা হয়। ডাক কার্নিতাস এবং আগাভে দিয়ে রোস্ট করা মিষ্টি আলুর মতো পদ অতিথিদের একই সঙ্গে স্বাদ ও আতিথেয়তার অনুভূতি দেয়।
মেক্সিকান রান্নার সম্ভাবনা নিয়ে কুরিয়েলের আগ্রহের আরেকটি উদাহরণ তাঁর নতুন রেস্তোরাঁ মিলপেরো। মাত্র ১৬ আসনের এই টেস্টিং-মেনু রেস্তোরাঁটি মেক্সিকান খাবারকে আরও পরীক্ষামূলক ও আধুনিকভাবে তুলে ধরছে।
ফিলাডেলফিয়ার আমা
ফিলাডেলফিয়ার আমা রেস্তোরাঁয় চিপস ও সালসা দিয়ে খাবার শুরু হলেও তা মোটেও সাধারণ আয়োজন নয়। এখানে ঐতিহ্যবাহী জাতের ভুট্টা দিয়ে তৈরি মচমচে তোষতাদার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ছয় ধরনের সালসা।
এসব সালসায় মেক্সিকোর বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাদ তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে বাজা অঞ্চলের স্মোকড-কাজু সালসা এবং ইউকাতানের পোড়া হাবানেরো দিয়ে তৈরি ঝাল সালসা নেগ্রা।
শেফ ফ্র্যাঙ্কি রামিরেজ ১৬ বছর বয়সে মেক্সিকো সিটি থেকে ফিলাডেলফিয়ায় আসেন। প্রায় দুই দশক অন্য শেফদের রান্নাঘরে কাজ করার পর ২০২৫ সালে তিনি নিজের রেস্তোরাঁ চালু করেন।
ফিলাডেলফিয়ায় মেক্সিকান খাবারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে পুয়েবলা অঞ্চলের প্রভাব থাকলেও রামিরেজ তাঁর মেনুতে তুলে ধরেছেন পুরো মেক্সিকোর আঞ্চলিক বৈচিত্র্য। কয়লার আগুনে ঝলসানো ওয়াহাকার ত্লায়ুদাস, জালিসকো-ধাঁচের ল্যাম্ব-নেক বিরিয়া এবং কাঠের আগুনে গ্রিল করা পুরো অক্টোপাস—সবই সেই বৈচিত্র্যের উদাহরণ।
আইডাহোর আমানো
ক্যালডওয়েলের আমানো রেস্তোরাঁর শেফ ও মালিক সালভাদোর আলামিলা মেক্সিকোর মিচোয়াকান থেকে উঠে এসে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা আনায় বেড়ে উঠেছেন। ফলে তাঁর রান্নায় মেক্সিকোর ঐতিহ্য এবং দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার খাবারের প্রভাব একসঙ্গে দেখা যায়।
রেস্তোরাঁয় প্রাচীন আদিবাসী পদ্ধতি নিঃস্তামালাইজেশন ব্যবহার করে তৈরি করা হয় টর্টিলা। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রভাব দেখা যায় এলএ বিরিয়া টাকোতে।
তবে আমানোর বড় আকর্ষণ রেস্তোরাঁর বাইরে থাকা ওক কাঠের আগুনে চালিত বারবাকোয়া পিট। সেখানে ধীরে ধীরে রান্না করা শর্ট রিব, ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক ও ল্যাম্ব বেলিতে মিশে থাকে ধোঁয়া ও মসলার গভীর স্বাদ।
ওয়াশিংটন ডিসির আমপারো ফন্দিতা
মেক্সিকোর চিহুয়াহুয়ায় জন্ম এবং এল পাসোতে বেড়ে ওঠা শেফ ইরাবিয়েন ক্রিশ্চিয়ানের আমপারো ফন্দিতা মেক্সিকোর বিস্তৃত আঞ্চলিক রান্নাকে আধুনিক দৃষ্টিতে তুলে ধরে।
এখানে ঝাল-মিষ্টি স্বাদের মোল মানচামান্তেলেস দিয়ে পরিবেশন করা হয় টার্কি ভরা এনমোলাদাস। রয়েছে নীল ভুট্টার মাসা দিয়ে তৈরি সোপেসিতোস, যা বিভিন্ন উপকরণসহ আলাদা করে পরিবেশন করা হয়।
আধুনিক রান্নার পাশাপাশি রেস্তোরাঁটির পরিবেশ বেশ স্বচ্ছন্দ। অতিথিরা এখানে এক বাটি গাঢ় লাল পোজোলে যেমন উপভোগ করতে পারেন, তেমনি মার্গারিটা ও কেসো ফ্রিতোর সঙ্গেও সময় কাটাতে পারেন।
