তাপমাত্রা যখন ক্রমেই বাড়তে থাকে, তখন কী পোশাক পরবেন? সাদা টি-শার্ট, সুতি জামা, নাকি পাতলা লিলেন? সাধারণ ধারণা হলো, গরমে হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাকই সবচেয়ে ভালো। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি শুধু পোশাকের রং বা কাপড়ের নামের ওপর নির্ভর করে না। কাপড়ের বুনন, ওজন, বাতাস চলাচলের সুযোগ, পোশাকের ফিট এবং ঘাম শুকানোর ক্ষমতাও শরীরকে ঠান্ডা রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সাদা পোশাকই কি সবচেয়ে ঠান্ডা?
গরমে সাদা পোশাক পরার প্রচলন রয়েছে একটি সহজ কারণে হালকা রঙের কাপড় সূর্যের আলো বেশি প্রতিফলিত করে এবং কালো বা গাঢ় রঙের তুলনায় কম তাপ শোষণ করে। ফলে সরাসরি রোদে হালকা রঙের পোশাক শরীরে তাপ জমার পরিমাণ কমাতে পারে।
তবে শুধু রং দেখে পোশাক বেছে নেওয়া যথেষ্ট নয়। মরুভূমিতে বসবাসকারী বেদুইনদের কালো ঢিলেঢালা পোশাক নিয়ে করা পুরোনো গবেষণা দেখিয়েছে, পোশাকের ফিট বা ঢিলেঢালা হওয়া শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ঢিলেঢালা পোশাকের ভেতর দিয়ে বাতাস চলাচল করে এবং শরীরের তাপ ও ঘাম বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পায়।
অর্থাৎ, গরমে পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রঙের চেয়ে পোশাকটি শরীরের সঙ্গে কতটা লেগে আছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ঢিলেঢালা পোশাক কেন আরামদায়ক?
গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার অন্যতম প্রধান উপায় হলো ঘাম। ঘাম ত্বকের ওপর থেকে বাষ্পীভূত হওয়ার সময় শরীর থেকে তাপ নিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াই আমাদের শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
ঢিলেঢালা পোশাক ত্বক ও কাপড়ের মধ্যে কিছুটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। সেখানে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ঘাম দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ার সুযোগ পায়। সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক পোশাকবিষয়ক পরামর্শেও গরমে হালকা, বাতাস চলাচল করতে পারে এমন এবং পর্যাপ্ত ঢিলেঢালা পোশাক বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের সময় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তখন শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয় এবং ঘাম দ্রুত সরিয়ে নেওয়া দরকার। তাই অ্যাক্টিভওয়্যারে তুলনামূলক ফিটিং পোশাকও কার্যকর হতে পারে।
লিনেন কি গরমের জন্য সেরা?
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় লিনেন দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। এর তন্তু ও বুননের কারণে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে। পাশাপাশি লিনেন শরীরের আর্দ্রতা শোষণ ও সরিয়ে নিতে তুলনামূলক ভালো কাজ করে। এর তন্তুগুলো তুলনামূলক শক্ত হওয়ায় কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে না থেকে কিছুটা দূরে থাকে, ফলে বাতাস চলাচলের সুযোগ বাড়ে।
তবে লিনেনের একটি অসুবিধাও আছে। এটি সহজেই কুঁচকে যায় এবং ঘাম শোষণ করার পর দ্রুত শুকাতে সবসময় সক্ষম নয়।
সুতির পোশাক কেমন?
গরমের দিনে সবচেয়ে পরিচিত পছন্দগুলোর একটি হলো সুতি। হালকা ও খোলা বুননের সুতি কাপড় বাতাস চলাচলে সহায়তা করতে পারে এবং ঘাম শোষণ করে। কিন্তু অতিরিক্ত ঘাম হলে সুতি কাপড় পানি ধরে রাখে এবং ধীরে শুকায়। ফলে কাপড় ভিজে গিয়ে শরীরের সঙ্গে লেগে থাকতে পারে।
এ কারণে ‘১০০ শতাংশ সুতি’ লেখা থাকলেই পোশাকটি গরমের জন্য আদর্শ এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কাপড়টি কীভাবে বোনা হয়েছে এবং কতটা বাতাস চলাচল করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পলিয়েস্টার কি গরমে ভালো?
পলিয়েস্টারকে অনেকে গরমের পোশাকের জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। তবে অ্যাক্টিভওয়্যারে ব্যবহৃত আধুনিক পলিয়েস্টার অনেক সময় বিশেষভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ঘাম শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দ্রুত শুকাতে পারে।
তাই সাধারণ পলিয়েস্টার আর বিশেষভাবে তৈরি ময়েশ্চার-উইকিং পলিয়েস্টার একভাবে কাজ করে না। ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় এ ধরনের কাপড় বেশ কার্যকর হতে পারে। তবে পোশাকটি ঘন বুননের হলে বাতাস চলাচল কমে যেতে পারে এবং গরমও বেশি লাগতে পারে।
শুষ্ক না আর্দ্র, গরমের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
শুষ্ক ও আর্দ্র গরমে একই পোশাক সমান আরামদায়ক নাও হতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ায় ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হয়। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে বাষ্পীভবন ধীর হয়ে যায়। ফলে ঘাম শরীর বা পোশাকে জমে থাকতে পারে এবং শরীরকে ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
এ কারণেই আর্দ্র গরমে শুধু ঘাম শোষণ করে এমন কাপড়ের চেয়ে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং ঘাম দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে এমন পোশাক বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
ভেজা পোশাক কি শরীর ঠান্ডা করতে পারে?
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, গরমে ভেজা পোশাক শরীর ঠান্ডা করতে পারে। পানিকে তরল থেকে বাষ্পে পরিণত হতে তাপশক্তি প্রয়োজন। ভেজা কাপড়ের পানি যখন বাষ্পীভূত হয়, তখন সেই তাপ শরীর থেকে গ্রহণ করে। ফলে ত্বক ও শরীর কিছুটা ঠান্ডা হয়।
তবে অতিরিক্ত ভিজে যাওয়া পোশাক আবার বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই ভেজা কাপড়ের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় যখন বাষ্পীভবনের জন্য পর্যাপ্ত বাতাস ও তুলনামূলক শুষ্ক পরিবেশ থাকে। সাম্প্রতিক পোশাক গবেষণাতেও ইচ্ছাকৃতভাবে কাপড় ভিজিয়ে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঠান্ডা করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতের পোশাক হবে ‘স্মার্ট’
গরম মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা এখন এমন কাপড় তৈরির চেষ্টা করছেন, যা শুধু শরীর ঢাকবে না, বরং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করবে।
কিছু গবেষণায় এমন উপাদান নিয়ে কাজ হচ্ছে, যা তাপমাত্রা বাড়লে কাপড়ের গঠন পরিবর্তন করে বাতাস চলাচলের সুযোগ বাড়াতে পারে। আবার কিছু ‘ফেজ-চেঞ্জ’ উপাদান তাপ শোষণ করে গরমের অনুভূতি কমানোর চেষ্টা করে। এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতের পোশাকে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।