ফিনিক্সের বাকানোরা
ফিনিক্সের বাকানোরা মূলত সোনোরান ধাঁচের একটি স্টেকহাউস। রেস্তোরাঁয় ঢোকার আগেই নাকে আসে জ্বলন্ত মেসকুইট কাঠের ধোঁয়ার গন্ধ।
শেফ রেনে আন্দ্রাদে গ্রিলের আগুনকে রান্নার অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন। হাড়সহ নিউইয়র্ক স্ট্রিপ ও রিব-আই মেনুর প্রধান আকর্ষণ হলেও গ্রিল করা মুরগি এবং ঝাল লাইম ক্রেমাসহ আগুনে পোড়ানো এলোটেও কম জনপ্রিয় নয়।
এখানে খাবারের স্বাদে সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে আগুন ও ধোঁয়ার ব্যবহার।
রিচমন্ডের বারবাকোয়া মেহিয়া
রিচমন্ডের বারবাকোয়া মেহিয়ার পেছনে রয়েছেন ওমর মেহিয়া। তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে বারবাকোয়া রান্নার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। মেক্সিকোর হিদালগো থেকে আসা নির্মাণশ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ার পর তিনি সপ্তাহান্তে স্থানীয় পুলগায় বারবাকোয়া বিক্রি শুরু করেন।
পারিবারিক রেসিপিতে রয়েছে পিটে ধীরে রান্না করা ভেড়ার মাংস, কনসোমে এবং আঞ্চলিক সালসা। এর মধ্যে রয়েছে শোকোনোস্তল ও চিনিকুইলেস দিয়ে তৈরি বিশেষ সালসা ভের্দে।
রবিবার এখানে পাওয়া যায় পানসিতা ব্লাঙ্কা। কখনো কখনো পরিবেশন করা হয় জিমবো—মাগেই পাতায় মোড়ানো আস্ত মুরগি, যার সঙ্গে থাকে আদোবো, নোপালেস ও শূকরের চামড়ার মচমচে অংশ। হিদালগোর আকতোপান অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী পদ এখন বে এরিয়ার খাবারের সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে।
শিকাগোর বিরিয়েরিয়া ওকোতলান
শিকাগোর বিরিয়েরিয়া ওকোতলান-এর ইতিহাস বেশ পুরোনো। মেক্সিকোর জালিসকোর ওকোতলান অঞ্চলের পারিবারিক রেসিপি নিয়ে ১৯৭৩ সালে রেস্তোরাঁটি চালু করেন রামোন রেইয়েস। বর্তমানে এটি পরিচালনা করছেন তাঁর ছেলে আন্দ্রেস রেইয়েস।
ক্যাফেটেরিয়া ধাঁচের টেবিল-চেয়ারের পাশে থাকা উঁচু কাউন্টারে তাকেরো অতিথিদের অর্ডার অনুযায়ী খাবার তৈরি করেন। কয়েক দশক ধরে মেনুতেও তেমন পরিবর্তন আসেনি।
এখানে মূল আকর্ষণ ওভেনে রোস্ট করা ছাগলের মাংস, সঙ্গে মসলাদার কনসোমে, ভুট্টার টর্টিলা ও বিভিন্ন অনুষঙ্গ। দীর্ঘ সময় পর মেনুতে যোগ হয়েছে কেসাবিরিয়া—তবে সেটিই একমাত্র উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
সব মিলিয়ে, শিকাগোর এই রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকটা জালিসকোর কোনো ঐতিহ্যবাহী বাজারে বসে খাওয়ার মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকান খাবারের এই বৈচিত্র্য দেখিয়ে দেয়, দেশটিতে মেক্সিকান রান্না এখন আর কেবল টাকো, ন্যাচোস কিংবা টেক্স-মেক্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আঞ্চলিক ঐতিহ্য, অভিবাসীদের স্মৃতি, স্থানীয় উপকরণ এবং নতুন প্রজন্মের শেফদের সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে মেক্সিকান খাবার যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস









